অধ্যাপক হাসান আবদুল কাইয়ূম
যশোর মানে সেতু। পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার সেতুবন্ধন এ যশোর। যশোরের সেনাবাহিনী নিয়ে রাজা প্রজাপাদিত্যের বিদ্রোহ দমনের জন্য মোগল সম্রাট আকবরের আমলে রাজা মানসিংহের এখানে আগমন ঘটে। এই বাহিনীর সঙ্গে সৈয়দ সুলতান এসেছিলেন এখানে। চাঁচড়ার রাজা সুখ দেব সিংহ রায় রাজবাড়ী খিড়কী এলাকায় তাঁকে প্রচুর লাখেরাজ সম্পত্তি উপহারস্বরূপ প্রদান করেন। এখানে সৈয়দ সুলতান (রহ) খানকা শরীফ স্থাপন করেন। তিনি সারা দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলায় ইসলাম প্রচারে প্রভূত অবদান রাখেন। তাঁর বংশধরেরা পরম্পরাগতভাবে ইসলামের খেদমত আঞ্জাম দেন। এই বংশের মওলানা শাহ আবদুল করীম ইলমে তাসাওউফের ওপর ‘এরশাদে খালেকীয়া’ নামে যে গ্রন্থ রচনা করেন তা বাংলা ভাষায় সর্বপ্রাচীন ও নির্ভরযোগ্য মৌলিক গ্রন্থ। তিনি ১৮৯১ সালে খড়কী শরীফে ওরস মুবারক কায়েম করেন। তাঁর সময়ে ১৫, ১৬ ও ১৭ই চৈত্র এই ওরস অনুষ্ঠিত হতো।
১৯১৫ সালে তিনি ইন্তেকাল করলে তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র মওলানা শাহ আবু নঈম তাঁর কায়েম মোকাম বা গদ্দিনশীন হন। তাঁর সময়েও এই ওরস ৩ দিন ধরে অনুষ্ঠিত হতো। ১৯২৯ সালে শাহ আবু নঈম (রহ) ইন্তেকাল করলে ১৯৩১ সালে তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতা মওলানা শাহ আবুল খায়ের তাঁর ভ্রাতার স্থলাভিষিক্ত হন। ওরসে লোকের ভিড় হতো যে স্থান সংকুলান করা কঠিন হয়ে পড়তো। একবার ভক্তদের ভিড়ে পড়ে ৩ জন লোকের মৃত্যু হয়। তার পরের বছর থেকে ১৬ই চৈত্র এই একদিন ওরস হয়ে আসছে। এই ওরস মুবারকে কুরআন তেলাওয়াত, ওয়াজ, খতমে খাজেগান, যিক্র-আযকার মিলাদ ও কিয়াম শরীফ, জিয়ারত প্রভৃতি হয়ে আসছে।
১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে মওলানা শাহ আবুল খায়ের ইন্তেকাল করলে মওলানা শাহ আবদুল মতীন (রহ) খড়কীর গদ্দিনশীন পীর হন। তাঁর সময়ে এই ওরস মুবারকের জৌলুস বৃদ্ধি পায়। শত শত ছাগল তবারক হিসাবে জবেহ্ হতো। প্রতিষ্ঠিত হয় বিশাল এতিমখানা। তাঁর সময়ে বহু গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ২০১১ সালে ১৭ই সেপ্টেম্বর তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র শাহ কামরুল হাসান খড়কী দরবারের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তিনি সিলসিলার কর্মতত্পরতা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে যাচ্ছেন। চাঁচড়ার রাজবাড়ী খিড়কী এলাকায় অবস্থিত হওয়ার কারণে এলাকার নামকরণ হয়ে যায় খড়কী। প্রতি বছর ১৬ই চৈত্র এই বার্ষিক ওরস হয়ে আসছে। মাঝখানে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে এই ওরস হতে পারেনি পাক হানাদার বাহিনীর আক্রমণের কারণে। পাক হানাদার বাহিনী আগুন লাগিয়ে পীর বাড়ি পুড়িয়ে দেয়। সে এক করুণ কাহিনি। ১৬ই চৈত্র খড়কী শরীফে ওরস মুবারকে প্রচুর লোক সমাগম হয়। বর্তমান গদ্দীনশীন পীর শাহ কামরুল ইসলাম হাসান মাহফিল পরিচালনা করেন। মিলাদ কিয়াস পরিচালনা করেন আলহাজ শাহ আরিফ বিল্লাহ্ মিঠু।
lলেখক:পীর সাহেব, দ্বারিয়াপুর শরীফ,
সাবেক পরিচালক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ
