এডিপি বাস্তবায়নের হার ৪০ শতাংশেরও কম

আপডেট : ২৩ মার্চ ২০১৯, ২৩:০৭

আলাউদ্দিন চৌধুরী

উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীর গতির একই কারণ প্রতিবছর ঘুরে ফিরে আসছে। এই বৃত্ত থেকে বের হতে যে সুপারিশ করা হচ্ছে সেগুলোও একই ধরণের। ফলে অর্থবছরের বেশিরভাগ সময় পার হয়ে গেলেও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন হার একই বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) এডিপির মাত্র ৩৯ দশমিক ১৩ শতাংশ ব্যয় হয়েছে। আগের অর্থবছর একই সময় হয়েছিল ৩৮ শতাংশ। অর্থবছরের শুরুতে বরাদ্দ ছাড় করতে প্রকল্প পরিচালকদের ক্ষমতা বৃদ্ধি, আইএমইডি ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের বিভিন্ন উদ্যোগ সত্ত্বেও প্রত্যাশিত গতি আসেনি এডিপি বাস্তবায়নে। টাকার অংকে বাস্তবায়ন বাড়লেও গুণগত পরিবর্তন আসেনি। প্রতিবছর অর্ধেকের বেশি অর্থ ব্যয় হচ্ছে শেষ দুই-তিন মাসে।

সম্প্রতি প্রকাশিত ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। এতে প্রতিবছরের মতো একই চ্যালেঞ্জ ও একই সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। প্রকল্প গ্রহণে সুদুরপ্রসারী পরিকল্পনা না করা, সম্ভাব্যতা ছাড়ই প্রকল্প গ্রহণ, নিবিড় মনিটরিং এর অভাব, ভূমি জটিলতা, প্রকল্প পরিচালক এলাকায় অবস্থান না করার মতো গতানুগতিক চ্যালেঞ্জ তুলে ধরা হয়েছে। আইএমইডির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, সুপারিশ করেও কোন ফল মিলছে না। প্রকল্প অনুমোদনের পর বাস্তবায়নকালে বেশিরভাগ প্রকল্পই এক বা একাধিক বার সংশোধন হচ্ছে। প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে সমাপ্ত হয় না। ফলে প্রকল্পের সুবিধা হতে জনগণ বঞ্চিত হয়। প্রকল্প পরিচালকরা এলাকায় থাকে না, এমন   অভিযোগ অনেক পুরোনো। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বিবেচনা না করে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রকল্প গ্রহণের পর এর কর্ম পরিকল্পনা যথাযথ ভাবে করা হয়না, প্রতিবছর এমনই চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করছে আইএমইডি।

মন্তব্য জানতে চাইলে পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর ইত্তেফাককে বলেন, মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। সেখানেই ঘাটতি রয়েছে। অনেক সময় সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়া রাজনৈতিক বিবেচনায় দ্রুত প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। পরবর্তীতে বাস্তবায়ন পর্যায়ে গিয়ে নানা জটিলতা তৈরি হয়। এতে করে প্রকল্পের সময় বেড়ে যাচ্ছে, খরচও বেড়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ভালো কাজে যেমন পুরস্কারের ব্যবস্থা নেই, তেমনি গাফলতির জন্য শস্তি দেওয়া হয় না। জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নের তদারকি বাড়াতে আইএমইডিকে শক্তিশালী করলেই হবে না, প্রকল্প শুরুর পর্যায় থেকে নিবিড় তত্ত্বাবধান করতে হবে। প্রকল্প গ্রহণের আগে এর সুফল কতটা জনগণ পাবে সেটা যাচাই করতে হবে।

উল্লেখ্য, এডিপি বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায়ও নানা চিত্র উঠে এসেছে। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি হওয়া ওই বৈঠকে এডিপি শতভাগ বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বিভিন্ন সুপারিশও করা হয়। পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সমস্যাগুলো উঠে আসে। বৈঠকে জানানো হয়, জমি সংকটের কারণে অনেক উন্নয়ন প্রকল্প সুষ্ঠু ভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে না। তবে ভূমির জটিলতা নেই এমন প্রকল্পেও ধীর গতি রয়েছে। সভায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুসারে নির্বাচনকালীন সময়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়সমূহের নির্মাণ কাজ বন্ধ থাকায় এডিপি বাস্তবায়নে অগ্রগতি কম হয়েছে। তাছাড়া প্রকল্পে পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ না দেওয়ায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে কাজে ধীর গতি রয়েছে বলে সচিবরা উল্লেখ করেন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের জটিলতাও উঠে এসেছে। চুক্তির পর অর্থ ছাড়ে জটিলতায় ধীর গতি রয়েছে সেতু বিভাগে। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষ প্রকল্প পরিচালকের অপ্রতুলতা রয়েছে। পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক না থাকায় অনেক প্রকল্পে বাস্তবায়নে ধীর গতি হচ্ছে।

আইএমইডির পর্যালোচনা প্রতিবেদনে নির্মাণ কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করতে তদারকি জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে। সেইসাথে বাস্তবায়নকারী সংস্থার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা বিবেচনায় এনে যুক্তিসঙ্গতভাবে প্রকল্প গ্রহণের বিষয়ে সুপারিশ করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, চলতি অর্থবছরের (২০১৮-১৯) জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই আট মাসে এডিপি বাস্তবায়নে ব্যয় হয়েছে ৭০ হাজার ৭৭২ কোটি টাকা। অর্থবছরের শুরুতে ১ লাখ ৮০ হাজার ৮৬৯ কোটি টাকার এডিপি প্রণয়ন করা হয়েছিল। এ হিসাবে অর্থবছরের আট মাসে বাস্তবায়নের হার দাঁড়িয়েছে ৩৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। আট মাসে মাত্র ১১ টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের এডিপি বাস্তবায়ন হার ৫০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। আর বরাদ্দের ৩০ শতাংশের কম অর্থ ব্যয় করেছে ১৪ টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। গত সপ্তাহে এনইসি বৈঠকে ১ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকায় সংশোধিত এডিপি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে মূল এডিপি থেকে বৈদেশিক সহায়তা অংশে ৯ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে ৫১ হাজার কোটি টাকা এবং সরকারি তহবিলের (জিওবি) অংশে ১ হাজার টাকা বাড়িয়ে ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে।