জলকপাট অপসারণ ও চলনবিলের নদ-নদী রক্ষায় নৌ-লং মার্চ

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০১৬, ০৫:৪৬
নদী খেকোদের প্রভাবে দখল দূষণ আর ভরাটের কবলে পড়ে অস্তিত্ব হারানো চলনবিল ও আত্রাই, নন্দকুঁজা, গুমানী, বড়ালসহ চলনবিলের প্রধান ১৬টি নদ-নদী রক্ষায় ২০০৮ সাল থেকে বিভিন্ন সংগঠনের আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে
 
রাজশাহীর পদ্মানদীর চারঘাট পয়েন্টে নন্দকুঁজা-বড়াল নদীর উত্সমুখে নির্মিত জলকপাট অপসারণসহ চারদফা দাবিতে নৌ-লং মার্চ করেছে গুরুদাসপুর উপজেলা নদীরক্ষা কমিটি। গতকাল বুধবার সকাল ১০টায় চাঁচকৈড় নদীবন্দর থেকে অর্ধশতাধিক নৌকাযোগে নৌ-লং মার্চ চারঘাট অভিমুখে যাত্রা শুরু করে। পৌর মেয়র শাহনেওয়াজ আলী ওই নৌ-লং মার্চের নেতৃত্ব দেন।
 
চারঘাট জলকপাটসহ নন্দকুঁজা, আত্রাই গুমানী ও বড়াল নদীতে নির্মিত সকল ক্রসবাঁধ ও রেগুলেটর অপসারণ, ভরাট হয়ে যাওয়া এসব নদী সিএস রেকর্ডের ভিত্তিতে জরিপ করে অবৈধ দখল উচ্ছেদের মাধ্যমে নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার দাবি জানান আয়োজক কমিটি। অন্যথায় পরে বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন তারা।
 
নদী খেকোদের প্রভাবে দখল দূষণ আর ভরাটের কবলে পড়ে অস্তিত্ব হারানো চলনবিল ও আত্রাই, নন্দকুঁজা, গুমানী, বড়ালসহ চলনবিলের প্রধান ১৬টি নদ-নদী রক্ষায় ২০০৮ সাল থেকে বিভিন্ন সংগঠনের আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। এ ছাড়া নদী বিষয়ক টাস্কফোর্সের সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নের জন্য পুনরায় বড়াল রক্ষা আন্দোলন কমিটির উদ্যোগে চলনবিল অঞ্চলের প্রায় এক লাখ মানুষের গণস্বাক্ষরিত ছয়টি দাবি সংবলিত একটি স্মারকলিপি প্রধানমন্ত্রী বরাবর পাঠানো হয়।
 
ইম্পেরিয়েল গেজেট অব ইন্ডিয়া বই থেকে জানা যায়, চলনবিল অঞ্চলে ১৭৫৭ হেক্টর আয়তনের ৩৯টি বিল, ৪২৮৬ হেক্টর আয়তন বিশিষ্ট ১৬টি নদী এবং ১২০ বর্গ কি.মি. আয়তন বিশিষ্ট ২২টি খাল রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান নদী ৯টি, ২০টি খালসহ ছোট ছোট বিভিন্ন বিল ও খাল রয়েছে। অতীতে ২৩ হাজারের মত বড় বড় পানির আধার ছিল। যা বেশির ভাগই বেদখলকৃত ও হাত ছাড়া হয়ে গেছে।
 
চলনবিল রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মজিবুর রহমান মজনু জানান, চলনবিল ও নদ-নদী রক্ষায় তারা গতকাল বুধবার ৫০ কি.মি নৌকা লং মার্চ করেছেন। তা ছাড়া গুরুদাসপুরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া আত্রাই, নন্দকুঁজা ও গুমানী নদীর তীর ঘেঁষে ‘নদী বাঁচাও’ স্লোগানে মানববন্ধন, নদী পাড়ের চার জেলার আট উপজেলার মানুষ ২২০ কিলোমিটার দীর্ঘ পৃথিবীর বৃহত্তম মানববন্ধন কর্মসূচিও পালনসহ তারা নদী রক্ষায় ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছেন। কিন্তু কিছু প্রভাবশালীমহল নদী শাসন করার ফলে এসব নদ-নদী এখন মৃতপ্রায়। ফলে বিপর্যয়ের মুখে রয়েছে নদী অঞ্চলের প্রায় এক কোটি মানুষ।
 
এ ছাড়া প্রমত্তা পদ্মার শাখা নদী বড়াল রক্ষা, দখলমুক্তকরণ, বাঁধ অপসারণ, পুনঃখনন ও ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), বড়াল রক্ষা আন্দোলন ও চলনবিল রক্ষা আন্দোলন কমিটি।
 
চলনবিলের নদী ও খাল, নদীগুলোর মধ্যে আত্রাই, নন্দকুঁজা, গুমানী, গুড়, করতোয়া, বড়াল, তুলসি চেঁচিয়া, ভাদাই, চিকনাই, বানগঙ্গা ইত্যাদি। ১৮টি খালের মধ্যে নবীরহাজির জোলা, হকসাহেবের খাল, নিমাইচড়াখাল, বেশানীরখাল, গুমানীখাল, উলিপুরখাল, সাঙ্গুয়াখাল, দোবিলাখাল, কিশোরখালির খাল, বেহুলারখাড়ি, বাকইখাড়া, গোহালখাড়া, গাড়াবাড়ি খাল, কুমারভাঙাখাল, জানিগাছার জোলা, সাত্তার সাহেবের খাল, কিনু সরকারের ধর।
 
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞানী ড. মো. রেদওয়ানুর রহমানের প্রবন্ধ থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, প্রায় ৩০ বছর আগেও চলনবিলের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত এসব নদ-নদীতে বছর জুড়েই ৬-১২ ফুট পানি থাকত। ফলে বছর জুড়েই নৌ চলাচল করতো। কিন্তু বছরের পর বছর পলি জমে এসব নদী ভরাট হয়ে গেছে। পরিসংখ্যানমতে, প্রতি বছর ২২২১/২ মিলিয়ন ঘনফুট পলি প্রবেশ করে, ৫৩ মিলিয়ন ঘনফুট পলি বর্ষায় চলনবিল ত্যাগ করে।
 
ওই নিবন্ধে বলা হয়েছে-জলবায়ু পরিবর্তনে ফারাক্কার বাঁধ বিরূপ প্রভাব ও ৮০’র দশকে পদ্মার উত্স মুখে অপরিকল্পিত স্লুইসগেট নির্মাণের ফলে চলনবিলের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত বিভিন্ন নদ-নদী ও বিল, জলাশয়, খালগুলোতে পলি জমে ক্রমশ ভারাট হয়ে গেছে। তা ছাড়া বিলের মাঝ দিয়ে যথেচ্ছাভাবে সড়ক, ব্রিজ-কালভার্ট, নদী দখল করে বসতি, দোকানপাট স্থাপন করায় নদীগুলো সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
 
পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক ডা. আব্দুল মতিন, বড়াল রক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়কারী আবু হেনা মোস্তফা কামাল ও মিজানুর রহমান জানান, দেশের বৃহত্তম পদ্মা-যমুনা নদী এবং জলাভূমি বিশাল চলনবিলের মধ্যে প্রধান সংযোগ নদী হচ্ছে বড়াল। এই নদী ৪টি জেলা ও ৮টি উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। রাজশাহীর চারঘাট থেকে উত্পত্তি হয়ে চলনবিলের মধ্যে দিয়ে মুশাখা, নন্দকুঁজা, চিকনাইসহ বেশ কয়েকটি নদীর জন্ম দিয়ে সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ির হুড়াসাগর হয়ে যমুনায় মিলিত হয়েছে। এক সময় এই নদী ছিল প্রবাহমান। কিন্তু ৮০’র দশকে পানি উন্নয়ন বোর্ড অপরিকল্পিতভাবে নদীর উত্স মুখ ও ৪৬ কিলোমিটার ভাটি এলাকার আটঘড়িয়ায় স্লুইসগেট নির্মাণ, পাবনার চাটমোহরে তিনটি ক্রস বাঁধ ও স্লুইসগেট নির্মাণের কারণে প্রমত্তা বড়াল বর্তমানে পুকুরে পরিণত হয়েছে। এ ছাড়া কয়েকটি শিল্প-কারখানার তরল বর্জ্যে পানি দূষণসহ ভূমি দস্যুদের কবলে পড়ে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
 
বড়াইগ্রাম বড়াল রক্ষা আন্দোলন কমিটির সদস্য সচিব জানান, বড়াল নদী চালু ও তা রক্ষার জন্য বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), বড়াল রক্ষা আন্দোলন, চলনবিল রক্ষা আন্দোলনসহ বিভিন্ন সংগঠন, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও সর্বস্তরের মানুষ গত ২০০৮ সাল থেকে আন্দোলনে নামে। নাটোর, পাবনা ও রাজশাহীর সংসদ সদস্যরাও ওই আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণা করেন। পরে জনদাবির মুখে পানি উন্নয়ন বোর্ড টাস্কফোর্স গঠন করে। নদী বিষয়ক টাস্কফোর্স এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটির সভায় বড়াল নদীর সব বাধা অপসারণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। কিন্তু বাস্তবে নদী উদ্ধারে কিছুই করা হয়নি। বড়াল নদীর ওপর নির্মিত সকল স্লুইসগেট-বাঁধ অপসারণ করে সেখানে প্রস্থ সেতু নির্মাণ করাসহ নদীর সীমানা চিহ্নিত ও দখলদার উচ্ছেদ করে অচল নদী সচল করতেই বিভিন্ন আন্দোলন।
 
নাটোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) মো. আনোয়ার হোসেন জানান, গঙ্গা ব্যারেজের কারণে উজানে পদ্মা নদীর পানি প্রবাহ কমে যাওয়ায় বড়ালের নাব্যতা কমে গেছে। এটি একটি জাতীয় সমস্যা। তবে অবৈধ দখল উচ্ছেদ অভিযান চলমান আছে।
 
নাটোর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি (গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রাম) আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল কুদ্দুস বলেন, চলনবিলসহ বড়াল নদীকে রক্ষা করতে পারলে উত্তরের আট উপজেলার এক কোটি মানুষের স্বাভাবিক জীবন-যাত্রা অব্যহত থাকবে। বেকারত্ব থেকে মুক্তি পাবে অন্তত পক্ষে ১০ লাখ মানুষ।
 
আয়োজক সংগঠন নদী রক্ষা কমিটির সভাপতি আতহার হোসেন, প্রধান উদ্যোক্তা মো. এমদাদুল হক মোল্লা, চলনবিল রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মজিবুর রহমান মজনু, উপজেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সামছুল হক শেখ, উপাধ্যক্ষ আব্দুস সালাম ও সাংবাদিক এমএম আলী আক্কাছসহ নানা শ্রেণি পেশার মানুষ এ নৌ-লং মার্চ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন। পরে চার দফা দাবি সম্বলিত একটি স্মারকলিপি প্রধানমন্ত্রী, চেয়ারম্যান জাতীয় নদী কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে পাঠান নদীরক্ষা কমিটি।
 
নৌ-লং মার্চটি বেলা ২টায় বড়াইগ্রামের রামাগাড়ি এলাকায় নির্মিত একটি জলকপাটে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে সেখানে সমাবেশ করেন। বড়াইগ্রামের জোয়ার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান চাঁদমোহাম্মদ এতে সভাপতিত্ব করেন। সেখানে স্থানীয় লোকজন নদীরক্ষা কমিটির সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেন।
 
 
ইত্তেফাক/এএন