মজুরি বৃদ্ধিসহ ১৫ দফা দাবিতে নৌ শ্রমিকদের ধর্মঘটের দ্বিতীয় দিন গতকাল বুধবারও নৌযান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। এতে যাত্রীদের যাতায়াতে ও পণ্য পারাপারে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। তবে ধর্মঘটের প্রথম দিনের তুলনায় দ্বিতীয় দিন নৌযান চলাচল কিছুটা বেড়েছে বলে জানা গেছে।
বিআইডব্লিউটিএ’র সদরঘাট টার্মিনাল সূত্র জানায়, ধর্মঘটের প্রথম দিন মঙ্গলবার সদরঘাট থেকে ৪২টি রুটে ৬৫টি লঞ্চ ছাড়ার কথা থাকলেও ছেড়েছে ২৪টি। আর সেদিন সকালে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে লঞ্চ আসে ৩৭টি। গতকাল বুধবার সকাল ১০টা পর্যন্ত সদরঘাট টার্মিনাল থেকে নয়টি লঞ্চ ছাড়ার কথা ছিল। তবে ছেড়েছে ছয়টি। আর সকালে ৪০টি লঞ্চ আসার কথা থাকলেও এসেছে ২১টি।
নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি মো. শাহ্ আলম ভূঁইয়া বলেন, ন্যূনতম মজুরি ১০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বেতন স্কেল ঘোষণা, দুর্ঘটনায় নিহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ পুনর্নির্ধারণ, নৌপথে সন্ত্রাস, ডাকাতি ও চাঁদাবাজি বন্ধসহ নদীপথ প্রতিরক্ষার দাবিতে এই ধর্মঘট শুরু হয়েছে। কর্মসূচিতে ১৭টি নৌযান শ্রমিক সংগঠন একাত্মতা প্রকাশ করেছে। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ধর্মঘট চলবে বলে তিনি জানান।
এদিকে গত সোমবার রাত ১২টায় শুরু হওয়া লাগাতার এই ধর্মঘটের কারণে গতকাল দেশের বিভিন্ন এলাকার নৌযাত্রীরা ব্যাপক ভোগান্তিতে পড়েন। সব নদীবন্দরে লঞ্চ চলাচল প্রায় বন্ধ ছিল। যাত্রীরা নৌবন্দরে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করে লঞ্চ না পেয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। কেউ কেউ বিকল্প পথে গন্তব্যে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন।
এর আগে ২০ এপ্রিল থেকে নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের ব্যানারে সারাদেশে নৌযান শ্রমিকেরা ধর্মঘট শুরু করেন। ছয় দিনের মাথায় মালিক ও শ্রমিক পক্ষকে নিয়ে নৌমন্ত্রী শাজাহান খান বৈঠক করে সর্বনিম্ন মজুরি ৭ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১০ হাজার টাকায় উন্নীত করার ঘোষণা দেন। এ সিদ্ধান্তে তখন শ্রমিকেরা ধর্মঘট কর্মসূচি স্থগিত করেন। তবে মালিকপক্ষ বিষয়টি নিয়ে আদালতে রিট আবেদন করে। ফলে বিষয়টি ঝুলে যায়।
বিআইডব্লিউটিএ’র নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক বিভাগের যুগ্ম-পরিচালক জয়নাল আবেদীন বলেন, দুপুরে ঢাকা থেকে ৬টি যাত্রীবাহী লঞ্চ ছেড়ে গেছে। এ ছাড়া সারা দিনে আর কোনো লঞ্চ যায়নি।
কেরানীগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, সদরঘাট থেকে পর্যাপ্ত সংখ্যক লঞ্চ না ছাড়ায় দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীরা টার্মিনালের পন্টুনে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করে হতাশ হয়ে চলে যান। চাঁদপুরগামী আবদুল মান্নান বলেন, সকাল সাড়ে আটটায় টার্মিনালে এসেছি। চাঁদপুরের মতলব যাব। পরিবার-পরিজন নিয়ে কয়েক ঘণ্টা ধরে টার্মিনালে বসে আছি। কিন্তু লঞ্চ পাচ্ছি না।
খুলনায় স্থবির নৌপথ:খুলনা অফিস জানায়, শ্রমিকদের ধর্মঘটে খুলনা অঞ্চলের নৌপথে স্থবিরতা নেমে এসেছে। নৌযান চলাচল বন্ধ থাকায় খুলনা ও মংলা বন্দরে পণ্য ওঠানামার কাজ বন্ধ রয়েছে। অনির্দিষ্টকালের এ ধর্মঘটের ফলে গতকাল খুলনার বিআইডব্লিউটিএ’র ৪, ৫, ৬ ও ৭ নম্বর ঘাট এবং রুজভেল্ট জেটিতে অবস্থানরত কোনো জাহাজ থেকে পণ্য খালাস হয়নি। এছাড়া খুলনা লঞ্চঘাট থেকে কোনো নৌযান ছেড়ে যায়নি বা আসেনি। এমনকি মংলা বন্দর থেকে যশোরের নওয়াপাড়া পর্যন্ত কোথাও কোনো নৌযান চলাচল করেনি।
দক্ষিণাঞ্চলে অভ্যন্তরীণ রুটে লঞ্চ ও কার্গো চলাচল বন্ধ:বরিশাল অফিস জানায়, বরিশাল নৌ-বন্দর টার্মিনাল থেকে দক্ষিণাঞ্চলের অভ্যন্তরীণ রুটের লঞ্চসহ নদী পথে সব ধরনের মালবাহী কার্গো চলাচল বন্ধ রয়েছে। তবে ঢাকা-বরিশাল নৌ রুটে লঞ্চ চলাচল প্রায় স্বাভাবিক রয়েছে। দাবি আদায়ের লক্ষ্যে গতকাল বেলা ১১টার দিকে বরিশাল নদী বন্দর পন্টুনে সমাবেশ করেন নৌযান শ্রমিকেরা। সমাবেশে দাবি না মানা পর্যন্ত লাগাতার কর্মবিরতি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেয়া হয়। এসময় শ্রমিকেরা অভিযোগ করেন, লঞ্চ মালিকরা শ্রমিকদের চাপের মুখে নৌযান চালাতে বাধ্য করছেন।
মুন্সীগঞ্জ থেকে দূরপাল্লার লঞ্চ চলাচল বন্ধ:মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, নৌ ধর্মঘটের কারণে দূরপাল্লার লঞ্চ চলাচল বন্ধ রয়েছে। তবে মুন্সীগঞ্জ-নারায়ণগঞ্জ ও শিমুলিয়া-কাওড়াকান্দি লঞ্চ সার্ভিস চালু রয়েছে। দূরপাল্লার লঞ্চ চলাচল না করায় যাত্রীরা গন্তব্যে যেতে পারছেন না। গতকাল মুন্সীগঞ্জ লঞ্চ ঘাটে বহু যাত্রী এসে লঞ্চের অপেক্ষায় ছিলেন। জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল হাসান বাদল নৌ ধর্মঘটে যাত্রীদের দুর্ভোগের কথা উল্লেখ করে জানান, ধর্মঘট প্রত্যাহারের প্রচেষ্টা চলছে।
আশুগঞ্জে আটকা পণ্যবাহী ২ শতাধিক জাহাজ : আশুগঞ্জ (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) সংবাদদাতা জানান, ধর্মঘটের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আশুগঞ্জ নৌবন্দরে পণ্য নিয়ে আসা আটকে পড়া কার্গো জাহাজের সংখ্যা প্রায় দুইশ ছাড়িয়ে গেছে। বন্ধ হয়ে গেছে আশুগঞ্জের সঙ্গে দেশের পূর্বাঞ্চলীয় ৬টি নৌ-রুটের নৌ যোগাযোগ। এতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে ব্যবসায়ী ও লঞ্চ যাত্রীদের। বন্দরে অলস সময় পার করছেন কয়েক হাজার শ্রমিক।
শুধু আশুগঞ্জ আর্ন্তজাতিক নৌবন্দরে পণ্য উঠানামা বন্ধ থাকায় সার, সিমেন্ট, বালি, রডসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য নিয়ে খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে শতাধিক মালবাহী জাহাজ। এতে প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকা ক্ষতি হচ্ছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ কার্গো জাহাজ মালিক সমিতির পূর্বাঞ্চলীয় কমিটির সভাপতি মো. নাজমুল হোসাইন হামদু জানান, ধর্মঘটের কারণে মালিকরা লোকসানে পড়েছে। এভাবে চলতে থাকলে সামনের ঈদে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দিতে সমস্যা হবে। এ ব্যাপারে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তিনি সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
ইত্তেফাক/এএন
