নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার শিবপুর বারোয়ারি দুর্গা মন্দিরে ৫৮ তম দুর্গোৎসব জাঁকজমক ভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রতিদিন উৎসব মুখর পরিবেশে প্রতিমা দর্শন ও পূজা-অর্চনা করতে হাজারো ভক্ত আসেন মন্দিরে। দুর্গাপূজা উপলক্ষে জেলায় একমাত্র মন্দিরে আশেপাশে এক কিলোমিটার জুড়ে জমে উঠেছে গ্রামীণ মেলা। পূজার সময় এ মেলার স্থায়ী হয় ১৮/২০ দিন। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষের অংশগ্রহণে শিবপুর মিলনমেলায় পরিণত হয়।
জানা গেছে, জেলার নিয়ামতপুর উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকার শিবপুর বাজার। এই এলাকা আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকা। স্থানীয় সাংসদ সাধন চন্দ্র মজুমদারের স্বর্গীয় বাবা কামিনী কুমার মজুমদার ১৯৫৮ সালে বারোয়ারি দুর্গা মন্দির স্থাপন করে স্থানীয়দের নিয়ে পূজা-অর্চনা শুরু করেন। সে সময় এই পশ্চাৎপদ এলাকার তেমন বিনোদনের ব্যবস্থা না থাকায় পূজা দেখা ও প্রসাদ নিতে ভক্তবৃন্দ আসতে শুরু করেন। এক পর্যায় দোকানদারের পরস নিয়ে বসায় প্রথমে ছোট আকারে মেলায় পরিণত হলে বছর বছর বড় আকারে মেলা বসে। এ সময় অন্যান্যে ধর্মের লোকেরাও পূজার অনুষ্ঠানে এসে পূজার আনন্দ ও সহযোগিতা করতেন। মহান স্বাধীনতার পরে থেকে মোটামুটি মাঝারি আকারে মেলা বসতো। মেলায় রাজশাহী, জয়পুরহাট, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ জেলার হাজারো ভক্ত ও দর্শনার্থী আসেন। ভক্ত ও দর্শনার্থীদের কথায় মাথায় রেখে ২০১০ সালে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সংসদ সদস্য বাবু সাধন চন্দ্র মজুমদারের চেষ্টায় মন্দিরের সম্প্রসারণ করা হয়। এরপর থেকে প্রতি বছর দুর্গার পূজার বড় আকার বড় হতে শুরু করে পাশাপাশি মেলার আকারও বড় হতে শুরু করে।
IMG0
জানা গেছে, এই মন্দির দেশের মধ্যে তৃতীয় বৃহত্তম। এই মন্দিরকে ঘিরে জেলায় এক মাত্র গ্রামীণ মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।
আয়োজকরা জানান, প্রতিবারের মতো এবারেও তাঁদের এ দুর্গোৎসবের আয়োজন ব্যতিক্রমী ও অনন্য। গত শুক্রবার মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসব শুরু হলেও পূজা উপলক্ষে এখানে মেলা বসে আরও সাত-আট দিন আগে থেকেই। মেলা শেষ হয় দুর্গাপূজা শেষ হওয়ার আরও সাত-আট দিন পর। পূজা উপলক্ষে এখানে প্রায় ১৮-২০ দিন ধরে গ্রামীণ মেলা চলে।
সরেজমিনে দেখে গেছে, শিবপুর বারোয়ারী দুর্গা মন্দিরে গিয়ে প্রতিমা দর্শন করতে মন্দির প্রাঙ্গণে ভক্তদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। পাশাপাশি মেলায় আগত দর্শনার্থীদের আনন্দ উপভোগের জন্য সার্কাস ও যাত্রার আয়োজন করা হয়েছে। নাগরদোলায় চড়ে আনন্দ উপভোগ করতে দেখা যায় ছোটদের। মাটির হাড়ি-পাতিল, ছোটদের জন্য হরেক রকমের খেলনার পসরা সাজিয়ে বসেছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরণের মিষ্টান্ন থেকে শুরু করে আসবাবপত্রের দোকানও বসেছে মেলায়।
উপজেলার হাজিনগর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি সুরঞ্জন বিজয়পুরী জানান, দুর্গা পূজায় গণেশ, কার্তিক ও অসুরের পাশাপাশি ত্রিনাথ ও ত্রিনয়নী দেবীর প্রতিমা স্থাপন করা হয়েছে। যা অন্যান্য মন্দিরের চেয়ে ব্যতিক্রমী ও অনন্য। এ ছাড়া এখানে বারোয়ারি দুর্গা মন্দির ছাড়া একই স্থানে শ্রীশ্রী লোকনাথ বাবা মন্দির, শিব মন্দির, বিষ্ণু মন্দির ও শ্রী গণেশ গোঁসাইয়ের মন্দির রয়েছে। এ কারণে প্রতিমা দর্শন করতে প্রতি বছর মন্দির প্রাঙ্গণে আসেন হাজারো ভক্ত। পা ফেলার জায়গাও থাকেন।
মাটির হাড়ি-পাতিল বিক্রেতা রতন কুমার জানান, আট বছর থেকে মেলায় রং-বে-রং-এর হাঁড়ি-পাতিল, ছোটদের জন্যে মাটির তৈরী কাঁঠাল, কলা, আম, বিভিন্ন ধরনের পুতুল নিয়ে আসেন। দীর্ঘ ১৮-২০ দিন মেলা চলায় বেচাকেনাও বেশি হয়ে থাকে।
সনাতন সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অর্থাৎ পূজার বিভিন্ন সামগ্রী বিক্রেতা কানাই চন্দ্র জানান, তিনি বগুড়া থেকে দোকান নিয়ে এসেছেন। দীর্ঘ দিন মেলা চলায় ধর্মীয় বই, চন্দ্র, তিলক, মালা, শাঁখা, পূজার জন্যে ঘণ্টা, পিতলের মূর্তি বিক্রি বেশি হয়ে থাকে।
মিষ্টি বিক্রেতা আব্দুর রহিম জানান, এ মেলা উপলক্ষে এলাকায় প্রায় প্রতি ঘরের আত্মীয়-স্বজন আসায় মিষ্টির চাহিদা বেড়ে যায়। এতে মিষ্টি বিক্রি নিয়ে তাদের ভোগান্তি পোহাতে হয় না।
মন্দিরের পুরোহিত শ্রী দুলাল কুমার চক্রবর্তী বলেন, ভক্তরা এখানে দেবী দুর্গার প্রতিমা দর্শন করতে এসে অন্যান্য দেব-দেবীর কাছেও অঞ্জলি দিতে এবং প্রসাদ নিতে পারেন।
শিবপুর বারোয়ারী মন্দির কমিটির সভাপতি মনোরঞ্জন মজুমদার বলেন, ১৯৫৮ সাল থেকে এই মন্দিরে দুর্গোৎসব হয়ে আসছে। দুর্গোৎসব উপলক্ষে এখানে প্রায় মাসব্যাপী উৎসব চলে। পূজা উপলক্ষে গত ছয়-সাত বছর ধরে আশপাশের এলাকায় জুড়ে বসে বর্ণাঢ্য গ্রামীণ মেলা। স্থানীয় সাংসদ বাবু সাধন চন্দ্র মজুমদার ও প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতায় এখানে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দুর্গোৎসব পালিত। এবারেও এখন পর্যন্ত সুষ্ঠু পরিবেশে দুর্গোৎসব ও মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
তিনি আরো জানান, এই পূজা উপলক্ষে দশমীর পর প্রতি বছর একাদশীর দিন বিকেলে (অর্থাৎ এ বছর আগামী বুধবার) আদিবাসী সাঁওতালদের অনেক বড় পরিসরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এ অনুষ্ঠানে জেলার বিভিন্ন পর্যায় সরকারি কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ কয়েকটি জেলার বিভিন্ন পর্যায় লোকজন আসেন এ অনুষ্ঠান উপভোগ করতে।
জেলা প্রশাসক ড. আমিনুর রহমান জানান, জেলায় ৭৩৮টি পূজা মণ্ডপে শান্তিপূর্ণভাবে শারদীয় পূজার অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সরকারের নির্দেশে জেলার প্রতিটি মণ্ডপে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়োজিত করা ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের তৎপরতায় এখন পর্যন্ত কোন অপ্রীতিকর কোন ঘটনা ঘটেনি। তিনি আশা করে শান্তিপূর্ণভাবে শারদীয় পূজা শেষ হবে।
ইত্তেফাক/আরএ
