শুক্রবারের শান্ত এক দুপুরে লোকজন যখন নামাজের জন্য ক্রাইস্টচার্চে মসজিদে জড়ো হয়েছিল তার কিছু মুহূর্ত পরেই এক ব্যক্তি অ্যাসল্ট রাইফেল হাতে দরজায় এসে দাঁড়ায়। তার হাতে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে অস্ত্র দেখা সত্ত্বেও মুসুল্লিদের একজন আফগান তাকে “ভাই, আসুন” বলে স্বাগত জানান । এরপরই সে বন্দুকধারী শুরু করে গুলিবর্ষণ। আধিপত্যবাদী ওই ব্যক্তির হামলায় ৫০ জন ব্যক্তি নিহত হয়। এই হত্যাকাণ্ড কেবল নিউজিল্যান্ডকেই ভারাক্রান্ত করেনি, গোটা বিশ্বকে আলোড়িত করে। ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর দেশটির প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আর্ডেন বিবৃতি প্রদানের জন্য হাজির হন, তখন শুধু নিউজিল্যান্ডই তার বক্তব্য শুনতে উদগ্রিব ছিল না, সারা বিশ্বের নজর ছিল সেদিকে।
অতি দ্রুত এবং স্পষ্টভাবে এই বন্দুক হামলাকে প্রধানমন্ত্রী “সন্ত্রাসী হামলা” বলে বর্ণনা করেন। বহু মানুষ মনে করেন যে, শ্বেতাঙ্গ কোনো ব্যক্তির দ্বারা এ ধরনের হামলার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ এ ধরনের শব্দ ব্যবহার করতে সাধারণত অনীহা বা অনিচ্ছুক মনোভাবের পরিচয় দিয়ে থাকেন। কিন্তু আর্ডেন এর দ্বারা দ্রুত, স্পষ্টভাষায় এই ‘সন্ত্রাসী হামলা’ বলে বক্তব্য দেওয়ার মাধ্যমে সে বিষয়ে তার সচেতনতা এবং বিবেচনার বিষয়টি উঠে আসে। মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষদের শোক এবং ভীতির প্রতি তার স্বীকৃতিও সেখানেই ফুরিয়ে যায়নি। ক্রাইস্টচার্চে ঘটনার শিকার পরিবারগুলোর স্বজনদের জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা ও সমবেদনা জানান তিনি। সেসময় মাথায় কালো রং এর স্কার্ফ পরেন তিনি যা তাদের প্রতি শ্রদ্ধারই বহিঃপ্রকাশ। তিনি মানুষকে একতার বন্ধনে বেঁধেছেন এবং বলেছেন, “তারা আমাদের”।
এর কয়েকদিন পরে প্রথমবারের মত পার্লামেন্টে ভাষণ দিয়েছেন তিনি, সেখানে তিনি সংক্ষিপ্ত কিন্তু দৃঢ় ভাষায় বক্তব্য রাখেন যেখানে ইসলামী কায়দায় সবাইকে সম্ভাষণ জানান - “আসসালামু আলাইকুম” বলে। কিন্তু তিনি এই সহানুভূতির সাথে বাস্তবসম্মত আইনি ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন আনার প্রতিশ্রুতির মিশ্রণ ঘটান। হামলার ঘটনার কয়েক ঘণ্টার পরেই তিনি দেশের অস্ত্র আইনে “১০ দিনের মধ্যে” কঠোর সংস্কার আনার বিষযে ঘোষণা দেন। সেইসঙ্গে তিনি নিউজিল্যান্ড এবং বিশ্ব থেকে বর্ণবাদ “বিতাড়িত” করার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে “সীমানা দিয়ে ভাবলে আমাদের চলবে না”। আর্ডেনের প্রথম বক্তব্যের সূত্র ধরে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানের পর্যবেক্ষকরা তার নেতৃত্বের প্রশংসা করেছেন।
ব্রিটিশ পত্রিকা গার্ডিয়ানে সুজানে মুর লিখেছেন “মার্টিন লুথার কিং বলেছেন সত্যিকারের নেতারা ঐক্য খোঁজে না তারাই ঐক্য তৈরি করে, আর্ডেন ভিন্ন ধরনের ঐক্য তৈরি, কর্ম, অভিভাবকত্ব ও একতার প্রদর্শন করেছেন। “সন্ত্রাসবাদ মানুষের মাঝে ভিন্নতাকে দেখে এবং বিনাশ ঘটায়। আর্ডেন ভিন্নতা দেখেছেন এবং তাকে সম্মান করতে চাইছেন, তাকে আলিঙ্গন করছেন এবং তার সাথে যুক্ত হতে চাইছেন।” ওয়াশিংটন পোস্টের ঈশান থারুর লিখেছেন যে, “আর্ডেন তার জাতির শোক এবং দুঃখ এবং তা নিরসনের প্রতিমূর্তি হয়ে উঠেছেন। “এবিসি অস্ট্রেলিয়া ওয়েবসাইটে অ্যানাবেল ক্র্যাব লেখেন, “একজন নেতার জন্য ভয়াবহ বাজে খবরের মুখোমুখি হওয়ার পর আর্ডেন এখনো পর্যন্ত কোনো ভুল পদক্ষেপ নেননি।”
