রাজধানীতে সহস্র সরকারি বাড়ি-প্লট অবৈধ দখলে

আপডেট : ১৫ জুন ২০১৬, ০২:৫৪
জেলা প্রশাসকের ভিপি শাখায় গিয়ে সাক্ষাত্ মিলে হতভাগী আঙ্গুরা বেগমের সাথে। তার স্বামী সোহরাব হোসেন মারা গেছেন বহু বছর আগে। এতিম ছেলে-মেয়ে নিয়ে তিনি নবাবপুরের ২৩ নম্বর টেকেরহাট লেনের পাঁচ কাঠার একটি সরকারি বাড়িতে থাকেন বহু বছর ধরে। প্রতি বছর ইজারার টাকাও পরিশোধ করে আসছেন। বিধবা আঙ্গুরা বেগম জেলা প্রশাসকের অনুমতি সাপেক্ষে সরকারি ভিটায় ৩টি পাকা ঘরও নির্মাণ করেছেন।
 
কিন্তু আবদুল মান্নান নামে এক প্রভাবশালী ব্যক্তি ওয়ারিশ সেজে সরকারি বাড়িটি দখল করে নিয়েছেন। বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করেছে অসহায় আঙ্গুরা বেগম ও তার পরিবারকে। ইতিমধ্যে ঐ বাড়িতে বহুতল ভবনও তৈরি করা হয়েছে। বাড়ির নিচে দোকান ও উপরে ফ্ল্যাট তৈরি করে বিক্রি করা হয়েছে। আঙ্গুরা বেগম প্রতিকার চেয়ে ডিসি অফিসে বছরের পর বছর ধরনা দিয়েও কোন প্রতিকার পাচ্ছেন না। থানা পুলিশও তার ডাকে সাড়া দেয়নি। এব্যাপারে জেলা প্রশাসকের দপ্তরে যোগাযোগ করা হলে জানানো হয়, বাড়িটি বেদখল হয়েগেছে। উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।
 
একই উপায়ে স্বামীবাগের পাঁচ কাঠা সরকারি বাড়ি জবরদখল করেছে ঢাকা জেলা প্রশাসকের গোপনীয় শাখার সাবেক সিএ আবুল ফয়েজ ভুঁইয়া। তিনি প্রথম বাড়িটি সরকারি বিধিমাফিক লিজ গ্রহণ করেন। পরে জাল দলিল তৈরি করে মালিকানা দাবি করে আদালতে মামলা করেন। মামলায় হেরে পুনরায় তার ছোটভাই আবদুস সালামের নামে আরেকটি জাল দলিল তৈরি করে আরো একটি মামলা দায়ের করেন। বর্তমানে বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
 
এদিকে ৪৫ শরত্গুপ্ত রোডের হানিফ মিয়ার ৮ কাঠার লিজ নেয়া সরকারি বাড়িটি বেদখল হয়ে গেছে। একই কায়দায় দখল করা হয়েছে ৬৭/৪ উত্তর মৈশুন্ডির জামাল মিয়ার ৬ কাঠার লিজ                 নেয়া সরকারি বাড়িটি। ৬০ বনগ্রাম রোডের ৭ কাঠার লিজ নেয়া বাড়িটিও বেহাত হয়েছে। ৯৫ বনগ্রাম রোডের সাড়ে ৮ কাঠার আরেকটি লিজ নেয়া সরকারি বাড়ি বেদখল হওয়ার পথে। স্থানীয় প্রভাবশালীরা একাধিক মামলা-মোকদ্দমায় জর্জরিত করেছেন লিজ গ্রহীতাকে। দখল হয়ে গেছে ২০নং বেচারাম দেউড়ির ৫ কাঠা ও ১৯৫ নবাবপুরের ৮ কাঠা সরকারি বাড়ি। ক্ষতিগ্রস্ত আলিম উল্লাহ বলেন, নানা প্রতারণার মাধ্যমে সরকারি বাড়িগুলো বেহাত হচ্ছে। 
 
ভূমি আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার লুত্ফর রহমান বলেন, সরকারি সম্পত্তি বিষয়ে নানা ফাঁক-ফোকর রয়েছে। একাধিক প্রতারকচক্র প্রথম বাড়ির ওয়ারিশ সাজিয়ে নিজেরাই একটি ভুয়া বায়নানামা তৈরি করে। বায়নাপত্রে কিছু টাকা বাকি দেখিয়ে ক্রেতা টাকা নিয়েও বাড়ি রেজিস্ট্রি করে দিচ্ছে না মর্মে আদালতে অভিযোগ করা হয়। 
 
সাবেক ভিপি কৌঁসুলি মুহাম্মদ আবদুল আলীম বলেন, ১৯৬৫ সালে অর্পিত সম্পত্তি আইন প্রণীত হয়। অনেক ক্ষেত্রে গণহারে হিন্দুদের  সম্পত্তি অর্পিত সম্পত্তি ঘোষণা করা হয়েছে। হিন্দুদের সম্পত্তির পাশাপাশি কিছু মুসলমানের সম্পত্তিও অর্পিত সম্পত্তি ঘোষণা করা হয়েছে।
 
রাজধানীর পুরনো ঢাকায় সবচেয়ে বেশি সরকারি বাড়ি দখল ও আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে পুরান ঢাকার ওয়ারী, নবাবপুর, বনগ্রাম, তাঁতীবাজার, লক্ষীবাজার, শাঁখারি বাজার, সুত্রাপুর বংশাল, আরমানিটোলা, বেচারাম দেউড়ী, কোতোয়ালী, যোগীনগর, লালচান মোকিম লেন, ফরাশগঞ্জ, টিপু সুলতান রোড, মহাজনপুর লেন, তাহেরবাগ লেন, মিল ব্যারাক, ফরিদাবাদ, গেন্ডারিয়া, নারিন্দা মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, মিরপুর, রমনা, সবুজবাগ, ডেমরা, শ্যামপুর, লালবাগ ও তেজগাঁও। নগরীতে সহস্রাধিক অর্পিত সম্পত্তির সরকারি বাড়ি অবৈধ দখলে রয়েছে।
 
ঢাকা জেলা প্রশাসক মো. সালাউদ্দিন বলেন, অর্পিত সম্পত্তি আইনের জন্য দেশব্যাপী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বসানো হয়েছে। সেখানে ভূমি সমস্যার স্থায়ী সমাধান দেয়ার ক্ষমতা ট্রাইব্যুনালকে দেয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের সুবিধার্থে ইতিমধ্যে একাধিক বার ট্রাইব্যুনালের সময় বাড়ানো হয়েছে। বেহাত হওয়া সরকারি বাড়িগুলো উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।
 
ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, সরকারি সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ডিসিদের কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।