সম্প্রতি ইত্তেফাকে প্রকাশিত একটি সংবাদে বলা হইয়াছে, সাভার উপজেলার প্রতিটি সড়ক ও মহাসড়ক সারাক্ষণ ধোঁয়াশায় আচ্ছন্ন থাকিতেছে। যত্রতত্র সড়কের পাশে ইট, বালি, পাথরসহ নির্মাণ সামগ্রী রাখিবার কারণে ধীরে ধীরে রাস্তাগুলি ধূলিবালিতে ঢাকিয়া যায় এবং বাতাসে সেই ধূলি ছড়াইয়া পড়ে। ধূলির কারণে শ্বাসকষ্টজনিত নানান অসুখে আক্রান্ত হইতেছে মানুষ। পথচারী, যানবাহনের চালক ও যাত্রীদের স্বাভাবিক নিঃশ্বাস লইতেই কষ্ট হইতেছে। সর্বাধিক সমস্যা হইতেছে শিশু ও বৃদ্ধদের। ধূলির সহিত নানান রকম ক্ষতিকর জীবাণুও শরীরে প্রবেশ করিতেছে। ফলে চর্মরোগের প্রকোপও বৃদ্ধি পাইতেছে। চোখের নানান সমস্যাতেও ভুগিতেছে অনেকে। এত সমস্যা সত্ত্বেও পৌর কর্তৃপক্ষ ও সড়ক বিভাগ সড়কে ধূলাবালির আধিক্য কমাইতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করিতেছে না। সাভারের এই চিত্র কি রাজধানী ঢাকার জন্যও প্রযোজ্য নহে? চট্টগ্রামসহ ছোট-বড় অনেক শহরেই একই দৃশ্য দেখা যাইবে। বর্ষা মৌসুম পার হইবার পর যেইমাত্র শীতকাল বা শুষ্ক মৌসুম শুরু হয়, তখনই শহরগুলি ধূলিধূসর হইয়া পড়ে, মানুষের অসুখ-বিসুখ বৃদ্ধি পাইতে থাকে।
‘বৈশ্বিক বায়ু পরিস্থিতি ২০১৭’ অনুযায়ী দূষিত বায়ুর শহরগুলির মধ্যে ঢাকা দ্বিতীয় স্থান অধিকার করিয়াছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি গবেষণা সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী দূষণের শীর্ষে রহিয়াছে দিল্লি। ইহার পরই ঢাকার অবস্থান। ঢাকার পরবর্তী স্থানে রহিয়াছে পাকিস্তানের করাচি ও চীনের বেইজিং। প্রতিবেদন অনুযায়ী ১৯৯০ হইতে ২০১৫ সালের মধ্যে সবচাইতে বেশি দূষণ বৃদ্ধি পাইয়াছে বাংলাদেশ ও ভারতে। প্রতিবেদনে ইহাও বলা হইয়াছে, বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে প্রতি বত্সরে এক লক্ষ ২২ সহস্রাধিক মানুষের মৃত্যু হইতেছে। আর বায়ুদূষণের কারণে অধিক শিশু মৃত্যুর হারের হিসাবে পাকিস্তানের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। এই কারণে বেইজিংয়ে ২০১৭ সালে ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করা হইয়াছে, পরিবেশ পুলিশ নামাইতে হইয়াছে। বায়ু দূষণের কারণে দিল্লিকে ২০১৬ সালে ‘গ্যাস চেম্বার’ উপাধি পাইতে হইয়াছে, বন্ধ করিতে হইয়াছে বিদ্যালয়। ঢাকার পরিস্থিতিও ক্রমশ বিপজ্জনক হইয়া উঠিতেছে। বাতাসে ক্ষতিকর কণার উপস্থিতি বিপজ্জনক মাত্রার চাহিতে বেশি। ‘টু-হুইলার’ যানবাহন নিষিদ্ধ ও সিএনজির ব্যবহার উত্সাহিত করিবার পর পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি ঘটিয়াছিল। কিন্তু মোটরযানের সংখ্যা অত্যধিক বৃদ্ধি পাওয়ায়, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন রাস্তা হইতে উঠাইতে প্রশাসনের ব্যর্থতায় পুনরায় পরিস্থিতির অবনতি ঘটিতেছে। ঢাকা এক প্রসারমান মেগাসিটি। নির্মিত হইতেছে অগুনতি দালানকোঠা-অট্টালিকা। বাস্তবায়িত হইতেছে ফ্লাইওভার, মেট্রোরেলসহ নানান প্রকল্প। এইসকল নির্মাণকার্যের ফলে সর্বত্র এবং সারাক্ষণ ধূলাবালির জন্ম হইতেছে। অন্যদিকে রাজধানীমুখী জনস্রোতের প্রবাহও ক্রমশ বৃদ্ধি পাইতেছে।
বায়ু দূষণ কমাইতে বেইজিংয়ের মেয়র ২০১৭ সালে জ্বালানি হিসাবে শতকরা ৩০ ভাগ কয়লা ব্যবহারের ঘোষণা দিয়াছিলেন। কিছু কলকারখানা বন্ধও করিয়া দিয়াছিলেন। আমাদেরও সময় থাকিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইবে। কয়লানির্ভর কলকারাখানাকে নিরুত্সাহিত করিতে হইবে। ঢাকাও যেন ‘গ্যাস চেম্বার’-এ পরিণত না হয়, তাহার প্রস্তুতি লওয়া দরকার। আর ঢাকামুখী যেই জনস্রোত, তাহাও ঠেকানো প্রয়োজন। ধোঁয়াশা দূর করিতে আপাতত সকালে এবং বিকালে দুই বেলা সিটি করপোরেশনকে রাস্তায় পানি ছিটাইতে হইবে। এই কাজটি খুব অনিয়মিত ও অপ্রতুলভাবে করা হয়, ইহা নিয়মিত করিতে হইবে।
