বাইরে থেকে হুজি নিয়ন্ত্রণ করছেন মুফতি শহীদুল

আপডেট : ২০ আগস্ট ২০১৬, ০৯:৩৯
বিদেশে আত্মগোপণে থেকে মুফতি শহীদুল ইসলাম নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ (হুজি) নিয়ন্ত্রণ করছেন। রমনা বটমূলে বোমা হামলা মামলার ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আরেক পলাতক আসামি মুফতি শফিকুর রহমান সম্প্রতি দুবাই থেকে হুন্ডির মাধ্যমে কয়েক দফা টাকা পাঠিয়েছেন। এদিকে হুজির অপারেশন কমান্ডার মোহাম্মদ তালহা (মুফতি শহীদুলের ছেলে) বাংলাদেশে অবস্থান করে সাংগঠনিক কার্যক্রম আরো মজবুত করার চেষ্টা করছেন।
 
পুরান ঢাকার বাংলাবাজার এলাকার একটি প্রকাশনা অফিস থেকে হুজির সাংগঠনিক কার্যক্রম সম্পর্কে বেশ কিছু নথি জব্দ করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ এসব তথ্য পেয়েছে। 
 
গত দুই বছর ধরে দুবাই থেকে হুন্ডির মাধ্যমে দেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ আনার একটি তালিকাও উদ্ধার করে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার রাতে পুলিশ মানিকগঞ্জের আরঙ্গাবাদ বাসস্ট্যান্ড থেকে স্থানীয় খাদিজা বিনতে খোয়াইলিদ নামের একটি মাদ্রাসার শিক্ষক আব্দুস সাত্তারকে হুজি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে আটক করে।
 
সূত্র জানায়, মোহাম্মদ তালহা গত ৩১ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি অভিযোগ দিয়েছেন। সেখানে বলা হয়েছে, মুফতি শহীদুল ইসলামের প্রতিষ্ঠিত আল-মারকাজুল ইসলামী নামে একটি প্রতিষ্ঠান কতিপয় ব্যক্তি দখল করে নিচ্ছে। আরো বলা হয়, তালহা ভারত ও বাংলাদেশের পাসপোর্টধারী। ভারতের উত্তর প্রদেশের দেওবন্দ মাদ্রাসায় পড়াশোনার সময় তিনি ভারতের পাসপোর্ট গ্রহণ করেন। দেশে অনেকের দ্বৈত পাসপোর্ট আছে। সেই সূত্র ধরে তিনি ভারতের পাসপোর্ট গ্রহণ করেছেন। মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের ২১/১৭ নম্বর বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত আল-মারকাজুল ইসলামী অন্য একটি গ্রুপ জোরপূর্বক দখল করার পাঁয়তারা করছে।
 
উল্লেখ্য, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও তত্কালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার ওপর হরকাতুল জিহাদের নেতৃত্বে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। হামলার পর আল-মারকাজুল ইসলামীর অ্যাম্বুলেন্সে করে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায় জঙ্গিরা। পরবর্তী সময়ে গ্রেনেড হামলা মামলায় আল-মারকাজুল ইসলামীর তত্ত্বাবধায়ক আব্দুর রশিদ আদালতে সাক্ষ্য দেন। তাতে তিনি এই হামলার সঙ্গে মুফতি শহীদুলের সংশ্লিষ্টতার তথ্য দেন। এরপর মুফতি শহীদুল দক্ষিণ আফ্রিকায় আত্মগোপন করেন। সম্প্রতি মুফতি শহীদুল দুবাইয়ে অবস্থান করছেন বলে তথ্য পেয়েছে গোয়েন্দারা।
 
গত ২৩ জুলাই বাংলাবাজারের একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় থেকে হুজির ঢাকার সভাপতি (উত্তর) মুফতি মাওলানা নাজিমউদ্দিন, প্রকৌশলী সাইদুজ্জামান (২৪) ও আনাসকে (২১) গ্রেফতারের পর দুবাই থেকে হুন্ডির মাধ্যমে হুজির অর্থায়নের বিষয়টি ফাঁস হয়। এর কয়েকদিন পর গোপনে মুফতি শহীদুলের ছেলে মোহাম্মদ তালহা বাংলাদেশে আসেন। হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে তাকে ২০ ঘন্টা আটক রেখে মুচলেকা দিয়ে দেশে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয়। দেশে প্রবেশ করে তিনি যোগাযোগ করেন হুজির পুরানো নেতাদের সঙ্গে। বিষয়টি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ তদন্ত করতে শুরু করে। গোয়েন্দারা পল্টন জামে মসজিদের পাশে সাব্বির টাওয়ারে মুফতি শহীদুলের মালিকানাধীন মিনা এভিয়েশন নামে একটি হজ্বযাত্রী পাঠানোর প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন বিষয়ে খোঁজ নেয়। মুফতি শহীদুলের অবর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি সারোয়ার হোসেন নামে এক ব্যক্তি দেখাশোনা করেন। গোয়েন্দারা খোঁজ খবর নিতে শুরু করলে সারোয়ার গোপনে সৌদি আরব পালিয়ে যান।
 
বাংলাবাজারের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে উদ্ধার করা নথিপত্রের তথ্য উদ্বৃত করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার শহীদুল্লাহ জানান, দুবাইয়ে মুফতি শহীদুল ইসলাম ও মুফতি শফিকুর রহমান আত্মগোপন করে আছেন। মুফতি শফিকুর রহমান রমনা বটমূলে বোমা হামলা মামলার ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। বিভিন্ন সময়ে হুজির গ্রেফতার হওয়া সদস্যদের বর্তমান কি অবস্থা এবং তাদের পরিবারকে কি ধরনের সাহায্য করা হয়েছে—সে সম্পর্কে কাগজপত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া একটি তালিকায় হুজি তাদের সদস্যদেরকে কীভাবে আর্থিক সহায়তা করে থাকে সে সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে হুন্ডির মাধ্যমে তাদের কাছে দুবাই থেকে টাকা এসেছে। একেকটি হুন্ডিতে ২ লাখ থেকে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত পাঠানো হয়েছে তাদের কাছে। এই টাকা কারা নিয়েছে এবং কিভাবে খরচ হয়েছে তা তদন্ত করা হচ্ছে।
 
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, সম্প্রতি গুলশান ও শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার পর হুজি তাদের নেটওয়ার্ক সক্রিয় করার চেষ্টা চালাচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে তাদের আদি প্রতিষ্ঠান আল-মারকাজুল ইসলামী তাদের প্রতিষ্ঠান দাবি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ে অভিযোগ দিয়েছে।
 
এ ব্যাপারে আল-মারকাজুল ইসলামীর বর্তমান সাধারণ পরিষদের সদস্য মুফতি শারাফাত হোসাইন বলেন, ‘মোহাম্মদ তালহার চলাফেরা ও আচরণ আমাদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। তিনি কিভাবে টাকার লেনদেন করেন-সেটি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। আমরা এ ব্যাপারে সমাজসেবা অধিদফতরের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। আল-মারকাজুল ইসলামী প্রতিষ্ঠানটি দিয়ে মুফতি শহীদুল ইসলাম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কার্যকলাপ চালিয়েছেন। মুফতি শহীদুল ইসলাম যে হরকাতুল জিহাদের একজন চি?হ্নিত নেতা সে বিষয়টি সরকারও জানে।’
 
 
 
 
ইত্তেফাক/এমআই