দেশের শিক্ষাঙ্গনকে সন্ত্রাস ও জঙ্গিমুক্ত করতে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে জঙ্গিবাদ বিরোধী কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে পুলিশ। এছাড়া খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বিতর্ক প্রতিযোগিতার মতো সহশিক্ষা কার্যক্রম জোরদার করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যেসব স্থানে জঙ্গিবাদ নিয়ে বৈঠক হতে পারে সে জায়গাগুলো চিহ্নিত করে নজরদারি বাড়ানোসহ ১২ দফা প্রস্তাব তুলে ধরা হয় পুলিশের পক্ষ থেকে। আর এ দফাগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানারও পরামর্শ দেয়া হয়েছে। গতকাল রবিবার রাজধানীর খামারবাড়ি কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আয়োজিত ‘জননিরাপত্তা ও আইনশৃংখলা বিষয়ক মতবিনিময়’ অনুষ্ঠানে এসব প্রস্তাব দেওয়া হয়। ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান ও অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মনিরুল ইসলাম মূল প্রবন্ধে এসব প্রস্তাব তুলে ধরেন।
অন্যান্য প্রস্তাবগুলো হলো মসজিদে বা নামাজের স্থানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বেশিক্ষণ অবস্থান করতে পারবেন না। শিক্ষার্থীরা অনিয়মিত হলে অবশ্যই অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। লাইব্রেরিতে জঙ্গিবাদের কোনো বই-পুস্তক থাকলে তা পুড়িয়ে ফেলতে হবে। সন্ত্রাসবাদ বিরোধী কর্মসূচিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অংশ নিতে হবে। একাডেমিক কার্যক্রমেও জঙ্গিবাদবিরোধী বিষয় থাকতে হবে। নিয়মিতভাবে বাঙালি সংস্কৃতির চর্চা থাকতে হবে। যৌক্তিক কারণ ছাড়া কোনো শিক্ষার্থী তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত থাকলে পুলিশকে জানাতে হবে। অপরাধে জড়িত বলে সন্দেহ হলেই কাউন্সেলিংয়ের আওতায় আনতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাসবাদবিরোধী গবেষণা করতে হবে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িত শিক্ষক নামধারীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে। তিনি বলেন, প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জঙ্গি বিরোধী কমিটি গঠন করা হবে। জঙ্গি বিরোধী সামাজিক সচেতনতায় এলাকার আলেম-ওলামা ও গুণীজনদের সম্পৃক্ত করা হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক, শিক্ষা সচিব সোহরাব হোসাইন, ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া, র্যাব মহাপরিচালক বেনজীর আহমদ, সাবেক ছাত্রনেতা ও পোর্ট সিটি ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান এনামুল হক শামীম, স্কলাসটিকা স্কুল প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) কাউসার আহমদ, মানারাত স্কুলের অধ্যক্ষ মেহেদি হাসান প্রামাণিক, ইউডার উপাচার্য প্রফেসর এমাজউদ্দিন আহমেদ, নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) আতিকুল ইসলাম, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটির উপাচার্য আব্দুল মান্নান চৌধুরী, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় মালিক সমিতির সভাপতি শেখ কবির হোসেন প্রমুখ।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উদ্দেশে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে চিনতে হবে। যদি শিক্ষক যুক্তি দেখান যে এতো শিক্ষার্থীকে চিনবো কী করে, তাহলে বলবো, যদি চিনতেই না পারেন তবে ভর্তি করালেন কেন, যতোটুকু সামর্থ্য রয়েছে ততটুকু করবেন। ৩০ জনকে চিনলে ৩০ জনই ভর্তি করান। কিন্তু আপনার ছাত্র যেন জঙ্গিবাদের মতো বিপথে না যায়।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যদি কোন জাতীয় দিবস পালন না করে, জাতীয় পতাকা না উত্তোলন করে তবে মনিটরিং করে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদের মতো বিষয়ের ক্ষেত্রে বিরোধী সামাজিক চেতনা গড়ে তুলতে হবে, সামাজিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। যারা ঐক্যবদ্ধতার বিরোধী, অন্যায় কাজ, মানবতাবিরোধী ও জঙ্গিবাদের পক্ষে তাদের প্রতিরোধ করতে হবে। একঘরে করতে হবে। আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
পাঠ্যক্রম প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, আপনি যেই মিডিয়ামেই পড়ান না কেন বাধ্যতামূলক বাংলা পড়ানোর কথা বলে দেওয়া আছে। কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠানই তাদের বেধে দেওয়া কারিকুলাম মানে না। কিন্তু সেটা না মানলে আর পার পাবেন না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ করতে সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়াবার আহবান জানিয়ে বলেন, জঙ্গিরা নিজেদের দোষ স্বীকার করে ফিরে আসুক, তাদের প্রচলিত আইনে বিচার করা হবে। মন্ত্রী বলেন, একসময় মাদ্রাসার ছাত্রদের জঙ্গিরা টার্গেট করে তাদের অপকর্মে লিপ্ত করাতো। ফলে আমরা সেখানে ব্যাপকভাবে নজরদারি করি এবং মাদ্রাসার ছাত্ররা যেন ভুল পথে পা না বাড়ায় সেখানে আমরা সক্ষম হয়েছি। এখন মাদ্রাসা থেকে সরে গিয়ে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের টার্গেট করে তাদের জীবনকে বিপদের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এখন আমরা এখানে অনেক বেশি সচেতন হয়েছি ।
আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক জঙ্গি বিরোধী সচেতনতা বৃদ্ধিসহ জঙ্গি কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে পরিবার ও শিক্ষকদের সহযোগিতা চান।
র্যাব মহাপরিচালক বেনজির আহমেদ আরো বলেন, বাংলাদেশে কেউ কিছু করে সাকসেসফুল হবেন না। আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ হই, তাহলে এসব মুষ্টিমেয় লোককে খুঁজে বের করে নিশ্চিহ্ন করার ক্ষমতা রাখি।
তিনি বলেন, আমরা অনুরোধ করব, যারা বিপথে গেছেন, ফিরে আসেন।
আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, জঙ্গিবাদ দেশীয় ও বৈশ্বিক সমস্যা। এই সমস্যা সমাধানে রাষ্ট্র চুপ থাকতে পারে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও কার্যকরী ভূমিকা পালনে বদ্ধপরিকর।
সভায় পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে ১৯৯২ সালে ধর্মকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাসবাদী কার্যক্রমের সূচনা হয়। ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত তা ব্যাপকতা পায়। ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে গণজাগরণ আন্দোলন শুরুর পর একটি মহল তার বিপরীতে সন্ত্রাসবাদী কার্যক্রমকে উস্কে দেয়। তারপর থেকে বাংলাদেশে দ্বিতীয় পর্যায়ে সন্ত্রাসবাদী কার্যক্রমের শুরু হয়েছে।
অনুষ্ঠানে ছাত্রলীগ সভাপতি সাইফুর রহমান বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সরব রাজনীতি নেই, নীরব রাজনীতি আছে। নীরব রাজনীতি মানে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে হিযবুত তাহ্?রীরের সংগঠন আছে।
সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি উন্মুক্ত হোক। ছাত্ররাজনীতি করতে পারবে না, এই মুচলেকা দিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হয়। এ সিদ্ধান্ত ছাত্রসমাজ মানবে না।
