হৃদয়জুড়ে হুমায়ূন

চাঁদের পসরা সাজানো চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী আজ

আপডেট : ২০ জুলাই ২০১৬, ১৪:৩৫
আজ বাংলাদেশের কিংবদন্তিতুল্য কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১২ সালের এইদিনে যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। চিকিত্সার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে ছিলেন। বাংলাদেশে নানা অনুষ্ঠানে তার ভক্ত-শুভার্থীরা কামনা করেছিলেন তিনি সুস্থ হয়ে ফিরে আসবেন তেরশ নদীর এই দেশে। কিন্তু মানুষের সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। চলে গেছেন না ফেরার দেশে।
 
তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোকে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল জাতি। সেই শোক আজো কাটেনি ভক্তদের হূদয় থেকে। হুমায়ূন নেই, কিন্তু তিনি বেঁচে আছেন লক্ষ হূদয়ে। তাঁকে নিয়ে বইমেলায় আসছে বই। মানুষ পরম মমতায় সংগ্রহ করছেন সেই সব বই। মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে দেশব্যাপী নানা কর্মসূচির আয়োজন হয়েছে। টেলিভিশন চ্যানেলগুলো সাজিয়েছে হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে অনুষ্ঠানমালা। পরিবার এবং বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে সমাধিস্থল নূহাশ পল্লীতে কর্মসূচির আয়োজন হয়েছে: কবর জিয়ারত, কোরানখানি, আলোচনা সভা, ব্লাড গ্রুপিং, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল, এতিমদের মাঝে খাবার বিতরণ, রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, ক্যান্সার সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ। ভক্তদের সংগঠন ‘হিমু পরিবার’ ৪৭টি জেলায় কর্মসূচি নিয়েছে। সারাদেশে ক্যান্সার সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ, সেমিনার, রক্তদান কর্মসূচি, হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল, গরিবদের মাঝে খাবার বিতরণ, হুমায়ূন আহমেদের নাটক, সিনেমার প্রদর্শনী, আলোচনা সভা ও সেমিনার করা হবে। এ ছাড়াও নূহাশ পল্লী ও আশপাশের এলাকায় বিনামূল্যে রক্তদান কর্মসূচির আয়োজন করেছে হিমু পরিবার।
 
হুমায়ূন আহমেদ বলেছিলেন, মৃত্যুর আগেরদিন পর্যন্ত লিখে যেতে চাই। লেখালেখিই আমার বিশ্রাম। লেখালেখি বন্ধ হলে আমার বেঁচে থাকা অর্থহীন হয়ে পড়বে, আমি বাঁচতে পারব না। পাঠকদের উদ্দেশে তার আবেদন ‘দোয়া করবেন, আমি যেন আমৃত্যু লিখে যেতে পারি।’ তার সেই আশা পূরণ হয়েছিল। মৃতুর আগে পর্যন্ত লিখেছেন। নিউইয়র্কে হাসপাতালের বিছানায় শুয়েও তিনি ‘দেয়াল’ উপন্যাস লিখেছেন।
 
হুমায়ূন আহমেদ দেশের বর্তমান সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক। উপন্যাসে নিজের প্রতিভার বিস্তার ঘটলেও তার শুরুটা কবিতা দিয়ে। এরপর নাটক, শিশুসাহিত্য, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী, চলচ্চিত্র পরিচালনা থেকে শিল্প-সাহিত্যের বহু ক্ষেত্রে তিনি রেখে গেছেন নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর। হুমায়ূন আহমেদ বাংলা সাহিত্যে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর জনকও বটে। ১৯৭২ সালে প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’ প্রকাশের পর পরই তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।
 
হুমায়ূন আহমেদ ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুরে জন্মগ্রহণ করেন। ডাক নাম কাজল। বাবা ফয়জুর রহমান আহমেদ ও মা আয়েশা ফয়েজের প্রথম সন্তান তিনি। ১৯৬৫ সালে বগুড়া জেলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক, ১৯৬৭ সালে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক, ১৯৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়ন শাস্ত্রে স্নাতক ও ১৯৭২ সালে স্নাতকোত্তর পাস করেন। ১৯৮২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। নব্বই দশকের মাঝামাঝি তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করে লেখালেখিতে পুরোপুরি মনোযোগ দেন। হুমায়ূন আহমেদের লেখা উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে নন্দিত নরকে, লীলাবতী, কবি, শঙ্খনীল কারাগার, গৌরীপুর জংশন, নৃপতি, বহুব্রীহি, এইসব দিনরাত্রি, দারুচিনি দ্বীপ, শুভ্র, নক্ষত্রের রাত, কোথাও কেউ নেই, আগুনের পরশমণি, শ্রাবণ মেঘের দিন, জোছনা, জননীর গল্প প্রভৃতি। পরিচালিত চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে আগুনের পরশমনি, শ্যামল ছায়া, শ্রাবন মেঘের দিন, দুই দুয়ারী, চন্দ্রকথা ও নয় নম্বর বিপদ সংকেত। সম্প্রতি মুক্তিপ্রাপ্ত তার সর্বশেষ চলচ্চিত্র ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ও জয় করেছে দর্শক ও সমালোচকদের মন। চলচ্চিত্রটি এ বছর অস্কার পুরস্কারে বিদেশি চলচ্চিত্র বিভাগে প্রাথমিক মনোনয়নও পেয়েছে।
 
টিভি নাট্যকার হিসেবেও হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন সমান জনপ্রিয়। আশির দশকের মাঝামাঝি তার প্রথম টিভি নাটক ‘এইসব দিনরাত্রি’ তাকে এনে দিয়েছিল তুমুল জনপ্রিয়তা। তার হাসির নাটক ‘বহুব্রীহি’ এবং ঐতিহাসিক নাটক ‘অয়োময়’ বাংলা টিভি নাটকের ইতিহাসে অনন্য সংযোজন। নাগরিক ধারাবাহিক ‘কোথাও কেউ নেই’ এর চরিত্র বাকের ভাই বাস্তব হয়ে ধরা দিয়েছিল টিভি দর্শকদের কাছে।
 
নেত্রকোনায় নানা অনুষ্ঠান
 
নেত্রকোনা প্রতিনিধি জানান, নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুর গ্রামে তার প্রতিষ্ঠিত শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ে দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়েছে। মোহনগঞ্জে তার মামাবাড়িতে অনুষ্ঠান ছাড়াও  নেত্রকোনা শহরে  হুমায়ুন স্মৃতি সংসদের উদোগে  স্মরণসভার আয়োজন হয়েছে।
 
গৌরীপুর জংশনে মৃত্যুবার্ষিকী
 

গৌরীপুর (ময়মনসিংহ) সংবাদদাতা জানান, হুমায়ূন আহমেদ লেখনিতে গৌরীপুর রেলওয়ে স্টেশনের চিত্র তুলে ধরে লিখেছিলেন ‘গৌরীপুর জংশন’ উপন্যাস। নন্দিত এই লেখক নিজবাড়ি কেন্দুয়া কিংবা মামাবাড়ি মোহনগঞ্জ যাওয়ার পথে গৌরীপুর জংশন হয়ে যেতেন। এই অঞ্চলের রাস্তাঘাট উন্নত ছিল না। রেলগাড়িই ছিল প্রধান বাহন। আর সেই সুবাদে নন্দিত এই কথাসাহিত্যক গৌরীপুর স্টেশনে রাত্রিযাপন করতে গিয়ে গৌরীপুরের স্মৃতিকে ধরে রেখে গৌরীপুর রেলওয়ে জংশনের কিছু চিত্র তুলে ধরে রচনা করেন ‘গৌরীপুর জংশন’ উপন্যাসটি। ৪র্থ মৃত্যুবার্ষিকীতে ভক্তরা ‘গৌরীপুর জংশন’ বইয়ের প্রতিটি পাতা উল্টিয়ে লেখার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে চেষ্টা করছেন ‘হুমায়ূন আহমেদের গৌরীপুর জংশনকে’। সেই স্মৃতিময় রেলওয়ে স্টেশনে ৪র্থ মৃত্যুবার্ষিকী পালন করতে যাচ্ছে ‘কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহাম্মেদ স্মৃতি পরিষদ’। রয়েছে শোকর্যালি, আলোচনাসভা ও দোয়া মাহফিল।