বছরজুড়ে চলবে বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবার্ষিকীর অনুষ্ঠান

আপডেট : ২০ মার্চ ২০১৯, ২৩:১১

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও বাঙালির আত্মপরিচয়ের সঠিক ইতিহাস সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে বছরব্যাপী সারাদেশে তৃণমূল পর্যন্ত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানমালা করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। গতকাল বুধবার সকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবার্ষিকী উদযাপন সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি এবং বাস্তবায়ন কমিটির যৌথসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, এ যাবত্কালের সর্ববৃহত্ পদক্ষেপ হিসেবে বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবার্ষিকী তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত যেন উদযাপিত হয় তারই উদ্যোগ আমরা নেব। মানুষ যেন সঠিক ইতিহাসটা জানতে পারে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত হয় এবং বাংলাদেশকে যেন আমরা সারা বিশ্বের কাছে মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরতে পারি।

১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন শেখ মুজিবুর রহমান। কালক্রমে তার হাত ধরেই ১৯৭১ সালে বিশ্ব মানচিত্রে নতুন দেশ হিসেবে স্থান করে নেয় বাংলাদেশ। ২০২০ সালে বঙ্গবন্ধুর জন্মের শত বছর পূর্ণ হবে। আর ঠিক পরের বছর ২০২১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশ উদযাপন করবে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। সে কারণে ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ২৬ মার্চ ‘মুজিব বর্ষ’ ঘোষণা করে বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবার্ষিকী উদযাপন করবে বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবার্ষিকী যথাযথভাবে উদযাপনে বিশিষ্টজনদের নিয়ে ১০২ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি এবং বাস্তবায়নের জন্য ৬১ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি করা হয়েছে। গতকাল এই দুই কমিটির প্রথম যৌথ বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রায় এক বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশের সকল জেলা, উপজেলা, থানা এবং ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত মুজিব বর্ষের অনুষ্ঠানমালা চলবে।

হত দরিদ্র বলে কিছু থাকবে না

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে আমরা দারিদ্র্যের হার ২১ ভাগে এবং একইসঙ্গে হত দরিদ্রের হার ১১ ভাগে নামিয়ে এনেছি। আমাদের লক্ষ্য এটা আরো কমিয়ে আনা। হত দরিদ্র বলে এদেশে কিছু থাকবে না।

মানুষের দুঃখ-কষ্ট বঙ্গবন্ধু সহ্য করতে পারেননি

প্রধানমন্ত্রী বলেন, মার্চ মাসটা আমাদের জন্য খুবই অর্থবহ মাস। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ, ১৭ মার্চ জাতির পিতার জন্মদিন। আবার ২৬ মার্চ আমাদের স্বাধীনতা দিবস। কাজেই ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ২৬ মার্চ পর্যন্ত বছরটাই আমরা মুজিব বর্ষ হিসেবে উদযাপন করবো। জাতির পিতার জন্ম শতবার্ষিকী যথাযথভাবে উদযাপন করাকে জাতীয় কর্তব্য হিসেবে আখ্যায়িত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জীবনের সবকিছু ত্যাগ করে এ দেশের মানুষের জন্যই কষ্ট স্বীকার করে গেছেন জাতির পিতা। আর সেই কষ্টের ফসল হিসেবেই আমরা পেয়েছি স্বাধীনতা, স্বাধীন জাতির মর্যাদা। শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের গ্রাম-গঞ্জে জাতির পিতা দেখেছেন দারিদ্র্যের হাহাকার। বুভুক্ষু নর-নারীর কষ্ট। মানুষ ওষুধ পায়নি, চিকিত্সা পায়নি, খাবার পায়নি, থাকার জায়গা নেই। মানুষের এই দুঃখ কষ্ট তিনি সহ্য করতে পারেননি। 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবার্ষিকীটা উদযাপনে আমাদের সমাজে যারা বিশিষ্ট বিজ্ঞজন তাদেরকে নিয়ে আমরা একটা কমিটি করেছি ১০২ সদস্য বিশিষ্ট। তবে, এখানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের এই কমিটিতে থাকা দরকার, যাদেরকে আমরা ধীরে ধীরে অন্তর্ভুক্ত করে নেব। আর সেই সঙ্গে আমরা আরেকটি কমিটি করেছি ৬১ সদস্য বিশিষ্ট, যারা সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অবদান রাখবে। 

সত্যকে কেউ কখনো মুছে ফেলতে পারে না

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা তারই পদাংক অনুসরণ করে এদেশের কৃষক, শ্রমিক এবং মেহনতি মানুষের কল্যাণে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি এবং তা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি। যার সুফলও মানুষ পেতে শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুঃখের বিষয় একটা সময় ছিল, ভাষা আন্দোলনে তার (জাতির পিতার) অবদান একদমই মুছে ফেলা হচ্ছিল। মুক্তিযুদ্ধে তার যে অবদান সেটাও মুছে ফেলার একটা চেষ্টা করা হয়েছিল। ২১ বছর এদেশের মানুষ সত্য জানতেই পারেনি। তিনি বলেন, আসলে সত্যকে কেউ কখনো মুছে ফেলতে পারে না। সত্য কখনও না কখনো উদ্ভাসিত হবেই আর তার স্থানটা সে করে নেবে। আজকে আমরা সেটার প্রমাণ পাচ্ছি।  

সভায় সভাপতিত্ব করেন বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় কমিটির সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত, জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন। উদযাপন জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব কামাল আব্দুল নাসের চৌধুরী অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন। অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, প্রেসিডিয়াম সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী, প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কেন্দ্রীয় ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম, প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বৈঠকে নিজ নিজ অভিমত ব্যক্ত করেন।

মুজিববর্ষ পালনে বিশিষ্ট জনরা যে প্রস্তাব দিলেন

মুজিববর্ষে বিশেষ দিবসগুলোতে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বিশেষ কর্মসূচি পালন, বঙ্গবন্ধুর নামে আন্তর্জাতিক মানের বইমেলা আয়োজন, দেশি ও আন্তর্জাতিক সেমিনার, প্রচার ও প্রামাণ্য চিত্র নির্মাণ, আন্তর্জাতিকমানের চলচ্চিত্র নির্মাণ, নাট্য উত্সব, দেশি ও আন্তর্জাতিক প্রকাশনা, সাহিত্য-সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও চিত্র প্রদর্শনী, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মসূচি, হলগ্রাফিক ভিডিও প্রদর্শনী, ওয়েবসাইটসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয় এই যৌথসভায়।  যৌথসভার শুরুতে খসড়া পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব ও বাস্তবায়ন কমিটির প্রধান সমন্বয়ক ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী।

মুজিববর্ষ উদযাপন উপলক্ষে একটি ওয়েবসাইটও তৈরি করা হয়েছে। ওয়েবসাইটি প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের কাছে পাঠানো হয়েছে বলে জানানো হয় সভায়।  যৌথসভায় ওয়েবসাইটটির খসড়া ডিজাইন উপস্থাপন করেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমদ পলক। পরে দুই কমিটির সদস্যরা বিভিন্ন বিষয়ে তাদের প্রস্তাবনা তুলে ধরেন। সভায় ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম বঙ্গবন্ধুর নামে নোবেল পুরস্কারের মতো উঁচুমানের আন্তর্জাতিক পুরস্কার দেওয়ার প্রস্তাব দেন। শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী বদ্ধভূমিগুলোতে এনভায়রনমেন্টাল থিয়েটারসহ বেশ কয়েকটি প্রস্তাব দেন। শোলাকিয়া ঈদ জামাতের ইমাম মাওলানা ফরিদউদ্দিন মাসউদ মাদরাসা শিক্ষার্থী, বিশেষ করে কওমি মাদরাসা শিক্ষার্থীদের কাছে বঙ্গবন্ধু বিষয়ে ব্যাপক প্রচারণার প্রস্তাব দেন। নাট্যশিল্পী সারা যাকের বঙ্গবন্ধুকে বিশেষ করে ৭ই মার্চের ভাষণ ভার্চুয়াল রিয়েলিটির মাধ্যমে তুলে ধরার প্রস্তাব দেন। বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান বঙ্গবন্ধুর পুরো জীবন নিয়ে প্রামাণ্য জীবনী লেখা শুরু করার প্রস্তাব দেন। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক দেশি ও বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বঙ্গবন্ধুর নামে ফেলোশিপ চালুর প্রস্তাব দেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গর্ভনর ড. আতিউর রহমান ৭৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে বিশেষ কর্মসূচি নিয়ে মুজিববর্ষের মধ্যে অতি দরিদ্রমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রস্তাব রাখেন। শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল ফরিদপুরের ভাঙায় বঙ্গবন্ধুর নামে একটি মান ভবন নির্মাণের প্রস্তাব দেন। পরে সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী জানান, উদযাপনে প্রতিটি বিভাগ ধরে ধরে ছোট ছোট সাব-কমিটি করে দেওয়া হবে।