রাতে ঘুম থেকে জেগে মাকে খোঁজে শুভ

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০১৬, ০০:০০
কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় ঈদুল ফিতরের দিন সকালে পুলিশ-জঙ্গি গুলি বিনিময়ের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান হতভাগ্য ঝর্ণা রাণী ভৌমিক। এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুতে মুষড়ে পড়েছে পুরো পরিবার। ছোট ছেলে স্কুলছাত্র শুভদেব খুব চাপা স্বভাবের। প্রায়ই মায়ের ছবির দিকে তাকিয়ে থাকে। মায়ের আঁচলে বাঁধা চাবির রিংয়ের আওয়াজ পেয়েই বুঝতে পারতো যে মা বাসায় ঢুকছে। এখনো কোনো কিছুর শব্দ হলেই মা এসেছেন ভেবে দৌড়ে গিয়ে বাড়ির গেট খুলতে যায়। রাতে সবসময় সে মায়ের সঙ্গেই ঘুমাতো। এখন রাতে প্রায়শই তার ঘুম ভেঙে যায়, তখন মাকে খুঁজতে থাকে শিশু শুভ।
 
শোলাকিয়া ঈদগাহ থেকে প্রায় তিনশ’ গজ দূরে চরশোলাকিয়া এলাকায়  ঘটনার দিন নিজ বাসায় ঝর্ণা মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। ঘরে তখন ছিলেন তার স্বামী গৌরাঙ্গ ভৌমিক ও দুই সন্তান তেজগাঁও মহিলা কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক বাসুদেব ভৌমিক ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া শুভদেব ভৌমিক। বাইরে গোলাগুলি চলতে থাকায় প্রায় দেড় ঘণ্টা গুলিবিদ্ধ স্ত্রীর মাথা কোলে নিয়ে বসে ছিলেন গৌরাঙ্গ ভৌমিক। তখন ঘরের বাইরে বের হবার কোনো উপায় ছিল না। স্বামীর কোলে মাথা রেখেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন ঝর্ণা রাণী ভৌমিক।
 
ঝর্ণার এই অপ্রত্যাশিত মৃত্যুকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না পরিবারের সদস্যরা। ঘটনার পাঁচ দিন পরও পরিবারে চলছে শোকের মাতম। গত মঙ্গলবার বিকালে নিহতের বাড়িতে গিয়ে সবাইকে শোকবিহ্বল দেখতে পাওয়া যায়। আত্মীয়-স্বজনরা এসে তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন।
 
ঝর্ণা রাণীর বড় ছেলে বাসুদেব ভৌমিক কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, তিনি সত্পুত্র হলেও মা কখনো এটা বুঝতে দেননি। নিজের সন্তান শুভ ও তাকে কখনো      আলাদা ভাবে দেখেননি। আপন মায়ের মতোই তাকেও তিনি সবসময় আগলে রেখেছেন। ছুটিতে বাড়িতে আসলে ভালো-মন্দ রেঁধে খাওয়ানোর জন্য তিনি ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়তেন। মা কখনো মাংস খেতেন না। বড় ছেলে পছন্দ করে বলে ঈদের আগের রাতে হাঁসের মাংস রান্না করেন তিনি।
 
বাসুদেব বলেন, এরকম ঘটনায়  আর  কোনো সন্তান যেন মা হারা না হয়। তিনি ছোট ভাইয়ের ভবিষ্যত্ নিয়ে খুবই চিন্তিত। বাড়িতে মা নেই, তিনিও কর্মস্থলে চলে যাবেন। কে তার ছোট ভাইকে দেখাশোনা করবে—এই চিন্তায় তিনি উদ্বিগ্ন। 
 
স্বামী গৌরাঙ্গ চন্দ্র ভৌমিক বলেন, আমি এখন আমার সংসার সামলাব কী করে। তিনি (ঝর্ণা) খুব শক্ত হাতে স্বল্প আয়ের সংসারের হাল ধরে রেখেছিলেন।
 

নিহত গৃহবধূর স্বজন মুক্তিযোদ্ধা মাধবগোবিন্দ দাস বলেন, একটি মৃত্যু পরিবারটিকে তছনছ করে দিয়ে গেছে। তিনি ঝর্ণা রাণীকে শহীদের মর্যাদা দানের জন্য সরকারের নিকট আবেদন জানান। প্রতিবেশীরা জানান, ঝর্ণা রাণী খুবই অমায়িক ছিলেন। হিন্দু-মুসলমান সকলের সঙ্গেই তার সদ্ভাব ছিল।