ছিন্নমূলদের স্বপ্ন দেখান তারা

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০১৯, ২১:০৮

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সবুজঘেরা জায়গাটিতে আড্ডা দেওয়া কিংবা গানের আসরের বাইরে অন্যকিছু চোখে পড়ে না খুব একটা। প্রায়ই উদ্যানের বৃক্ষমায়া ছাউনিতে দেখা মেলে ছিন্নমূল শিশুদের পাঠদানের দৃশ্য। অক্ষরজ্ঞান থেকে শুরু করে বাংলা, ইংরেজি, সাধারণ জ্ঞান, ছবি আঁকা, গল্পের আসর—সবই রয়েছে এই স্কুলটির পাঠ্য তালিকায়। জানা গেল, এই স্কুলের নাম ‘স্বপ্ন পাঠশালা’। গত ৫ বছর ধরেই নিয়মিত চলছে এই স্কুলের কার্যক্রম।

ছোট্ট পরিসরে শুরু

২০১৪ সাল। এক ছোট্ট শিশু ফুল বিক্রি করছে। টাকার হিসেব করতে গিয়ে ভুল করে শিশুটি। এমনটা ধরা পড়ল ভার্সিটি পড়ুয়া আহসান আহমেদ শুভর চোখে। সাধারণত ঢাকায় যে সকল শিশু ফুল বিক্রি করে তারা মূলত পথশিশু। শুভ ভাবলো, যদি ছেলেটি অন্তত অক্ষরজ্ঞান জানতো তাহলে ওর এমনটা হওয়া কথা না। এবার শুভকে কে থামায়? তার মাথায় ছটফট খেলতে থাকে এ পথশিশুদের জন্য একটা স্কুল প্রতিষ্ঠা করার। দেরি না করে দ্রুতই বন্ধুদের কাছে গল্পটা খুলে বললো শুভ। সবাই সায় দেয়। ওরা ৩৩ জন বন্ধু। শুরুতে জনপ্রতি ৩০০ টাকা করে, মাসিক ১৫০ টাকা করে প্রতিজন সদস্য দেয়। এর মধ্যে সবার মাথায় আরেকটি চমত্কার বুদ্ধি কাজ করে। হুট করে একজন ফেসবুকে একটা ইভেন্ট খুলে বসে। তারপর বাক্স নিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে পথশিশুদের জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠাতার ক্যাম্পেইন করে। এতেই জোগাড় হয়ে গেল ছোট্ট পরিসরে স্কুল প্রতিষ্ঠার খরচ।

প্রতি শুক্র ও সোমবার সকাল ৮টা থেকে ১১টা পর্যন্ত  চলে পথশিশুদের ক্লাস। স্কুলটির শ্লোগানও রয়েছে, ‘নাম লিখতে পারার আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক প্রতিটি পথশিশুর মুখে ছোঁয়াচে রোগের মতো!’

তাদের অন্যান্য কার্যক্রম

পড়ানোই সংগঠনটির প্রধান কাজ। এর বাইরে তাদের ৪০ জন শিক্ষার্থীর পরিবারের কেউ যদি অসুস্থ্য হয় তাহলে তাদের চিকিত্সার ব্যয়ভার বহন করা, সাধ্যমতো এই কয়েকবছরে ৮ জনকে ঢাকার বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ালেখার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। মূলত যারা স্কুলে ভালো করেছে তাদের পড়ালেখার খরচও স্কুল বহন করছে। তাছাড়া বছরের দুই ঈদে তাদের জন্য নতুন জামা-কাপড়, পরিবারের জন্য ঈদের দিনের খাবারসহ নগদ কিছু টাকা দেওয়া হয়। প্রতি শীতে ছাত্রছাত্রীদের শীতের পোশাক আর পরিবারের জন্য কম্বল দেওয়া হয়।

গতবছর থেকে একটি ব্যতিক্রমী প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। সেটি হলো, ‘১ টাকায় স্বপ্নপূরণ’। বাড়তি আরো টাকা দিয়ে কিছু পরিবারকে স্বাবলম্বী করা। এই প্রকল্পের আওতায় ভোলার এক জেডিসি পরীক্ষার্থীকে সহযোগিতা করা হয়েছে। যারা কি-না ভিক্ষা করে সংসার চালায় তাদের পরীক্ষার সময় ভিক্ষা করতে যেন না হয় সেজন্য ১ মাসের খাবার ক্রয় করে দেওয়া হয়েছে। নবম শ্রেণিতে তাদের পড়ালেখার যাবতীয় সহযোগিতা করা হচ্ছে। এমনটা জানালেন সংগঠনটির অন্যতম উদ্যোক্তা মো. ইয়াকুব হোসাইন।

শিশুদের জন্য শিক্ষাসফর, নববর্ষে পান্তা-ইলিশ খাওয়া, ফল উত্সব, ঈদে মেহেদী উত্সব, পিঠা উত্সবসহ আরো নানা আয়োজন করে থাকে তারা। প্রতিটি শিশুর নিয়মিত মেডিকেল চেকআপ করানোও হয়। কাজ করার প্রতিবন্ধকতা জানতে চাইলে সংগঠকরা বলেন, ‘বলতে গেলে তেমন কোনো সমস্যা হয়নি। কেন না সবাই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের আশেপাশের ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট। রাজনৈতিক বা অন্য কোনো সমস্যা নেই। শুধু একমাত্র সমস্যা, আমরা আমাদের নিজেদের অর্থায়নে এটি পরিচালনা করার কারণে ইচ্ছে থাকার পরও আমাদের পরিকল্পনা বড় করতে পারছি না। আমাদের ছাত্রছাত্রীদের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকতে হচ্ছে।’