যে ছিল দৃষ্টির সীমানায়/যে ছিল হূদয়ের আঙ্গিনায়/সে হারালো কোথায়/ কোন দূর অজানায়— শাহনাজ রহমতুল্লাহর হূদয় আকুল করা কণ্ঠ প্রতিটি বাঙালির হূদয়ে জেগে থাকবে চিরকাল। তার প্রতিটি গান অনন্য গায়কীর স্পর্শে হয়ে উঠেছে অতুলনীয়। বাংলা সংগীতে সম্ভ্রান্ত উচ্চতায় তার অবস্থান। শাহনাজ রহমতুল্লাহর গায়কী তাকে ‘অভিজাত’ ঘরানার শিল্পীর কাতারে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। দেশাত্মবোধক গানকে তিনি এমন এক উচ্চতায় পীেঁছে দিয়েছেন; যা বাংলা গানে তাকে কালজয়ী শিল্পীর মর্যাদা এনে দিয়েছে।
গত শনিবার মধ্য রাতে বারিধারায় নিজ বাসভবনে হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন বাংলা গানের সেই কালজয়ী শিল্পী শাহনাজ রহমতুল্লাহ (ইন্নালিল্লাহি ... রাজেউন)। তার বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর। গতকাল রবিবার বাদ জোহর বারিধারার পার্ক মসজিদে নামাজে জানাজা শেষে এই বরেণ্য শিল্পীকে বনানী সম্মিলিত সামরিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। তার স্বামী মেজর (অব.) আবুল বাশার রহমতুল্লাহ ব্যবসায়ী, মেয়ে নাহিদ রহমতুল্লাহ থাকেন লন্ডনে আর ছেলে এ কে এম সায়েফ রহমতুল্লাহ এখন কানাডায় থাকেন। তার মৃত্যুতে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ শোক জানিয়েছেন।
আধুনিক গান, গজল, দেশাত্মবোধক ও চলচ্চিত্রের অসংখ্য চিরায়ত ধারার গান গেয়েছেন শিল্পী শাহনাজ রহমতুল্লাহ। ১৯৫২ সালে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ছোটবেলা থেকেই সংগীত চর্চার শুরু। আধুনিক বাংলা গানের এই বরেণ্য শিল্পী ছোটবেলাতেই শ্রোতাপ্রিয়তা লাভ করেন। সেই থেকে বাংলা, উর্দু বেশকিছু ছবিতে গান করেছেন। তার গাওয়া অসংখ্য গান বাংলা সংগীত জগতকে সমৃদ্ধ করেছে। মাত্র ১১ বছর বয়সে ১৯৬৩ সালে ‘নতুন সুর’ ছবির মাধ্যমে প্লেব্যাক শুরু করেন। সেই থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত নিয়মিত বাংলাদেশি চলচ্চিত্রে গান গেয়েছেন। ১৯৭৩ সালে ‘আবার তোরা মানুষ হ’ চলচ্চিত্রেও গান গেয়েছেন। টেলিভিশনে গান পরিবেশন শুরু করেন ১৯৬৪ সাল থেকে। গীতিকার ও সুরকার খান আতাউর রহমানের ‘তোমার আগুনে পোড়ানো এ দুটি চোখে’ ছিল তার বেতারের হিট গান।
বাংলাদেশের দেশাত্মবোধক গানের কথা বলতে গেলে সবার আগেই চলে আসে শাহনাজ রহমতুল্লাহর নাম। খেলাঘর থেকে গান গাওয়া শুরু করেন তিনি। গজলসম্রাট মেহেদি হাসানের শিষ্য হয়েছিলেন তিনি। তার ভাই আনোয়ার পারভেজ ছিলেন সুরকার, তার আরেক ভাই প্রয়াত চিত্রনায়ক জাফর ইকবালও খুব ভালো গান গাইতেন। গানের ক্ষেত্রে মায়ের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন তারা।
শ্রোতাদের পছন্দের ওপর ভিত্তি করে বিবিসি বাংলার এক জরিপে সর্বকালের সেরা ২০টি বাংলা গানের তালিকায় শাহনাজ রহমতুল্লাহর চারটি গান স্থান পেয়েছিলো। ১৯৯২ সালে একুশে পদক প্রাপ্ত এই শিল্পী তার ক্যারিয়ার শেষ করার ঘোষণা দেন পেশাগত জীবনের ৫০তম বছরে। সেসময় ‘বাদল দিনের পাখি’ শিরোনামের গানের অ্যালবামে তিনটি গানে কণ্ঠ দেন তিনি। ১৯৯০ সালে ‘ছুটির ফাঁদে’ ছবিতে গান গেয়ে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান তিনি। এ ছাড়াও সংগীতে বিশেষ অবদানের জন্য শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার ও চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতির পুরস্কার, ২০১৬ সালে ‘চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড’ আজীবন সম্মাননা, ২০১৩ সালে সিটি ব্যাংক থেকে গুণীজন সংবর্ধনা দেওয়া হয় তাকে। এ ছাড়া গান গেয়ে আরো অসংখ্য পুরস্কার আর সম্মাননা পেয়েছেন তিনি। গানের জগতে ৫০ বছরে শাহনাজ রহমতুল্লাহর চারটি অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে। প্রথমটি ছিল প্রণব ঘোষের সুরে ‘বারটি বছর পরে’।
শাহনাজ রহমতুল্লাহর জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে রয়েছে: ‘একতারা তুই দেশের কথা বলরে এবার বল, ‘এক নদী রক্ত পেরিয়ে’, ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’, ‘সাগরের তীর থেকে,’ ‘ফুলের কানে ভ্রমর এসে,’ ‘আমায় যদি প্রশ্ন করে,’ ‘পারি না ভুলে যেতে’, ‘যে ছিল দৃষ্টির সীমানায়’, ‘একবার যেতে দে না আমায় ছোট্ট সোনার গাঁয়’, ‘আমার দেশের মাটিরও গন্ধে’, ‘আমি তো আমার গল্প বলেছি’ ইত্যাদি। এ রকম অসংখ্য গান শাহনাজ রহমতুল্লাহকে বাঙালি শ্রোতার হূদয়ে বাঁচিয়ে রাখবে চিরকাল!
সংস্কৃতি অঙ্গনে শোকের ছায়া
শিল্পীর মৃত্যুতে তার বারিধারার বাসায় শনিবার রাত থেকেই দেশের সংগীত ও সংস্কৃতিমণ্ডলের মানুষের ভিড় দেখা যায়। বিএনপির পক্ষ থেকে একটি দল শিল্পীর বাসায় যায়। গীতিকার ও বিএনপির উপদেষ্টা গাজী মাজহারুল আনোয়ার, দলের সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক চিত্রনায়ক উজ্জল ও দলের চেয়ারপারসনের প্রেস উইংয়ের সদস্য শায়রুল কবির খানসহ আরো কয়েকজন পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।
সৈয়দ আব্দুল হাদী বলেন, শাহনাজ রহমতুল্লাহ অভিমান বুকে নিয়ে চলে গেলেন! কেন অভিমান করেছিলেন, তা আমি বলবো না। এখন তা বলার সময়ও নয়। তবে ধীরে ধীরে তার মতো কিংবদন্তি শিল্পীদের চলে যাওয়ার যে ক্ষতি, তা আর পূরণ হচ্ছে না। হবেও না।
সামিনা চৌধুরী বলেন, আমি আর ফাহমিদা আপা যখন একেবারে ছোট, তখন তার গান গাইতে গাইতে আমাদের বেড়ে ওঠা। সেই ছোটবেলায় যে আদর তিনি আমাদের করতেন, তা সবসময় পেয়েছি! শুধু গায়িকা নন, তিনি আমার আদর্শ ছিলেন, অভিভাবক ছিলেন। তিনি সব সময় বলতেন, ‘তুই গান গেয়ে যাবি। থামবি না। আমার সব গান তুই গাইবি!’ এই যে ছায়া, তা মাথার ওপর থেকে সরে গেল।
কুমার বিশ্বজিত্ বলেন, চলে যেতে হয়, এটাই স্বাভাবিক। তবে এভাবে হঠাত্ চলে যাওয়াটা খুবই বেদনার। শাহনাজ রহমতুল্লাহ আমাদের মাথার ওপর ছাতার মতো ছিলেন। সেই ছাতাটা সরে গেল।
