সদ্য শেষ হলো দেশের অন্যতম বৃহত্তম তথ্যপ্রযুক্তির প্রদর্শনী ‘বেসিস সফট এক্সপো ২০১৯’ এর আয়োজন। এই প্রদর্শনীতে দেশের অন্তত আড়াই শ’ প্রযুক্তি কোম্পানি অংশগ্রহণ করে। প্রযুক্তিপ্রেমীদের ভিড়ও ছিল চোখে পড়ার মতো। এটি ছিল বেসিস সফট এক্সপো এর ১৫ তম আয়োজন। অন্য বছরগুলোর তুলনায় এবারের আয়োজনে ছিল কিছু ভিন্ন রূপ। বিশেষ করে সমস্ত আয়োজনকে সাজানো হয়েছিল ১০টি আলাদা আলাদা জোনে। কোন জোনে কি ছিল চলুন দেখে নেয়া যাক—
সফটওয়্যার সেবা প্রদর্শনী জোন
বেসিস সফটএক্সপো-এর প্রদর্শনী এলাকার দশটি জোনের মধ্যে ‘সফটওয়্যার শো-কেসিং জোন’ অন্যতম। এ জোনে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের তৈরি বিভিন্ন পরীক্ষিত সফটওয়্যার যা ব্যাংকিং সল্যুশন থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যখাত, উত্পাদন খাতে ব্যবহূত হচ্ছে সেগুলো স্থান পেয়েছিল। দেশের মেধাবী তরুণ-তরুণীরা সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিকে নিয়ে গেছে এক অন্য উচ্চতায়। উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে নিত্যনতুন ও কার্যকরী সফটওয়্যার উদ্ভাবনের পাশাপাশি আইটি নির্ভর ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে এই সেক্টরে বেড়েছে বিনিয়োগ। বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সক্ষমতা এবং সফটওয়্যার শোকেসিং প্লাটফর্ম-এর সার্বিক অগ্রযাত্রার সাথে থাকতে আপনিও চলে আসুন বেসিস সফটএক্সপো-এ।
ভ্যাট জোন
বছরে ৫ কোটি টাকা বা তার বেশি টার্নওভারের প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় বা লেনদেন তথ্য এনবিআর অনুমোদিত সফটওয়্যার ব্যবহার করতে হবে। এ বছর থেকেই এনবিআর এ নিয়ম চালু করেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সব নিয়ম মেনে ১১টি প্রতিষ্ঠান ভ্যাট সফটওয়্যার তৈরি করেছে যার মাধ্যমে কেনা কাঁচামালের ভ্যাট হিসাবও করা যাচ্ছে সহজে। আবার প্রস্তুতকৃত পণ্যের ভ্যাটসহ সঠিক দাম নির্ধারণ করে বিক্রি করে উপযুক্ত লাভও পাওয়া যাচ্ছে। আর দেশের প্রচলিত ভ্যাট আইন অনুসারে হিসেবে গড়মিলও থাকছে না। কত টাকা ভ্যাট সরকারের কোষাগারে যাবে সেটাও থেকে যাচ্ছে সফটওয়্যারের হিসাবে। এনবিআর অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- ইউওয়াই সিস্টেমস লিমিটেড, ইনোভিয়া টেকনোলজিস লি. ধ্রুপদি টেকনো কনসোর্টিয়াম লি., ডিভাইন আইটি লি., সিম্ফনি সফটটেক লি., বেস্ট বিজনেস বন্ড লি., সিএসএল সফটওয়্যার রিসোর্সেস লি., এলাইড ইনফরমেশন টেকনোলজি লি. এবং যুবসফট ইনফরমেশন সিস্টেমস লি.,মিডিয়া সফট, ইউনিসফট সিস্টেমস। এসব অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট সফটওয়্যারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত ভাবে ঝুঁকি এড়িয়ে ভ্যাট প্রদান করা যায়।
বেসিস সফট এক্সপো’র মধ্যেই প্রদর্শনী জোন হিসেবে ছিল ভ্যাট জোন। এখান থেকেই আগ্রহীরা খুঁজে পেয়েছে তাদের দরকারের এনবিআর অনুমোদিত সবগুলো ভ্যাট সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান।
এক্সপেরিয়েন্স জোন
এক্সপেরিয়েন্স জোন। অগমেন্টেন্ড রিয়ালিটি, ভার্চ্যুয়াল রিয়ালিটির বিভিন্ন পণ্য ছিল এই জোনে। যা সরাসরি পরখ করার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়ে ছিল আগ্রহীদের। মাথায় হেডসেট পড়ে ভিডিও উপভোগ করার কথা তো আমরা অনেক শুনেছি। সফট এক্সপোতে সরাসরি এই সেবা গ্রহণের সুবিধা তৈরি করে দিয়েছিল বেসিস সফট এক্সপোর এক্সপেরিয়েন্স জোন। এই জোনে মূলত অগমেন্টেন্ড রিয়ালিটি, ভার্চ্যুয়াল রিয়ালিটির বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী দিয়েই সাজানো হয়েছিল। এছাড়াও অত্যাধুনিক উচ্চগতির ফাইভ-জি ইন্টারনেটে এক্সিপেরিয়েন্স জোনও ছিল এখানে। এতে উঠে আসে সারাদেশের সর্বশেষ প্রযুক্তি।
ডিজিটাল কমার্স জোন
বেসিস সফটএক্সপো-এর প্রদর্শনী এলাকার দশটি জোনের মধ্যে ‘ই-কমার্স জোন’ অন্যতম। উন্নত ও অভাবনীয় সব দেশীয় ই-কমার্স প্লাটফর্ম এর মাধ্যমে এখন ঘরে বসেই অনলাইনে শপিং করা যাচ্ছে। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে সহজ করে বিভিন্ন ডিজিটাল কমার্স প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছিল এ জোনে।
উইমেন জোন
বেসিস সফটএক্সপো ২০১৯-এ প্রথম বারের মতো নারীদের পরিচালিত ৬টি প্রযুক্তিগত সেবা নিয়ে সাজানো হয়েছিল উইমেন জোন। এই জোনে শুধুমাত্র নারীদের দ্বারা পরিচারিত প্রতিষ্ঠানগুলো অংশ নিয়ে ছিল। ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে নারীদের অবদান ও অংশগ্রহণের মতোই বেসিস সফট এক্সপোতেও অংশগ্রহণ করে তারা।
ইন্ডাস্ট্রি ৪.০ জোন
দেশে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রভাব পড়েছে অথচ তা আমরা অনেকেই জানি না বা অনুধাবন করছি না। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি আমাদের জীবনমানকে উন্নত করবে। বেসিস সফটএক্সপো ২০১৯ -এর প্রদর্শনী এলাকার দশটি জোনের মধ্যে একটি ছিল ইন্ডাস্ট্রি ৪.০। এতে ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিং, আইওটিসহ অত্যাধুনিক সব প্রযুক্তির সেবা ও পণ্যসামগ্রী যেসকল স্থানীয় প্রতিষ্ঠান প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা অংশগ্রহণ করে এই জোনে। এটি সারাবিশ্বের ডিজিটাল শিল্প বিপ্লবের সূচনা সম্পর্কে ধারণা দেয় এবং ডিজিটাল বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সক্ষমতাকে সবার সামনে তুলে ধরে।
উদ্ভাবনী মোবাইল সেবা জোন
বেসিস সফটএক্সপো-এর প্রদর্শনী এলাকার দশটি জোনের মধ্যে ‘মোবাইল ইভোভেশন জোন’ ছিল অন্যতম। বাংলাদেশে অর্ধেকেরও বেশি মানুষ মোবাইল ব্যবহার করছে। বাড়ছে স্মার্টফোনের ব্যবহারও। বিভিন্ন অ্যাপস এখন নিয়ন্ত্রণ করছে জীবন। স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের তৈরি অ্যাপস এবং উদ্ভাবনী মোবাইল সেবা স্থান পায় বেসিস সফটএক্সপোর উদ্ভাবনী মোবাইল সেবা জোনে। এই জোনে দর্শনার্থীরা বিশ্বের স্মার্টফোন ইন্ডাস্ট্রির সাথে তাল মিলিয়ে মোবাইলের জন্য তৈরি অত্যাধুনিক সব প্রযুক্তি এবং অ্যাপগুলো সম্পর্কে ধারণা নিতে পেরেছে।
ডিজিটাল এডুকেশন জোন
তথ্যপ্রযুক্তির যে জয়গান চলছে তার ভাটা পড়বে যদি না তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধাগুলো শিক্ষাখাতে এসে না পৌঁছায়। দেশের ধীরে ধীরে প্রজেক্টর দিয়ে ক্লাসে পড়ানোর অভ্যাস শুরু হয়েছে। ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত ক্লাসরুম তৈরির কাজও চলছে। কিন্তু এগুলো শিক্ষা ব্যবস্থার গুটিকয়েক অংশ মাত্র। পার্শ্ববর্তী অনেক দেশেই পুরোপুরি এডুকেশন ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার ব্যবহূত হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ফাইল ব্যবস্থাপনা, হিসাবরক্ষণ, শিক্ষকদের বেতন ব্যবস্থাপনা সবকিছুই একটা সফটওয়্যার দিয়ে হচ্ছে। এডুকেশন ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার প্রশাসনিক অনেক কাজ করে দিচ্ছে। বাংলাদেশের এডুকেশন ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার ইউরোপ, আমেরিকায় ব্যবহূত হচ্ছে। বেসিস সফটএক্সপোতে বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কথা মাথায় রেখে বানানো সব এডুকেশন ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার পাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সবচেয়ে বড় প্রদর্শনী- বেসিস সফট এক্সপো ২০১৯। দেশের সব নামি-দামি এডুকেশন ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার প্রস্তুতকারি প্রতিষ্ঠানগুলো অংশগ্রহণ করেছিল এডুকেশন জোনে।
ফিনটেক জোন
বেসিস সফটএক্সপো-এর প্রদর্শনীর দশটি জোনের মধ্যে ‘ডিজিটাল পেমেন্ট অ্যান্ড ফিনটেক’ জোনও একটি। প্রতিনিয়ত জনপ্রিয় হচ্ছে ডিজিটাল পেমেন্ট ও ফিন্যান্সিয়াল টেকনোলজি। পাশাপাশি আইটি নির্ভর ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে এই সেক্টরে বেড়েছে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ। ডিজিটাল বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বর্তমান অবস্থা এবং ডিজিটাল পেমেন্ট ও ফিনটেক প্লাটফর্ম-এর সার্বিক অগ্রযাত্রার চিত্র ফুটে উঠেছিল এ জোনে।
আইটিইএস ও বিপিও জোন
বেসিস সফটএক্সপো-এর প্রদর্শনীতে ‘আইটিইএস অ্যান্ড বিপিও’ নামের একটি জোন দেখা যায়। কি অসাধারণ দ্রুততার সঙ্গেই না এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের আউটসোর্সিং ইন্ডাস্ট্রি। সম্ভাবনাময় এ খাত দিনকে দিন বিশাল আকার ধারণ করছে। এই সম্ভাবনায় এক ঝাঁক তরুণ তরুণীদের মাধ্যমে এই সেক্টরে বেড়েছে বিনিয়োগ। আইটিইএস অ্যান্ড বিপিও-এর সাফল্যের চিত্র তুলে ধরছে বেসিস সফটএক্সপো।
