দশ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই দেশের ৫ দশমিক ১৭ শতাংশ নারী যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। বিবাহিত নারীদের ৮০ দশমিক ২ ভাগ জীবনে কোনো না কোনো সময়ে আর্থিক, শারীরিক কিংবা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ২০১১ সালে এই হার ছিল ৮৭ ভাগ। গতকাল রবিবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) আনুষ্ঠানিকভাবে ‘নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ-২০১৫’ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, বিবাহিত নারীদের মধ্যে অর্ধেক নারী (৪৯.৬%) কোনো না কোনো ধরনের শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। শুধু ২০১৫ সালে এই হার ছিল ২০ দশমিক ৮ ভাগ। বিবাহিত নারী স্বামী দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে ২৭ দশমিক ৩ ভাগ। অর্থনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১১ দশমিক ৪ ভাগ নারী। যে কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৫৫ দশমিক ৪ ভাগ নারী।
রাজধানীর শেরে বাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। বিবিএসের মহাপরিচালক মো. আবদুল ওয়াজেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা মন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। বিশেষ অতিথি ছিলেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি। বক্তব্য রাখেন ইউএনএফপিএ বাংলাদেশ প্রতিনিধি আর্জেন্টিনা মাতাভেল প্রিসিন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের হেড অব ডেলিগেশন পিয়েরে মায়াদুন, পরিসংখ্যান বিভাগের সচিব কে এম মোজাম্মেল হক প্রমুখ।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নির্যাতিত নারীদের মধ্যে ৭২ দশমিক ৭ ভাগ নারী নির্যাতিত হওয়ার পর এ কথা কাউকে জানাননি। সরকারি ২৪ ঘণ্টার টোল ফ্রি হেল্পলাইন ১০৯২১ সম্পর্কে জানেন এমন নির্যাতিত নারীর হার মাত্র ২ দশমিক ৪ ভাগ। অর্থাত্ ৯৭ দশমিক ৬ ভাগই সরকারি এই সেবার কথা জানেন না। নির্যাতনের পর আইনি সহায়তা নিয়েছেন মাত্র ২ দশমিক ৬ ভাগ নারী।
জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১১ থেকে ২০১৫ এই পাঁচ বছরে বিবাহিত নারীদের ওপর যৌন নির্যাতন কমলেও শারীরিক নির্যাতন বেড়েছে। ২০১৫ সালে প্রায় ৫০ শতাংশ বিবাহিত নারী শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এই সময়ে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ২৭ শতাংশ বিবাহিত নারী। ২০১১ সালে শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের এই হার ছিল যথাক্রমে প্রায় ৪৮ ও ৩৭ শতাংশ।
প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়, ১৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সী বিবাহিত নারীরা সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। শহর পর্যায় ও গ্রাম পর্যায়ে বিবাহিত নারীদের নির্যাতনের হার প্রায় কাছাকাছি। গ্রামের ৫১ দশমিক ৮ শতাংশ বিবাহিত নারী জীবনে কোনো না কোনোভাবে স্বামীর মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। শহরে এই হার ৪৮ দশমিক ৫ শতাংশ। জাতীয় পর্যায়ে এই হার ৪৯ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থনৈতিক নির্যাতনের ক্ষেত্রেও চিত্র প্রায় অভিন্ন। জরিপে দেখা গেছে, শিক্ষিত স্বামী ও শিক্ষিত স্ত্রী উভয়ের ক্ষেত্রে নির্যাতন করার প্রবণতা এবং নির্যাতিত হওয়ার হার তুলনামূলক কম। জরিপে দেখা যায়, গর্ভাবস্থায় ও বাচ্চা প্রসবের চার সপ্তাহের মধ্যে যথাক্রমে ৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ নারী শারীরিক এবং ৯ দশমিক ১২ শতাংশ যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
পরিকল্পনা মন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ করা যাবে না। এটি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তিনি মনে করেন শিক্ষার প্রসারের মাধ্যমে নারী নির্যাতনের হার কমে আসবে। বহুবিবাহ নারী নির্যাতনের একটি বড় কারণ। দেশে পুরুষ নির্যাতনের তথ্যও সংগ্রহ করতে হবে উল্লেখ করে পরবর্তী প্রতিবেদনে পুরুষ নির্যাতনের তথ্য সন্নিবেশিত করার জন্য বিবিএসকে আহ্বান জানান পরিকল্পনামন্ত্রী।
প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি বলেন, ২০১১ সালের তুলনায় নারী নির্যাতনের হার ২০১৫ সালে কিছুটা কমে এসেছে। তার মানে এই নয় যে এই তথ্যে আমরা সন্তুষ্ট। আমাদের লক্ষ্য হলো নারী নির্যাতন নির্মূল করা। নারী নির্যাতন কমানো সম্ভব না হলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ইত্তেফাক/এএন
