মানবেতর জীবনযাপন

সাতদিন পেরিয়ে গেলেও নওগাঁয় ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তরা সরকারি সাহায্য পায়নি

আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০১৬, ০১:৫৮
নওগাঁর তিন উপজেলার ওপর দিয়ে গত রবিবার বয়ে যাওয়া ঝড়ে তিনশ’র বেশি ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির সাতদিনেও ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা না করায় পায়নি কোনো সহযোগিতা। অনেকেই খোলা আকাশের নিচে পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। সরকারি পর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকার পরও তালিকা হাতে না পাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্তদের সহযোগিতা দেয়া সম্ভব হয়নি বলে জানান জেলা প্রশাসক ড. আমিনুর রহমান।
 
জানা গেছে, গত রবিবার বিকালে জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া আকস্মিক ঝড়ে মহাদেবপুর, আত্রাই ও বদলগাছী উপজেলার প্রায় ২০টি গ্রামের তিনশ’র বেশি ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে।
 
আত্রাই উপজেলার গোয়ালবাড়ি নৈদীঘি গ্রামসহ চারটি গ্রামের একশ’ ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মহাদেবপুর উপজেলার রাইগাঁ ইউনিয়নে। এই ইউনিয়নের রহট্টা, কন্দুনা, আলতাদীঘি, রাইগাঁ, হরিপুর, রঘুনাথপুরসহ প্রায় ১২টি গ্রামের দু’শ’র বেশি বাড়িঘর বিধস্ত হয়েছে। ঝড়ে হাজার হাজার গাছপালা ভেঙে গেছে। ঝড়ে গাছের ডাল পড়ে রাইগাঁ ইউনিয়নের রহট্টা গ্রামে মনোয়ারা খাতুন নামে এক নারী ও জেহাদ হোসেন নামে এক স্কুলছাত্রের মৃত্যু হয়েছে। পরদিন সকালে স্থানীয় সংসদ সদস্যের নিজস্ব তহবিল থেকে নিহত দুটি পরিবারকে ১৬ হাজার টাকা দেয়া হয়েছে।
 
গত মঙ্গলবার সকালে জেলা পুলিশ মোজাম্মেল হক, বিপিএম, পিপিএম-এর উদ্যোগে রাইগাঁ ইউনিয়নে ক্ষতিগ্রস্ত একশ’ পরিবারের মধ্যে ১০ কেজি করে চাল এবং নিহত দু’টি পরিবারের মাঝে পাঁচ হাজার টাকা করে ১০ হাজার টাকা দেয়া হয়েছে। এরপর গতকাল শনিবার জেলা প্রশাসনের পক্ষে থেকে নিহত দুই পরিবারের মধ্যে ২৫ হাজার টাকা করে মোট ৫০ হাজার টাকা দেয়া হয়েছে। সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, মহাদেবপুর উপজেলায় ঝড়ের তাণ্ডবলীলার পর ছয়দিন পার হলে ক্ষতিগ্রস্তদের মাত্র কয়েকজনের তালিকা করতে পারলেও সব ক্ষতিগ্রস্তের তালিকা তৈরি করতে পারেনি স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন, ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য ও চেয়ারম্যানরা। এতে সরকারি কোনো সহযোগিতা দেয়াও সম্ভব হয়নি। ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত এ গ্রামগুলোর দরিদ্র এসব অসহায় পরিবারের লোকজন অনেকেই খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
 
রহট্টা গ্রামের আহসান হাবীবের স্ত্রী আলতাফুর বিবি, আফজালের স্ত্রী মোছা: শাহেরা বিবি জানান, তাদের মতো অনেকের রান্না করার চুলা ভেঙে যাওয়ায় রান্না করে খেতে পারছেন না। আত্মীয়-স্বজনদের দেয়া খাবার খেয়েই চলছে দিন। আত্রাই উপজেলার গোয়ালবাড়ি গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত জালাল হোসেন জানান, ঝড়ে তাদের পাকা ঘর ভেঙে গেছে। এখন খোলা আকাশের নিচে বসবাস করতে হচ্ছে। একই গ্রামের মো. সামাদ  জানান, কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঝড়ে তাদের ঘর-বাড়ির টিন উড়িয়ে গিয়ে গেছে। এখন কিভাবে এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠবেন তা নিয়েই এখন চিন্তায় রয়েছেন। আত্রাই উপজেলার মনোয়ারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আল্লামা শেরে বিপ্লব জানান, গোয়ালবাড়ি, নৈদীঘি গ্রাম এবং নওদুলী ও নৈদীঘি বাজারের প্রায় ২০টি দোকানের টিনের ছাউনি উড়ে গিয়ে হাজার হাজার টাকার মালামাল নষ্ট হয়েছে। ইতোমধ্যে ৯৩ জন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা উপজেলা প্রশাসনের কাছে দেয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত সরকারি কোনো সহযোগিতা না পাওয়া ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে দেয়া সম্ভব হয়নি।
 
আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মখলেছুর রহমান জানান, ওই দুটি গ্রাম ও দুটি বাজারের প্রায় ২০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হয়েছে। ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে তালিকা পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পেলেই দ্রুত ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন ও সহযোগিতা দেয়া হবে। মহাদেবপুর উপজেলার রাইগাঁ ইউপি চেয়ারম্যান মঞ্জুরুল আলম জানান, তাদের ইউনিয়নের প্রায় ১২/১৩টি গ্রামের দু’শ’র বেশি বাড়িঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। শনিবার পর্যন্ত দু’শ’ জনের তালিকা করা সম্ভব হয়েছে। বাকি ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা চলছে। দু’একদিনের মধ্যে তালিকা সম্পন্ন হলে সরকারি সহযোগিতা পাওয়া যাবে।
 
জেলা প্রশাসক ড. আমিনুর রহমান জানান, দ্রুত তালিকা তৈরি করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সরকারি বরাদ্দও পর্যাপ্ত রয়েছে। মহাদেবপুর, আত্রাই ও বদলগাছী উপজেলার তিনশ’র বেশি ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা না পেলেও ইতোমধ্যে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে বেশ কিছু বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ তালিকা হাতে পেলেই টিন, নগদ টাকাসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেয়া হবে।
 
 
ইত্তেফাক/এএন