২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা

বিচারের অপেক্ষায় নিহতদের পরিবার, অর্থকষ্টে যাচ্ছে দিন

আপডেট : ২১ আগস্ট ২০১৬, ০৮:৫৮
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট তত্কালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ও তার দলের শীর্ষ নেতাদের হত্যার উদ্দেশ্যে গ্রেনেড হামলা চালিয়েছিল কতগুলো নরাধম। তাদের সেই ন্যাক্কারজনক কাপুরুষোচিত হামলায় প্রাণ হারান আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন। আহত হয়েছিল অর্ধশতাধিক মানুষ। সেই ভয়াবহ ঘটনার পর পেরিয়ে গেছে দীর্ঘ একটি যুগ। আজও বিচার পায়নি গ্রেনেড হামলায় নিহতদের পরিবারগুলো। বড় অর্থকষ্টে চলছে তাদের দিন। আজ তেমনই কয়েকটি পরিবারের কথা তুলে ধরা হলো।
 
মতলবের আতিক উল্যাহ সরকার
 
মতলব উত্তর (চাঁদপুর) সংবাদদাতা জানান, ২১শে আগস্ট ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় নিহত হন মতলব উত্তর উপজেলার পাঁচআনী গ্রামের আতিক উল্যাহ সরকার (৪৬)। এই ন্যাক্কারজনক হত্যার বিচারের প্রতীক্ষায় রয়েছেন আতিকের স্ত্রী ও  চার সন্তান। বিচার দ্রুত শেষ করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
 
৫ ভাইবোনের মধ্যে আতিক ছিল বড়। বাবার মৃত্যুর পর সংসারের দায়িত্ব নিয়েছিল আতিক। তিনি ঢালাই শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে। ২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট কাজ শেষে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে যান। ওই সমাবেশে গ্রেনেড  হামলায় আতিক নিহত হন। আতিকের মৃত্যুর পরপরই ভাইয়েরা আলাদা হয়ে যান। তার সংসারে ছিল ৪ সন্তান, স্ত্রী ও বৃদ্ধা মা। বড় মেয়ে তানিয়া এ বছর এইচএসসি পাস করেছে, উচ্চ শিক্ষার স্বপ্ন দেখছে। বড় ছেলে মিথুন কলেজে পড়ে। মেজ ছেলে মিন্টু ও সাকিব অষ্টম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত।
 
আতিকের পরিবার প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে প্রথমে এক লাখ ও পরে দশ লাখ টাকা পেয়েছে। এ টাকা ব্যাংকে রেখে তা থেকে পাওয়া ১০ হাজার ৭০০ টাকা দিয়ে আতিকের পরিবার এখন জীবিকা নির্বাহ করলেও চার সন্তানের লেখা-পড়ার খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন আতিকের স্ত্রী। আগস্ট মাস এলে সাংবাদিকরা খোঁজ-খবর নিতে গেলেই আতিকের স্ত্রী লাইলী বেগম ক্ষেপে যেতেন। তার একটিই চাওয়া স্বামী হত্যার বিচার। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আপনারা আমাদের অনেক উপকার করেছেন। আপনাদের কারণে আমরা আর্থিক সহযোগিতা পেয়েছি। এখন চার সন্তানের লেখা-পড়ায় আর্থিক সহযোগিতা পেলে অনেক উপকার হতো। তবে আমাদের এখন একটাই দাবি- হত্যাকারীদের ফাঁসি।
 
রাজৈরের লিটন মুন্সী
 
টেকেরহাট (মাদারীপুর) সংবাদদাতা জানান, ২১ আগষ্ট ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউ-এ অনুষ্ঠিত শেখ হাসিনার সমাবেশে যোগ দিতে গিয়ে বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলায় নিহত হন মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার চানপট্টি গ্রামের যুবলীগ নেতা লিটন মুন্সী। তার পরিবার এখন কেমন আছে- তা জানার জন্য হোসেনপুর ইউনিয় নের চানপট্টি গ্রামে
 
নিহত লিটন মুন্সির বাড়িতে এই সংবাদদাতা গেলে সেখানে এক হূদয় বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এ সময় লিটন মুন্সির মা আছিয়া বেগম, বাবা আইয়ুব আলী মুন্সি, বোন ইসমতআরা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। মা আছিয়া বেগম বলেন, আমার বাবা (লিটন মুন্সি) বলেছিল, মা তোমার পেটের পাথর অপারেশন করে বের করবো। মাত্র ১০ দিন অপেক্ষা করো। ৯ দিনের মাথায় ছেলে লাশ হয়ে ফিরেছে।  লিটনের বাবা আইয়ুব আলী মুন্সী জানান,  ‘আমার ছেলের তো কোন দোষ ছিল না। আমার একমাত্র ছেলেকে কবরে শুইয়ে রেখে কিভাবে বেঁচে আছি বলতে পারেন? তিনি এই গ্রেনেড হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অন্তত একটিবার তার ছেলের কবর জিয়ারত করে যেতেন তাহলে তিনি মরেও শান্তি পেতেন। তিনি জানান, দুই বছর আগে প্রধানমন্ত্রী নিজ হাতে তাকে ৫ লক্ষ টাকা এবং  নিহত লিটনের মেয়ে  মিথিলার ভরন পোষন ও লেখাপড়ার খরচ বাবদ আরো ৫ লক্ষ টাকার চেক  দেন। এছাড়াও প্রতিমাসে মেয়েকে ৩হাজার টাকা ও তাকে ২ হাজার টাকা ভাতা দেন । একমাত্র বোন ইসমতআরা জানান,  ভাইয়ের মৃত্যুর পর আমার বাবা কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। কিন্তু বেশি বয়স হওয়াতে এখন আর তার পক্ষে কৃষিকাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। আছিয়া বেগম  জানান, লিটনের একমাত্র মেয়ে মিথিলার বয়স আগামী ১ সেপ্টেম্বর ১৩ বছর পূর্ণ হবে। এখন মিথিলা নানা বাড়ী মাদারীপুরে থাকে। ২১ আগষ্ট আসলেই শুধু সাংবাদিকরাই আমাদের খোঁজ খবর নেয়। বাবার কথা জিজ্ঞেস করলে মিথিলা শুধু নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থাকে । মিথিলার মা মাফিয়া (নিহত লিটনের স্ত্রী) জানান, মিথিলা বর্তমানে মাদারীপুর সরকারি ডোনাবান বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ে।
 
সুফিয়া বেগম
 
২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নিহত সুফিয়া বেগমের বাড়িও রাজৈর উপজেলায়। কদমবাড়ি ইউনিয়নের মহিষমারি গ্রামে। ওই দিন মহিলা নেতাদের সাথে প্রথম সারিতেই ছিলেন সুফিয়া বেগম। সুফিয়া সপরিবারে ঢাকাতেই থাকতেন। নিহত হবার পর তাকে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়।
 
রংপুরের রেজিয়া বেগম
 
রংপুর প্রতিনিধি ওয়াদুদ আলী জানান, দীর্ঘ প্রায় ১৩ বছরেও গ্রেনেড হামলার বিচার না হওয়ায় হতাশ ২১ আগষ্ট গ্রেনেড হামলায় নিহত রংপুরের রেজিয়ার পরিবার। মেয়ের হত্যার বিচার দেখে যেতে পারেননি রেজিয়ার বাবামা। ২০০৬ সালে মা আমেনা বেগম (৮৫) এবং ২০১৪ সালের ১৩ জুলাই বাবা আফাজ উদ্দিন শেখ (১০০) মারা যান। গতকাল শনিবার রংপুর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে কাউনিয়া উপজেলার গঙ্গানারায়ণ গ্রামে রেজিয়ার বাড়িতে গেলে রেজিয়ার ছেলে হারুন অর রশিদ ও নুরনবী হতাশা ব্যক্ত করে এ প্রতিনিধিকে বলেন, “নানা ও নানীর মতো আমাদেরও মনে হয় মায়ের হত্যার বিচার না দেখেই মরতে হবে।” নুরনবী ও হারুন দ্রুত মা রেজিয়া হত্যার বিচার দাবি করেন। দুজনেই বলেন, তারা পুরো পরিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞ। এই সরকারের আমলেই আমাদের মার হত্যার বিচার হলে মা ও নানা-নানীর আত্মা শান্তি পাবে। রেজিয়ার বড় বোন আনোয়ারা বেগমও দ্রুত বিচারের দাবি জানান।
 
জানা যায়, রেজিয়ার পরিবারের আর্থিক দুরবস্থার কথা জানতে পেরে ২০০৬ সালে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা তাদের ঢাকায় ডেকে পাঠান এবং ২০ সেপ্টেম্বর আফাজ উদ্দিনসহ নিহত রেজিয়ার ২ পুত্রকে আবাদি জমি কিনে চাষাবাদ করার পরামর্শ দিয়ে নগদ ১ লাখ টাকা প্রদান করেন। পরে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর সহায়তায় সেই টাকা দিয়ে কৃষক আফাজ উদ্দিন ২৫ শতক জমি কিনলেও গরু ও নিজের হাল না থাকায় জমিতে ভালোভাবে চাষাবাদ করতে পারেননি। ফলে সংসারে অভাব-অনাটন লেগেই থাকে। এরপর ২০১৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহায্য তহবিল থেকে নিহত রেজিয়ার ২ পুত্রকে ৪ লাখ টাকা দেয়া হয়। 
 
কুষ্টিয়ার মাহবুব
 
খোকসা (কুষ্টিয়া) সংবাদদাতা জানান, ২১ আগষ্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলায় নিহত হন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার দেহরক্ষী কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার  ফুলবাড়ি গ্রামের হারুন-অর-রশিদের সন্তান মাহবুবুর রশিদ মাসুদ। ফুলবাড়ী গ্রামে মাহবুবের পিতৃভিটায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় তার পরিবারের আর্থিক দুরবস্থার চিত্র। ২০১৪ সালে সরকারের দেয়া ৫ লক্ষ টাকার সঞ্চয় পত্রের মাসিক লাভের টাকায় কোনরকমে চলছে তার বাবা-মার জীবন। টাকা পয়সার অভাবে প্রয়োজনীয় চিকিত্সা করাতে পারছেন না তারা। মাহবুবের মা হাসিনা বেগম (৬৫) গত বছর আগষ্ট মাসে পিত্ত থলির ব্যথায় হাসপাতালে ভর্তি হবার পর জেলা প্রশাসক, কুষ্টিয়ার সার্বিক ব্যবস্থাপনায় তার অপারেশন করা হয়েছিল। হামলার কিছুদিন আগে মাহবুবকে একটি ঘড়ি উপহার দিয়েছিলেন দিয়েছিলেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। কয়েকদিন ব্যবহার করে স্মৃতিস্বরূপ মায়ের কাছে সেটি রেখে দেন তিনি। ২১ আগষ্ট আসলেই মা ঘড়িটি বুকে চেপে কেঁদে ওঠেন। মাহবুবের বড় ভাই শাহজাহান জানান, আমার ৫ বোনের মধ্যে ৩ বোনের বিয়ে মাহবুব থাকতেই দিয়েছি। ছোট বোনের বিয়ে এখনও হয়নি। তিনি আরো বলেন, দুই বোনের পড়ালেখা বাবদ বঙ্গবন্ধু কল্যাণ ট্রাষ্ট থেকে প্রতিমাসে ১ হাজার টাকা আসতো। সেই টাকা আসাও বন্ধ হয়ে গেছে ৪ বছর আগে। তবে ২০১৪ সালের শুরু থেকে সংসার খরচ বাবদ প্রধানমন্ত্রীর কল্যাণ ট্রাস্ট থেকে প্রতি মাসে ৬ হাজার টাকা করে দেয়া হয়। মাহবুবের বৃদ্ধ পিতা হারুন-অর-রশিদ বলেন, আমার মেজ ছেলেকে ঢাকার একটি গার্মেন্টসে চাকরি দেয়া হলেও পরবর্তীতে গার্মেন্টসটি বন্ধ হয়ে যায়। আরেক ছেলে মামুন-অর-রশিদকে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের একজন উর্ধতন কর্মকর্তা এবং জেলা প্রশাসক, কুষ্টিয়ার সুপারিশ ক্রমে গত বছরের ফেব্রুয়ারী মাসে খোকসা উপজেলা পরিষদের অফিস সহায়ক পদে চাকরি দেয়া হয়েছে। 
 
মাহবুবের স্ত্রী শামীমা আক্তার আছমা ও তার দুই ছেলে আশিক ও রবিন ঢাকায় একটি ভাড়া বাড়িতে থাকেন। প্রথম প্রথম মাহবুবের মা-বাবার সাথে যোগাযোগ রাখলেও এখন আর যোগাযোগ রাখেন না।