আমাদের শোনা মুক্তিযুদ্ধের গল্প

আপডেট : ২১ মার্চ ২০১৯, ১৮:২৫

মার্চ মাস স্বাধীনতা অর্জনের মাস। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর—মাঝখানের ৯টি মাস ছিল গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের। সংগ্রাম, যুদ্ধ, রক্ত আর বহু ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের এই স্বাধীনতা। এই লাল-সবুজের পতাকার মূল্যও তাই এত বেশি। বড়দের মতো ছোটরাও ভাবে গৌরবময় ইতিহাসের এই দিনগুলোকে নিয়ে। তাদের মুক্তিযুদ্ধ দেখার সৌভাগ্য হয়নি, কিন্তু তারা বইপুস্তক পড়ে, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গল্প, কবিতা, মুক্তিযোদ্ধাদের চিঠি, ডায়েরি পড়ে কিংবা বড়দের থেকে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনে জানতে চেষ্টা করে সেই দিনগুলোর কথা, গৌরবময় ইতিহাসের কথা। মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা সম্পর্কে তাদের অনুভূতি নিয়েই এ আয়োজন। গ্রন্থনা করেছেন—রুমান হাফিজ

 

মুক্তিযুদ্ধের এই ছবিটি এঁকেছে—সাইরা আফরা।

সে ঢাকার সিভিল এভিয়েশন স্কুল এন্ড কলেজে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে

 

 

 

আমার নানা মুক্তিযোদ্ধা  

ফারিহা আহসান অভ্র

 

আমার নানাকে সবাই মুক্তিযুদ্ধের কমান্ডার মতিন ভাই হিসেবে চিনত। নানা যুদ্ধে গেছেন শুনে অনেকে এই বাড়ির দিকে অন্য চোখে তাকাত। পরিবারের সবাইকে মেরে ফেলার হুমকিও দিত। কিন্তু কেউ ভয় পায়নি। নানুবাড়িতে গেলে সবকিছু রেখে আমি নানার পিছুপিছু লেগে থাকি। নানা আমাকে তাঁর যুদ্ধের সময়ের কত কথা, কত গল্প শোনান। নানা বলেন—‘যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে আমার পায়ে গুলি লাগে। সাথে যারা ছিল, কেউ কেউ যুদ্ধ চালিয়ে নিতে থাকে। দুজন মুক্তিযোদ্ধা আমাকে টেনে নিয়ে আসে আড়ালে। পা থেকে রক্ত ঝরছে। একজন মুক্তিযোদ্ধা মাথার গামছা ছিঁড়ে আমার পায়ে বেঁধে দেয়। এরপর আমাকে পাশের মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে নিয়ে যায়। ১০-১৫ দিন ওখানে থাকতে হয়। দুই মাস পর আমি একদিনের জন্য বাড়ি আসি। এর মধ্যে সুস্থ হয়েই আবার যুদ্ধে চলে যাই। নয় মাস পর দেশ স্বাধীন করে পতাকা উড়াতে উড়াতে গ্রামে ফিরে আসি।’

নানার মুখে কথাগুলো শুনে আমরা যেন যুদ্ধের দিনগুলো দেখতে পাই। নানাকে নিয়ে আমাদের গর্ব হয়। নানার মতো অনেকে যুদ্ধে গেছেন। অনেকে দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন। আমরা তাঁদের কথা স্মরণ করি। তাঁদের ত্যাগের বিনিময়ে এই দেশ আমরা পেয়েছি। আমরা জানি স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে রক্ষা করা অনেক কঠিন। দেশকে রক্ষা করা আমাদের কর্তব্য।

 

নবম শ্রেণি, বটমলী হোম বালিকা উচ্চবিদ্যালয়, ঢাকা

 .

আমি যদি মুক্তিযোদ্ধা হতাম!

অনন্য যারিফ আকন্দ

 

মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের বিষয়ে আমার হূদয়ে অন্যরকম এক অনুভূতি তৈরি হয়ে আছে অনেকদিন থেকেই। আর এটি হয়েছে বাবা-মা’র কাছে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের গল্প শুনে শুনে।

আমার বয়স তখন চার কি পাঁচ বছর। একদিন বাবা-মা অফিস থেকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন। হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, ‘চলো, একজন লোকের সাথে তোমাকে পরিচয় করিয়ে দেবো।’ আমি জানতে চাই, ‘কে বাবা?’

‘চলো না। গেলেই বুঝতে পারবে।’ তাগাদা দিয়ে মা বললেন।

বাসা থেকে বাবা-মা’র অফিস দুই মিনিটের পথ। তাঁরা আমাকে যাঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন, তিনি হলেন ‘গ্রুপ কিউএ’-এর জেনারেল ম্যানেজার মহীউদ্দিন আহমেদ স্যার। আমার প্রথম দেখা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু সেদিন তাঁর কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনার সুযোগ হয়নি।

বিভিন্ন সময় অনেকের কাছ থেকেই মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনেছি। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা মুহম্মদ আব্দুল হালিম স্যারের গল্প আমার মনকে ভীষণ নাড়া দিয়েছিল। তখন আমি প্রথম শ্রেণিতে পড়ি। মহান স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান। অধ্যক্ষের ভাষণে তিনি খুব সুন্দর করে মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলেছিলেন। তাঁর বর্ণনা শুনে তখন বারবার মনে হচ্ছিল, ‘ইস! আমি যদি মুক্তিযোদ্ধা হতাম!’

 

৫ম শ্রেণি, দি হলি চাইল্ড স্কুল, মানিকগঞ্জ

 

দাদুর চোখে মুখে যুদ্ধকালীন সময়কে খুঁজে পাই

ইয়া সুলতানা মৌসুমী

 

মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবীর জেনারেল এম এ জি ওসমানীর পৈতৃক নিবাস ওসমানী নগরে আমার জন্ম। আমার উপজেলার মধ্যে শেরপুরে সম্মুখযুদ্ধ হয়। এসব কারণে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমার জানার আগ্রহ অনেক বেশি। আমার দাদা এডভোকেট মো. মনির উদ্দিন ও দাদু মিনারা বেগমের কাছে থেকে প্রায়ই আমি যুদ্ধ চলাকালীন সময়ের গল্প শুনি। দাদু যখন তাঁর বান্ধীদের ওপর পাকিস্তানিদের করা নির্যাতনের কথা বলেন, তখন তাঁর চোখে মুখে আমি সেই যুদ্ধ চলাকালীন সময়কে খুঁজে পাই। তখন আমার সব প্রশ্নের উত্তর দেন দাদু। বই পড়ে, চলচ্চিত্র দেখে এবং দাদুর থেকে গল্প শুনে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জেনেছি।  

বৃহত্তর বালাগঞ্জ উপজেলায় তিনটি গণকবরের স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হলেও ওসমানী নগরে আজও শহিদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাযুক্ত কোনো স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়নি। আমি দাবি জানাই বৃহত্তর বালাগঞ্জ উপজেলায় স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হোক।

 

দশম শ্রেণি, শাহজালাল উপশহর হাই স্কুল, সিলেট

 

বাবার কাছে শুনেছি মুক্তিযুদ্ধের কথা   

শাওন আহমেদ

 

সেই ছোটবেলার কথা। গল্পে গল্পেই বাবার কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধের কথা শুনেছি। তখন তো এতটা বুঝতাম না, তবুও যখন শুনতাম, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বাবাকে নানারকম প্রশ্ন করতাম, তার চেয়ে বড় কথা তখন না বোঝা সত্ত্বেও আমি নিজেকে যোদ্ধা ভাবতাম এবং যুদ্ধে যেতে চাইতাম! কিন্তু, যখন বুঝতে শিখেছি, তখন সবার আগে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীদের প্রতি ঘৃণা তৈরি হয়। মনে মনে ভাবি, কীভাবে মানুষ নিজের দেশের বিপক্ষে অবস্থান নিতে পারে? মুক্তিযুদ্ধের কথা শুনে,  বাংলার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের অনুপম দৃষ্টান্তের কথা জেনে নিজের ভেতর শক্তি সঞ্চার হতো। প্রথম কোনো মুক্তিযোদ্ধার সাথে সাক্ষাত্ হয় এক বিয়ের অনুষ্ঠানে। তিনি সম্পর্কে আমার দাদা হন। তাঁকে দেখে আমার ঠিক গর্ব যেমন হচ্ছিল তেমনি তাঁর প্রতি সম্মান আর হিংসেও হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল যেন, সাক্ষাত্ মুক্তিযুদ্ধ দেখছি। ওনার সাথে কথা বলতে গিয়ে আমার হাত-পা কাঁপছিল। দেশের জন্য বিশাল অবদানের কারণে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসছিল। হিংসে হচ্ছিল কারণ আমিও যদি তাঁর মতো মুক্তিযোদ্ধা হতে পারতাম!

 

একাদশ শ্রেণি, নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজ, রাজশাহী

 

বই পড়ে জেনেছি

মিদহাদ আহমদ

 

তখন খুব সম্ভবত ক্লাস ফাইভে পড়ি। জানুয়ারি মাসের প্রথমদিকে হবে। ক্লাস ফোরের বার্ষিক পরীক্ষার পর বেশ কয়েকদিনের বন্ধে বই পড়ার অভ্যাস তৈরি হয়েছিল। তাই নতুন বই পেয়ে বাংলা বইয়ের পাতা নেড়েচেড়ে দেখছিলাম। বঙ্গবন্ধুর চশমা পরা ছবিটা দেখেই পড়তে শুরু করি। ব্যস। এই শুরু। গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়লাম। বড় হওয়ার সাথে সাথে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা বই আর নির্মিত চলচ্চিত্র দেখে জানার সুযোগ হয়েছে। বিশেষ করে ‘রাইফেল রোটি আওরাত’, ‘একাত্তরের দিনগুলি’ আর ‘মা’ বইটার কথা এখনো স্মৃতিতে গেঁথে আছে।

 

একাদশ শ্রেণি, জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ, সিলেট