ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ মহান মুক্তিযুদ্ধের অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়

আপডেট : ২৫ মার্চ ২০১৯, ১৯:৩৪

একাত্তর ছিল শত্রুর বিরুদ্ধে সম্মিলিত সাহস ও ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ার এক মহাকাব্যিক আয়োজন। ’৭১পূর্ব বাংলাদেশের প্রায় হাজার বছরের ইতিহাস অনুসন্ধানে এ ভূখণ্ডের মানুষদের স্ব-শাসিত হওয়ার তথ্য তেমন উল্লেখ্য নয়। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্ষিপ্তভাবে কিছু আন্দোলন-সংগ্রাম দানা বেঁধে উঠলেও তা সামগ্রিক, পূর্ণাঙ্গ এবং সংগঠিত উপায়ে অগ্রসর হয়ে সফলতা পায়নি। এ প্রেক্ষিতে ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭০-এর নির্বাচন এবং ’৭১-এ বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের আহ্বান এক নবতর ইতিহাসের সূচনা করে, যা এদেশের জনজীবনে অভাবিত একটি বিষয়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর আহ্বানে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল স্বাধীনতাকামী বাঙালি জাতির হাজার বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের চূড়ান্ত অভিঘাত। মহান এই যুদ্ধে বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠীর সামরিক-বেসামরিক ব্যক্তিবর্গের পাশাপাশি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারী-পুরুষের স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে এটি একটি জনযুদ্ধে পরিণত হয়েছিল। তাঁদের স্বতস্ফূর্ত ও সাহসী অংশগ্রহণে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পর্যুদস্ত করা যেমন সহজ হয় তেমনি জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় এবং সৌভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়। প্রবল প্রতিরোধ ও প্রতিঘাতের মুখে আধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পরাজয় বরণ করতে বাধ্য হয়। দেশব্যাপী বিস্তৃত এই জনযুদ্ধে সামরিক-আধা সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি সর্বস্তরের জনতা অসংখ্য গেরিলা ও সম্মুখযুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল। পেশা, বয়স, শিক্ষা, আর্থিক অবস্থান নির্বিশেষে এ যুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যোগ দিয়েছিল এ দেশের আপামর জনগণ। নিরবিচ্ছিন্নভাবে সংঘটিত এই খণ্ডযুদ্ধগুলোর ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের নভেম্বর নাগাদ পাকিস্তানি বাহিনী জনবিচ্ছিন্ন ও কোণঠাসা হয়ে পড়ে। ফলে ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ সাল থেকে মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর যৌথ অভিযানে মাত্র ১৩ দিনে হানাদার বাহিনী সম্পূর্ণরূপে পরাস্ত হয়। বস্তুত ডিসেম্বরের ৩ তারিখের পূর্ব পর্যন্ত দেশজুড়ে সংঘটিত খণ্ডযুদ্ধগুলোই আমাদের জয়লাভের মূলভিত্তি। এই সকল যুদ্ধের বীরত্বগাথা এবং প্রতিটি উপাদান আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ। এ প্রেক্ষিতে দেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের অপরিসীম ত্যাগ ও শৌর্যবীর্যের গৌরবময় পরাকাষ্ঠা স্বকীয় উপাখ্যান হিসেবে বিবেচনার দাবি রাখে।

কিছুটা মতান্তরসহ বাংলাদেশে প্রায় ৪৮টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর পরিচয় পাওয়া যায়। তাদের প্রায় সকল গোষ্ঠীই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল মর্মে তথ্য রয়েছে। এসবের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম, বিশেষ করে বান্দরবানের বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব ইউ কে চিং বীরবিক্রমের শৌর্যবীর্যের কথা সর্বমহলে সুবিদিত। এছাড়া বান্দরবানের বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব মংশৈহ্লা মারমা, জনাব লিয়ামপুম বম, জনাব মংসিং নু মারমা, জনাব মংশৈ প্রু মারমা, জনাব ধুংচাই মারমার বীরত্বের কথা বিভিন্ন প্রকাশনায় উল্লেখ আছে। ইতিহাসের অলিখিত অনেক ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বীর মুক্তিযোদ্ধার আত্মদানের কথা এখনো লোকমুখে শোনা যায়। বক্ষ্যমাণ নিবন্ধে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা ও অঞ্চলের বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সদস্যদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করব।

দিনাজপুর জেলার ওরাঁও ও সাঁওতালদের প্রায় ১,০০০ জনের একটি চৌকস দল সম্মুখ রণাঙ্গনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল বলে জানা যায়। বৃহত্তর উত্তরবঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বীর মুক্তিযোদ্ধাগণের মাঝে বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা সংগঠন সাগারাম মাঝি, শহিদ ফাদার মারান্ডি, সুরেশচন্দ্র পাহান, বিশ্বনাথ মাঝি, বুদু লাকড়া, মনাইচন্দ্র খালকো এবং দিনাজপুরের কশবা মিশন স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্রী জসপিন ঢপ্প প্রমুখের বীরত্বগাথা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে চিরদিন ভাস্বর হয়ে থাকবে।

গারো, হাজং, কোচ জনগোষ্ঠী থেকে প্রায় ১,৫০০ মুক্তিযোদ্ধা অংশগ্রহণ করেছিলেন টাঙ্গাইল, শেরপুর ও নেত্রকোনা এলাকায়। বিষ্ণুপ্রিয়া, মণিপুরী সম্প্রদায়ের প্রায় অর্ধশত সাহসী যুবা-পুরুষ যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে গিরিশ সিংহ, ভুবন সিংহসহ অনেকেই দেশের জন্য তাঁদের মূল্যবান জীবন উত্সর্গ করেছেন। বৃহত্তর সিলেটের প্রায় ৮৩টি চা বাগান এলাকার সংশ্লিষ্ট চা-শ্রমিক জনগোষ্ঠীর অন্তত ৬০২ জন শহিদ, ৪৩ জন আহত, ৮৩ জন নির্যাতিত এবং আরো অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জীবন উত্সর্গকারী মহান চা শ্রমিকদের মধ্যে উপেন্দ্র ভৌমিক, অজয় বাউড়ি, নিবারণ উরাং, রেবতী মাহালী, শ্রভ্রতাঁতী, সালগী খাড়িয়া, কুলচন্দ্র তাঁতী, পবন কুমার তাঁতী, অনীল ছত্রী, উপেন্দ্র বাড়াহক, কুনকুনিয়া রুদ্রপাল, কাঁকন বিবি প্রমুখ অন্যতম।

১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ রংপুর সেনানিবাস ঘেরাও কর্মসূচিতে অগণিত সাঁওতাল অংশগ্রহণ করেছিল। তীর ধনুক আর বল্লম নিয়ে সাঁওতাল নারী-পুরুষ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেন। এ যুদ্ধে দুই শতাধিক নারী-পুরুষ সাঁওতাল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।

শহিদ পরিমল দ্রং ১৯৭১-এর জুন মাসে ‘নকলা’ সেতু ধ্বংস করে সরে আসার সময় রাজাকারদের হাতে ধৃত হন। পরবর্তী সময়ে অকথ্য নির্যাতন করে এ বীর মুক্তিযোদ্ধাকে ফুলপুরে কংস নদীর পাড়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। সিরাজগঞ্জের তাড়াশ থানার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষেরা অপরাপর বাঙালি জনগোষ্ঠীর মতো পৈশাচিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। পৈতৃক ভিটা-বাড়ি থেকে তাদের সবংশে উচ্ছেদ করা হয়েছিল, জন্মভূমি থেকে তাঁরা বিতাড়িত হয়েছিলেন। এ অঞ্চলের বীর মুক্তিযোদ্ধা নির্মল কুমার সরকার, সুরেন্দ্রনাথ সরকার, বরিষা মাহাতো প্রমুখ মুক্তিযোদ্ধাগণ অসীম সাহসিকতার সঙ্গে দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। গারো সম্প্রদায়ের মধ্যে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করা মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে কমান্ডার অরবিন্দ সাংমা, কোম্পানি কমান্ডার দীপক সাংমো, প্লাটুন কমান্ডার যতীন্দ্র সাংমো, সেকশন কমান্ডার ভদ্র মারাক, থিওফিল হাজং, অনাথ নকরেক, নারী মুক্তিযোদ্ধা ভেরোনিকা সিমসাং প্রমুখের নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।

ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মহান এ মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই শত্রুর হাতে প্রত্যক্ষ সমরে জীবন দিয়েছেন। শারীরিক পঙ্গুত্ব নিয়ে এবং সহায়-সম্পদ হারিয়ে বেঁচে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের কেউ কেউ মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বর্তমান সরকার এসব মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক পরিচয় নির্ণয় করে তাঁদেরকে পুনর্বাসন এবং মাসিক ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন।

মহান মুক্তিযুদ্ধের একদিকে যেমন রয়েছে আমাদের শৌর্য-বীর্য ও বিজয়ের অহংকার তেমনি অন্যদিকে রয়েছে চরম ত্যাগ ও রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে এদেশের সর্বস্তরের মানুষ স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্য অতন্দ্র লড়াইয়ে শামিল হয়েছিলেন। অসীম সাহসিকতা, শৌর্য এবং অভূতপূর্ব দেশপ্রেম তাঁদেরকে ভয়হীনচিত্তে আধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত নৃশংস পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মুখোমুখি হওয়ার প্রেরণা জুগিয়েছিল। স্বাধীনতার এ সংগ্রামে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী বাঙালির পাশাপাশি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জনগণ সেদিন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অস্ত্র তুলে নিয়েছিল হাতে। তাদের বীরত্বপূর্ণ এ সংগ্রাম ও ত্যাগ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

 

কৃতজ্ঞতা :

১. লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে—রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম, অনন্যা, বাংলাবাজার, ঢাকা।

২. মুক্তিযুদ্ধে সামরিক অভিযান, ৩য়-৭ম খণ্ড, প্রকাশক- বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, সেনাসদর, শিক্ষা পরিদপ্তর-এর পক্ষে এশিয়া পাবলিকেশন্স, ঢাকা, বাংলাদেশ।

৩. মুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক ইতিহাস, সম্পাদক—আবু মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন, সাহিত্য প্রকাশ, পুরানা পল্টন, ঢাকা।

৪. প্রিয় জন্মভূমি, মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস ২০১৬ উপলক্ষে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ কর্তৃক প্রকাশিত স্মরণিকা।

 

লেখক : কথাসাহিত্যিক