ভারতের লোকসভা নির্বাচন
তালেব রানা
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টি-বিজেপি ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিপুল বিজয় নিয়ে ক্ষমতায় আসে। সেবার একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল দলটি। দীর্ঘদিন পর ভারতে এককভাবে সরকার গঠনের কৃতিত্ব দেওয়া হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী মোদিকে। ওই নির্বাচনে প্রধান বিরোধীদল কংগ্রেস ৪৪টি আসনে জয় পায়। পাঁচ বছর পর আবারো লোকসভা নির্বাচন হতে চলেছে। সাত দফায় লোকসভার ৫৪৩টি আসনে ভোট গ্রহণ শুরু হবে ১১ এপ্রিল। শেষ দফার ভোট হবে ১৯ মে। ভোট গণনা হবে ২৩ মে।
এই নির্বাচন নিয়ে পুরোদমে প্রচারণায় নেমে গেছে রাজনৈতিক দলগুলো। প্রতিদিনই চলছে রাজনৈতিক নেতাদের বাগযুদ্ধ। কিন্তু ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জাতীয় দলগুলো যতই শক্তিশালী হোক না কেন নির্বাচনে জিততে আঞ্চলিক দলগুলোকে হাতে রাখতে হয়। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্বাচনে আঞ্চলিক দলগুলোর সঙ্গে জোট গড়ার সামর্থ্যের ওপরই নির্বাচনে ভালো করার বিষয়টি অনেকখানি নির্ভর করছে। বলা হচ্ছিল, মন্থর অর্থনীতি, ব্যাপক বেকারত্ব ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অসন্তোষের কারণে এবারের নির্বাচনে বিজেপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। কিন্তু এক্ষেত্রে বিরোধীদের ঐক্য গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর।
গত জানুয়ারির শেষদিকে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় কংগ্রেসসহ বিরোধীদলগুলো বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে মাঠে নামার ঘোষণা দেয়। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির ডাকা এক জনসভায় প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী, নানা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, শক্তিশালী নেতাসহ ভারতের ২০টির বেশি দলের নেতারা হাজির হয়েছিলেন। ভারতের ইতিহাসে বিভিন্ন দলের এত বড় নেতাদের একমঞ্চে খুব কমই দেখা গেছে এর আগে। বিরোধী নেতারা দাবি করেছিলেন, সাম্প্র্রতিক যে কোনো নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যায়, ভোট ভাগাভাগির একমাত্র ফায়দা নিয়েছে বিজেপি। এই বহুদলীয় মঞ্চে হাজির সব নেতা-নেত্রীদের এটা নিশ্চিত করতে হবে যে, বিরোধী ভোট যেন ভাগ না হয়। যেখানে ভোট ভাগ হয়নি, সেখানেই বিজেপি পরাস্ত হয়েছে।
২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ৩০ শতাংশের কিছু বেশি ভোট পেলেও বিজেপি জোটের আসন সংখ্যা ছিল তিনশোর বেশি ছিল। বিরোধীদলগুলোর মধ্যে ভোট ভাগাভাগির সুযোগেই বিজেপি বহু আসনে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পেরেছিল। ধারণা করা হচ্ছিল, এসব দল একজোট হয়ে নির্বাচনে নামলে ভুগতে হবে বিজেপিকে। কিন্তু সব রাজ্যেই যে একইভাবে বিজেপি বিরোধীদলগুলো জোট করতে পারবে, সে সম্ভাবনা নিয়ে তখন সন্দেহ ছিল। নির্বাচনের আগ মুহূর্তে এসে তা বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে। সম্প্রতি ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হয়েছে, আঞ্চলিক দলগুলোর সঙ্গে জোট গড়তে গিয়ে জটিলতার মুখে পড়েছে কংগ্রেস। অন্যদিকে নিজেদের জোট গুছিয়ে নিচ্ছে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ।
বিজেপির বিরুদ্ধে বিরোধীদলগুলো একক প্রার্থী দিতে কয়েকমাস আগে থেকেই দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছিল। প্রথমে মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস এবং পরে জাতীয় কংগ্রেসের উদ্যোগে। কিন্তু দুটি উদ্যোগই এখন অনেকটা স্তিমিত। ভোটের আগে নয় বরং ভোট পরবর্তী জোটেই আগ্রহী ভারতের অধিকাংশ ছোট রাজনৈতিক দল। সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য উত্তর প্রদেশে সমাজবাদী পার্টি (এসপি) এবং বহুজন সমাজবাদী পার্টির (বিএসপি) সঙ্গে জোট গড়ার উদ্যোগ নিয়েছিল জাতীয় কংগ্রেস। কিন্তু কংগ্রেস নেতাদের অনমনীয় মনোভাবের কারণে তা ভেস্তে যাচ্ছে! উত্তর প্রদেশে কংগ্রেসের জন্য সোনিয়া গান্ধীর রায়বেরেলি ও রাহুল গান্ধীর আমেথি আসনটি ছেড়ে জোট করেছিল এসপি ও বিএসপি। তাদের জোটে রয়েছে রাষ্ট্রীয় লোকদল। কিন্তু জোট গড়তে মরিয়া কংগ্রেস এই দুই দলকে ৮০টির মধ্যে ৭টি আসন ছাড়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। কংগ্রেসের ফাঁদে পা দেননি বিএসপি নেত্রী সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মায়াবতী। তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, কংগ্রেসের সঙ্গে কোথাও তার কোনো জোট নেই। কংগ্রেস চাইলে ৮০টি আসনেই প্রার্থী দিতে পারে। বিজেপিকে হারাতে এসপি-বিএসপি-আরএলডি জোটই সক্ষম। মায়াবতীর সুরেই অখিলেশ যাদব জানিয়ে দিয়েছেন, জাতীয় কংগ্রেস বিভ্রান্ত ছড়ানোর চেষ্টা করছে।
পশ্চিমবঙ্গেও কংগ্রেসকে অতিরিক্ত সুবিধা দিতে নারাজ বামরা। পশ্চিমবঙ্গের ৪২ আসনে কংগ্রেস দাবি করেছিল ১৭টি। প্রথমদিকে টানা আলোচনার পর সিপিএম নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট এ বিষয়ে অনেকটাই নমনীয় ছিল। কিন্তু রাজ্য কংগ্রেস নেতাদের সিদ্ধান্তহীনতায় এই জোটও ভেস্তে যাওয়ার পথে।
