বর্তমানে ভেনিজুয়েলা হইল সেইসকল দেশের একটি যাহাদের উপর কথিত পরাশক্তিদের স্বার্থসংঘাত চরমে উঠিয়াছে। পরাশক্তিদের বৈশিষ্ট্য হইল, তাহারা নিজেদের স্বার্থকে কখনো স্পষ্ট করিয়া প্রকাশ করেন না। তাহারা বরং নিজেদের স্বার্থের চারিদিকে এমন একটি মানবিক আবরণ আরোপ করেন যেন উহাদের কর্মকাণ্ড আসলে পরার্থে নিবেদিত। তাহারা যেন পরের জন্য কাঁদিয়া আকুল।
এই ধরনের কপটতাকে বাংলায় বলা হয় কুম্ভীরাশ্রু। পরাশক্তিদের দল এখন ভেনিজুয়েলার জন্য ‘কুমিরের অশ্রু’ বর্ষণ করিতেছেন। অন্যদিকে ভেনিজুলেয়ার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরা ইত:পূর্বে জানাইয়াছেন যে, তাহাকে হত্যার পরিকল্পনা করিয়াছে একটি শীর্ষ পরাশক্তির দেশ। গত ২৩ জানুয়ারি বিরোধী নেতা হুয়ান গুয়াইদো যখন নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলিয়া নিজেকে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হিসাবে দাবি করেন, তখন পরাশক্তিদের একটি পক্ষ গুয়াইদোকে সমর্থন করে। ভেনিজুয়েলার দেশটির সেনাবাহিনী অবশ্য রহিয়াছে মাদুরোর পক্ষেই। মাদুরোকে সমর্থন করিতেছেন রাশিয়া, চীন, তুরস্কসহ বেশ কয়েকটি দেশ। অন্যদিকে বিরোধী নেতা হুয়ান গুয়াইদোর পক্ষে রহিয়াছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলিসহ প্রায় ৫০টিরও বেশি দেশ। গত মার্চের মাঝামাঝি সময়ে অবশ্য ভেনিজুয়েলার কারাকাস হইতে যুক্তরাষ্ট্র তাহাদের দূতাবাস হইতে অবশিষ্ট সব কূটনৈতিক স্টাফকে প্রত্যাহার করিবার কথা জানাইয়াছে। মাদুরো অবশ্য একাধিকবার বলিয়াছেন যে, ভেনিজুয়েলা সংকটের জন্য একমাত্র দায়ী যুক্তরাষ্ট্র। মাদুরো মনে করেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনিজুয়েলাকে নিজের মুঠোবন্দি করিবার অভিপ্রায়েই যুদ্ধ উস্কাইয়া দিতেছেন। তাহার মতে, ভেনিজুয়েলায় মানবিক সংকট সৃষ্টি করিবার মাধ্যমে দেশটিতে সামরিক হস্তক্ষেপ করিবার পথ তৈরি করিতেছে যুক্তরাষ্ট্র। ইহারই মধ্যে কিছুদিন ধরিয়া অন্ধকারে ডুবিয়া ছিল ভেনিজুয়েলা।
আমরা দেখিয়াছি, ভেনিজুয়েলার প্রয়াত নেতা হুগো শ্যাভেজ কেবল নিজের দেশ নহে, গোটা দক্ষিণ আমেরিকাকেই প্রধান পরাশক্তি ও ইহার সহযোগীদের কবল হইতে মুক্ত করিবার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা করিয়াছিলেন। ২০১৩ সালে হুগো শ্যাভেজের মৃত্যুর পর নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতায় আসিয়া তাহার পূর্বসূরির ব্যাটন হাতে লইয়াই ছুটিতে চাহিয়াছেন। তাহাতে পরাশক্তিরা আরো বেশি নাখোশ হইয়াছেন। দৃশ্যত, ভেনিজুয়েলার গণতন্ত্র লইয়া কথিত দরদি পরাশক্তিদের উত্কণ্ঠার শেষ নাই। কিন্তু ইহা কি বিস্ময়ের নহে যে, এমন অনেক রাষ্ট্র রহিয়াছে যেখানে গণতন্ত্রের বিন্দুমাত্র অনুশীলন নাই সেইখানেও পরাশক্তিরা বিপুল উত্সাহে সামরিক ও বাণিজ্যিক উষ্ণ সম্পর্ক বহাল রাখিয়া থাকেন। তখন কিন্তু কোনো আদর্শ বাধা হইয়া দাঁড়ায় না। তাহা হইলে গণতন্ত্রের কথা বলা বা গণতন্ত্র রফতানি করাটা কি পরাশক্তিদের স্বার্থ কায়েমের একটি অজুহাত মাত্র নয়? আমরা অতীতে দেখিয়াছি যে, ল্যাটিন আমেরিকায় কথিত উগ্রপন্থিদের দমন করিতে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করা হয়। ইহা করিতে গিয়া সংঘটিত হয় প্রতিবিপ্লব। সুতরাং বিশ্ব মোড়লদের উচিত নিজেদের দেশের নাগরিকদের সমস্যা লইয়াই সীমাবদ্ধ থাকা। স্বাধীন সার্বভৌম্য দেশগুলির জনগণকে নিজেদের ভাগ্য নিজেদের গড়িবার পথে কাঁটা বিছানোর পরিণতি ভালো হইবে না। বন্ধ হউক মোড়লদের কুম্ভীরাশ্রু বিসর্জন।
