র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার ভার্সিটি ছাত্র নিখোঁজের তালিকায়

আপডেট : ২১ জুলাই ২০১৬, ২৩:৫৫
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রাশেদ গাজী। তার বাবা আব্বাস গাজী অভিযোগ করেন, গত ২১ জুন বিকালে কদমতলী এলাকার পাঠশালা কোচিং সেন্টারের মেস থেকে ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে রাশেদকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। এ ঘটনার পর তিনি ২৫ জুন  যশোর কতোয়ালি থানায় একটি জিডি করেন। ১৪ জুলাই র্যাব-১ ঢাকার উত্তরার ৬ নম্বর সেক্টরে রাস্তায় এক অভিযানে রাশেদ গাজী ও কামরুজ্জামান সাগর নামে দুই যুবককে ১ টি পিস্তল, ২ রাউন্ড গুলি ও ৯ টি ককটেলসহ গ্রেফতার করে বলে দাবি করা হয়। র্যাব তার ছেলে রাশেদকে জেএমবি’র একজন নেতা বলে দাবি করে। এ ঘটনার পর ১৯ জুলাই র্যাব সদর দফতর থেকে ২৬২ জনের নিখোঁজের তালিকা প্রকাশ করে। ঐ তালিকায় রাশেদ গাজীকে ৮৯ নম্বরে নিখোঁজ দেখানো হয়েছে। তালিকা প্রকাশের পর বুধবার বিকালে সাতক্ষীরার তালা থানার সাতপাখিয়া গ্রামে কৃষক আব্বাস গাজী ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে তার ছেলের সঙ্গে দেখা করেন।
 
আব্বাস গাজী অভিযোগ করেন, তার ছেলে কোন জঙ্গি কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারে না। র্যাব তার ছেলেকে মিথ্যা পরিচয় দিয়ে ধরে নিয়ে গিয়ে আটকে রাখে। পরে ঢাকায় তাকে জেএমবি নেতা হিসাবে অস্ত্রসস্ত্র দিয়ে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়। তিনি আরো দাবি করেন, তার ছেলে যশোরে টিউশনি করে পড়াশুনার খরচ চালায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছেও তার বিরুদ্ধে কোন জঙ্গি কার্যক্রম বা শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কোন অভিযোগ নেই।
 
এ ব্যাপারে র্যাবের মিডিয়া এন্ড লিগ্যাল শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমদু খান বলেন, র্যাবের তল্লাশির সময় রাশেদ গাজী ও কামরুজ্জামানকে অস্ত্র ও ককটেলসহ গ্রেফতার করা হয়েছিল। তবে গ্রেফতার রাশেদ গাজীর নাম কিভাবে নিখোঁজের তালিকায় এলো-এ বিষয়টি অবশ্যই তদন্ত করা হবে। তারপরও রাশেদ গাজী জঙ্গি কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হওয়ার জন্যই তিনি আত্মগোপনে গিয়েছিলেন। তারই জের ধরে তার বাবা থানায় একটি জিডি করেন। এই জিডির সূত্রে র্যাবের নিখোঁজের তালিকায় তার নাম এসেছে। কিন্তু ঘটনার দিন ১৪ জুলাই রাশেদ গাজী তার সহযোগীকে নিয়ে একটি অপারেশন করার পরিকল্পনা নেন। ঐ সময় র্যাবের তল্লাশিতে তিনি ধরা পড়েন।
 
এরকম র্যাবের প্রকাশিত নিখোঁজ তালিকা থেকে এমন আরো কয়েকজনের সন্ধান মিলেছে যাদের কেউবা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছেন আবার অনেকে নিজ কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করছেন। এ তালিকায় অন্তত ৬৫ জনের নাম রয়েছে, যারা জঙ্গি কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং আত্মগোপন করেছেন। এই ৬৫ জনের অবস্থান নিশ্চিত হতে পুলিশ ও র্যাব কাজ করছে।
 
র্যাবের তালিকার এক নম্বরে থাকা সাইদুল ইসলামও ঢাকায় তার কর্মস্থলে রয়েছেন। তিনি পল্টনে ব্যাংক এশিয়ায় অফিস সহকারী। তালিকার ২১৫ নম্বরে থাকা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রহমত উল্লাহ রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি রয়েছেন। র্যাবের নিখোঁজ তালিকা প্রকাশের অনেক আগেই রাবি শিক্ষক অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকী হত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার সন্দেহে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে।
 
নিখোঁজের তালিকায় থাকা মগবাজারের টিঅ্যান্ডটি কলোনির জাহাঙ্গীর আলম বলেন, নিখোঁজ হইনি। প্রকৃতপক্ষে তিনি তার স্কুলপড়ুয়া মেয়ের খোঁজ না পেয়ে ১৩ ফেব্রয়ারি একটি জিডি করেছিলেন রমনা থানায়। পরে মেয়ে ফেরত আসে।
 
২২ এপ্রিল থেকে নিখোঁজ চাঁপাইনবাবগঞ্জের রাজমিস্ত্রি বাদশা আলীর অবস্থান জানতে পেরেছেন তার স্বজনরা। তার ভাই ওয়াহাব জানান, ৭ জুলাই ফোন করে বাদশা জানিয়েছেন, তিনি ভারতে আছেন। পারিবারিক বিরোধের কারণে তিনি ঘর ছাড়েন বলে জানিয়েছেন। তালিকার এস এম তাহসানের মা জাহানারা বেগম জানান, ৭ ফেব্রুয়ারি নিখোঁজের এক সপ্তাহ পরই তিনি ছেলের সন্ধান পান। তাহসান পারিবারিক বিরোধের বাড়ি  ছেড়েছিলেন।
 
 কলাবাগানের তরুণ মাহমুদুর রহমান কাজল ও আদনান গত মার্চে আলাদাভাবে নিখোঁজের একদিন পর ফিরে আসেন বলে জানায় পুলিশ। এরপরও এই দুই জনের নাম নিখোঁজের তালিকায় এসেছে।
 
অন্যদিকে, নিখোঁজের তালিকায় থাকা নরসিংদীতে শাহাজ উদ্দিন (১৯) ও কমর উদ্দিন (৩০) নামের দুইজনের সন্ধান মিলেছে। এর মধ্যে শাহাজ উদ্দিন নিজের বাড়িতেই অবস্থান করছেন। অপরজন কমর উদ্দিন প্রবাসে কর্মরত। শাহাজ উদ্দিন রায়পুরা উপজেলার মহেষপুর গ্রামের মৃত হাবিবুর রহমানের ছেলে। শাহাজ একরাতে নিখোঁজ হওয়ার পরদিন দুপুরে স্থানীয় সড়কের পাশে তাকে অজ্ঞান অবস্থায় পাওয়া যায়। এ ঘটনায় তার নামে থানায় সাধারণ ডায়েরি হয়েছিল। বর্তমানে তিনি নিজ বাড়িতেই অবস্থান করছেন।
 
অপরদিকে মনোহরদী উপজেলার কৃষক আব্দুল গণি মিয়ার ছেলে দীর্ঘদিন ধরে কাজ নিয়ে সৌদি আরবে অবস্থান করছেন। আড়াইমাস আগে ছুটিতে দেশে এসেছিলেন তিনি। সেসময় পাসপোর্ট সংক্রান্ত কাজে ঢাকায় যাওয়ার পর সেখান থেকে বাড়িতে না ফিরে বেড়াতে যান খুলনার এক বন্ধুর বাড়িতে। তার বাড়ি না ফেরার ঘটনায় ও মোবাইল ফোন বন্ধ পেয়ে বড় ভাই কামাল হোসেন রাজধানীর তেজগাঁও থানায় জিডি করেছিলেন।
 
পাইলট রাতুল বাসায় ফেরেননি : গত বছরের ১৫ জুলাই রাজধানীর আদাবরের বায়তুল আমান হাউজিংয়ের ১০ নম্বর সড়কের ৮৪৫ নম্বর বাসা থেকে পাইলট মাহমুদুল আহসান রাতুল বের হয়ে আর ফেরেননি। মঙ্গলবার জঙ্গি সন্দেহে র্যাব  নিখোঁজ ২৬২ জনের যে তালিকা প্রকাশ করেছে, সেখানে রয়েছে রাতুলের নাম। তবে পরিবারের সদস্যরা এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না রাতুল জঙ্গি কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হতে পারে।
 
রাতুলের স্বজনরা জানান, যেদিন রাতুল বাসা থেকে বেরিয়ে যান, সেদিন সে ফেসবুকে এক বান্ধবীর সঙ্গে তোলা ছবি আপলোড করে। সায়েদা নামে ওই বান্ধবী তার সঙ্গেই পাইলটের কোর্স করেছিলেন। তার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক ছিলো রাতুলের। তবে প্রেমের সম্পর্কের কথা অস্বীকার করেছেন বিদেশি একটি এয়ারলাইন্সে কর্মরত সায়েদা।
 
প্রকৌশলী রাহাত নিখোঁজ :রাজধানীর মোহাম্মদপুরের চন্দ্রিমা হাউজিংয়ের একটি নির্মাণধীন ভবনের প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করতেন রাহাত বিন আব্দুল্লাহ। থাকতেন পাশেরই এক বাসায় সাবলেট। গত মাসের ১৮ তারিখে নিখোঁজ হন তিনি। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, সেদিন কর্মস্থলে বসে ছিলেন রাহাত। বেলা ১১টার দিকে হঠাত্ দুই ব্যক্তি তার সঙ্গে দেখা করতে আসেন। তাদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে কর্মস্থল থেকে চলে যান রাহাত। এরপর থেকে তার আর কোনও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
 
নোয়খালীর ৬ নিখোঁজের মধ্যে একজনকে সন্দেহ : নোয়াখালী প্রতিনিধি জানান, জেলার নিখোঁজ ৬ জনের মধ্যে একজনকে জঙ্গি তত্পরতার সাথে সম্পৃক্ত থাকার  সন্দেহ পোষণ করছে পুলিশ । জেলার পুলিশ সুপার মোঃ ইলিয়াছ শরিফ এই বিষয় নিশ্চত করে জানান, নিখোঁজদের মধ্যে একজন জেলার সদর উপজেলার সুধারাম থানার পশ্চিম মাইজদী গ্রামের আবদুল কাইয়ুমের পুত্র জোবায়ের হোসেন (২০)। তিনি গত ২৫ মে থেকে নিখোঁজ রয়েছে।
 
গাইবান্ধার নিখোঁজ দুই : গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, নিখোঁজ তালিকায় গাইবান্ধার দুই জনের নাম রয়েছে। এরা হলেন, সোহেল রানা (২৫) ও ইদু মিয়া ওরফে মিন্টু (৩৫)। সোহেল রানা ঢাকার আশুলিয়া থানার গৌরিপুর এলাকায় থাকেন। ২০০৬ সালের ২৫ এপ্রিল ঢাকার আশুলিয়া এলাকা থেকে নিখোঁজ হয়। সেসময় আশুলিয়া থানায় জিডি করা হয়। ইদু মিয়া ওরফে মিন্টু ২০১৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর চট্রগ্রামের ইপিজেট এলাকা থেকে নিখোঁজ হয়।
 

সাতক্ষীরায় তিন ছাত্রসহ চার জন নিখোঁজ : সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, সাতক্ষীরার তিন ছাত্রসহ চার যুবক থেকে নিখোঁজ রয়েছে। শ্যামনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইনামুল হক জানান, উপজেলার পরানপুর গ্রামের হাবিব হোসেন সুজন ( ১৬) বেশ কিছুদিন যাবত বাড়ি থেকে নিখোঁজ রয়েছে। তার বাবা জলিল গাজি জানান, সুজন পরানপুরের এ, রউফ উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেনীর ছাত্র। তিনি আরও জানান, একই দিনে একই সময়ে তার ভাতিজা শাকিল হোসেন দোলন (১৭) বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়। কলারোয়া উপজেলার দুই জনের মধ্যে একজনের নাম মওলানা জাকির হোসেন ( ৩৮)। তিনি গদখালি গ্রামের নুরুল ইসলামের ছেলে। নিঁখোজ অপর মাদ্রাসা ছাত্রের নাম আব্দুল কাদের (১৬)। সে উপজেলার মুরারী কাটি গ্রামের আজগর আলীর ছেলে। নিঁখোজ আব্দুল কাদের মুরারীকাটি মাদ্রাসার দাখিল শ্রেনীর ছাত্র।