গুরু কাপুরুষ হলে, শিষ্য কখনো বীরপুরুষ হতে পারে না

আপডেট : ২৫ মার্চ ২০১৯, ১৯:৩৫

মুক্তিযুদ্ধ, গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধ নিয়ে গবেষণা করতে হলে যেমন আবেগ থাকতে হয় তেমনি মনে সাহসও রাখতে হয়। একটি বিষয় আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি আর সেটি হলো—গুরু কাপুরুষ হলে তাঁর শিষ্য কখনো বীরপুরুষ হতে পারে না। এই কথাটি শুনে হয়তো অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে। প্রশ্ন জাগাটাই স্বাভাবিক। বর্তমান সময়ে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাটা আসলে গুরুকেন্দ্রিক নয়, পরীক্ষাকেন্দ্রিক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গত তিন থেকে চার দশকে যাঁরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছেন তাঁদের অনেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাককে গুরু হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আহমদ ছফার ‘যদ্যপি আমার গুরু’ বইটি পড়ে আব্দুর রাজ্জাক সম্পর্কে জেনেছি। সাম্প্রতিক সময়ে অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের সুবর্ণ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত স্মৃতিরেখা বইটিতে অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের মানবিক গুণাবলী সম্পর্কে অনেক নতুন তথ্য পেয়েছি। এবং তখন অনুধাবন করতে পেরেছি কেন বুদ্ধিজীবীমহলের অনেকে অধ্যাপক রাজ্জাককে গুরু মানেন।

এই দীর্ঘ ভূমিকার পেছনে একটি উদ্দেশ্য আছে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমার গবেষণার হাতেখড়ি অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের মাধ্যমে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে স্নাতক এবং প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর পরবর্তী কর্মপরিকল্পনা নিয়ে কিছুটা চিন্তায় পড়ে যাই। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণের জন্য গবেষণায় মনোনিবেশ করার চেষ্টা করি। এই সময় বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি প্রকাশিত ‘ছোটদের বাংলাপিডিয়া’ এবং ‘বাংলাপিডিয়া’য় গবেষণা সহযোগী হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়ে যাই। এই কাজের পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে এমফিল কোর্সে ভর্তি হই। অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের তত্ত্বাবধানে ‘যুদ্ধাপরাধ বিচার আন্দোলন (১৯৭১-২০১২)’ এই শিরোণামে বিচার আন্দোলন নিয়ে গবেষণা শুরু করি। একই সময়ে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত ‘বঙ্গবন্ধু কোষ’ গ্রন্থের সহকারী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। এর পাশাপাশি ‘মুক্তিযুদ্ধ কোষ’ (১২খণ্ড)-এর সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণার সূত্রপাত।

এমফিল গবেষণার কাজে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে বেড়িয়েছি। তখন আন্দোলনের সাথে জড়িত নেতৃস্থানীয় অনেকের সাক্ষাত্কার গ্রহণের পাশাপাশি তাদের দুঃখ-দুর্দশার কথা শুনেছি। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসররা নিরীহ বাঙালির ওপর কী নির্মম নির্যাতন চালিয়েছিল—প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যতে তা ফুটে উঠেছে। তখন এই কাজের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধির পাশাপাশি তা দ্রুত শেষ করার তাগিদ অনুভব করেছি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে ১৯৭২ সাল থেকে চলামান আন্দোলন ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর থেমে যায়। তখন সমাজ ও রাষ্ট্রে যুদ্ধাপরাধীরা পুনর্বাসিত হতে থাকে। পরবর্তীকালে শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমকে জামায়াতের আমীর নির্বাচিত করার প্রতিবাদে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। নির্মূল কমিটি গোলাম আযমের প্রতীকী বিচার করে সরকারকে ফাঁসির রায় কার্যকর করার আহ্বান জানায়। সরকার নির্মূল কমিটির ২৪ জন নেতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা দেয়। মামলা মাথায় নিয়ে শহীদ জননীর মৃত্যুর সাথে সাথে আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে।

মাঠ পর্যায়ে গবেষণার তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের দুষ্কর্মের কথা জানতে পারি। কারণ যাদের বিচারের দাবি করা হচ্ছিল তাদের অধিকাংশ তখন সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত। তাই বিচার আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত সংবাদপত্রে কুত্সা রটনাসহ ভয়ভীতি প্রদর্শন অব্যাহত থাকে। এই ভয়ভীতি উপেক্ষা করে কিছু মানুষ তাদের দাবির প্রতি অনড় থেকে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিলেন। গবেষণা কাজে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের (বিশেষ করে রাজশাহী, খুলনা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ) মানুষের সাথে দেখা করে অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করতে হয়েছে। তাদের মধ্যে শহিদ পরিবার, মুক্তিযোদ্ধার পরিবার ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য গঠিত আদালতে সাক্ষ্যদানকারীও ছিলেন। অনেকে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের বীভত্সতার কথা বর্ণনা করার সময় ফিসফিস করে কথা বলেন। কারণ তাদের মনে তখনো যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি সেই ভয় কাজ করে।

ঢাকার পর রাজশাহীতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সবচেয়ে বড় আন্দোলন হয়। এ প্রসঙ্গে একজনের নাম না করলেই নয়, তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক আবু বকর। আন্দোলন পরিচালনার জন্য যিনি জমি ও স্বর্ণালঙ্কার বন্ধক দিয়ে টাকা জোগাড় করেছিলেন। নিজে গান লিখে তিনি বিভিন্ন সমাবেশে তা পরিবেশন করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের প্রতি তাঁর অবিচল আস্থা ও ভালোবাসা আমাকে মুগ্ধ করেছে।

২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা বলে তরুণ প্রজন্মের নিরঙ্কুশ সমর্থনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু কন্যার নেতৃত্বে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসে। সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত গঠন করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম শুরু করে এবং বর্তমানে অনেকগুলো রায় বাস্তবায়িতও হয়েছে। বিচার আন্দোলন নিয়ে রচিত আমার এমফিল গবেষণা অভিসন্দর্ভটি ২০১৬ সালে বাংলা একাডেমি ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচার আন্দোলন (১৯৭১-২০১৩)’ শিরোনামে প্রকাশ করেছে। এই গ্রন্থটির পরিপূরক হিসেবে খুলনায় মুনতাসীর মামুন প্রতিষ্ঠিত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র থেকে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচার আন্দোলন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভূমিকা’ শীর্ষক অন্য একটি গ্রন্থ ২০১৭ সালে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র থেকে গণহত্যা নিয়ে আমার দুটি গ্রন্থ ‘লালমাটিয়া, জৈনপুর ও খাজাঞ্চি বাড়ি গণহত্যা’ এবং ‘পাঁচগাঁও গণহত্যা’ প্রকাশিত হয়েছে। গত ২২ মার্চ ‘গণহত্যা-বধ্যভূমি ও গণকবর জরিপ :মৌলভীবাজার জেলা’ শীর্ষক অন্য একটি গ্রন্থ গবেষণা কেন্দ্র প্রকাশ করেছে।

মুক্তিযুদ্ধ গবেষণার বিচিত্র অভিজ্ঞতার আলোকে চট্টগ্রামের হালিশহর নাথপাড়ার নীরু বালার কথা উল্লেখ না করলেই নয়, যিনি মারা গেছেন ২০০৮ সালে। ছয় দফার পক্ষে থাকার অপরাধে রাজাকাররা ১৯৭১ সালে তাঁর স্বামী ও পুত্রসহ পরিবারের কয়েকজনকে কেটে ছয় টুকরো করে সেই রক্ত দিয়ে নীরু বালাকে স্নান করিয়েছে। খাটের নিচ থেকে দেখা সে ঘটনা বর্ণনা করেন নীরু বালার বড় মেয়ে। তিনি যখন সে বীভত্স ও নির্মম ঘটনা বর্ণনা করছিলেন তখন চোখের পানি ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে নাথপাড়ার একজন বীরাঙ্গনা তাঁর সাথে ঘটে যাওয়া নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে সমাজের ভয়ে তা প্রকাশ না করার অনুরোধ জানান।

মুক্তিযুদ্ধের সময় মানুষের দুঃখ-দুর্দশার পাশাপাশি তাদের ত্যাগের বর্ণনা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের প্রতি যেমন আমাকে অবিচল রেখেছে তেমনি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি করেছে শ্রদ্ধাশীল। কিছুদিন পূর্বে একজন মুক্তিযোদ্ধা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে আমার কক্ষে দেখা করতে আসেন। তিনি নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দিলে তাঁকে বসতে বলে, কী উপকার করতে পারি তা জানতে চাই। জানতে পারলাম তিনি কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তির সাথে দেখা করতে এসেছিলেন, কিন্তু দেখা করতে পারেননি। তাঁর চোখে সমস্যা; অপারেশন করানো প্রয়োজন। তিনি বলেন, সরকার থেকে যে ভাতা পান তা দিয়ে চিকিত্সার ব্যয় সংকুলান সম্ভব না। কোনো এক সহকর্মী থেকে খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছেন আমি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজ করি, তাই সাহায্যের জন্য এসেছেন। তখন নিজের মনে একটি অপরাধবোধ কাজ করে। যে মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগের বিনিময়ে আজ আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক, যাঁদের অবদানে আমি বা আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছি, সেই মুক্তিযোদ্ধা সামান্য কিছু অর্থের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন? সত্যিই বিষয়টি আমার ভিতরে প্রচণ্ড নাড়া দিয়েছে। উনাকে নিয়ে আমি সে শিক্ষাবর্ষের ক্লাসে যাই এবং পরিচয় করিয়ে দেই। সাথে এও বলি যে, তোমরা একজন মুক্তিযোদ্ধাকে সাহায্য করবা, কোনো ব্যক্তিকে না। যা-ই হোক, ছাত্ররা নিজেদের সাধ্যমতো সাহায্য করেছে। ক্লাস রুম থেকে বেরিয়ে যাবার সময় একজন ছাত্র পেছনের সারি থেকে দৌড়ে এসে উনাকে পা ধরে সালাম করে বুকে জড়িয়ে ধরে। সেদিন আমি চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। কারণ জীবনে প্রথমবার যখন একজন মুক্তিযোদ্ধাকে দেখতে গিয়েছিলাম, সেদিন আমিও উনাকে পা ধরে প্রণাম করেছিলাম। একজন মুক্তিযোদ্ধার প্রতি নিজের ছাত্রদের এই শ্রদ্ধাপ্রদর্শন আমাকে যেমন আবেগাপ্লুত করেছে, তেমনি করেছে গর্বিত।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালনের বিষয়, প্রকাশের নয়। যদিও বর্তমানে লালনের চেয়ে প্রকাশের আধিক্য দেখা যায়। যাঁরা প্রতিনিয়ত মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের কথা বলেন তাঁদের অনেকে সামান্য অর্থ দিয়ে সে মুক্তিযোদ্ধাকে সাহায্য করতে রাজি হননি। তখন মনে হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের রাজনীতি করে মুক্তিযোদ্ধাকে সাহায্য করতে আমাদের এত কষ্ট হয় কেন? মনে প্রশ্ন জাগে, তাহলে সত্যিই কি আমরা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ধারণ করতে পেরেছি? নাকি যা করছি তা শুধুমাত্র লোক দেখানো গ্রন্থ রচনার জন্য?

নির্মোহ থেকে সত্য উদ্ঘাটনই একজন গবেষকের মুখ্য কাজ। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো হামলা ও মামলা। সাম্প্রতিক সময়ে সন্ত্রাসীদের আক্রমণে অনেকে যেমন প্রাণ হারিয়েছেন, তেমনি কেউ কেউ মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখালেখি বন্ধ করে দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লিখতে হলে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীদের কথাও লিখতে হয়। কিন্তু যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল তারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সমাজ ও রাষ্ট্রে এতটা ক্ষমতাশালী হয়েছে যে, তাদের মুক্তিযুদ্ধকালীন অপকর্মের কথা তুলে ধরতে গেলে আক্রমণের শিকার হতে হয়। অনেকে আবার মামলার ভয় দেখায়। একটা ঘটনা উল্লেখ না করলেই নয়। গণহত্যা নিয়ে প্রথম গ্রন্থ রচনার সময় সেরকম একটি অভিজ্ঞার সম্মুখীন হতে হয়েছে। আমার গ্রন্থে একজন হিন্দু ব্যক্তির নাম আসে, যিনি ১৯৭১ সালে রাজাকারদের হিসাবপত্র লেখার কাজে বাধ্য হয়ে সাহায্য করেছিলেন। গ্রন্থটি প্রকাশের পর একজন ফোনে লেখক ও প্রকাশককে মামলার ভয় দেখান। যদিও স্থানীয়দের সাক্ষাত্কারের ভিত্তিতে এই গবেষণাকর্ম পরিচালিত হয়েছিল এবং রেকর্ডও সংরক্ষিত আছে। তাই হামলা ও মামলার ভয়ে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণা কাজ বন্ধ হবে না।

সারাদেশে ছড়িয়ে আছে হাজার হাজার গণহত্যা, বধ্যভূমি ও গণকবরের স্থান। কিন্তু সে স্থানগুলো এখনো সঠিকভাবে চিহ্নিত করা হয়নি। গণহত্যা, বধ্যভূমি, গণকবর ও নির্যাতন কেন্দ্র সম্পর্কেও অনেকের স্পষ্ট ধারণা নেই। অনেক সময় এ নিয়ে বিভ্রান্তির অবতারণা হয়। এই বিভ্রান্তির অবসানের জন্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র ৬৪ জেলা জরিপের প্রকল্প গ্রহণ করেছে। আমার মৌলভীবাজার জেলার জরিপ গ্রন্থটিতে এই বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। পাকিস্তানি হানাদারদের ক্যাম্পগুলো নির্যাতন কেন্দ্র, বধ্যভূমি ও গণকবর হিসেবেও ব্যবহার করা হয়েছে।

নির্যাতন কেন্দ্রগুলোতে আটক নারীদের ওপর প্রতিদিন নির্মম নির্যাতন হয়েছে। কোনো নারীকে গণধর্ষণ করা হয়েছে একাধিকবার। একজনকে একবার ধর্ষণ করাকে যেমন একবার ধর্ষণ হিসেবে উল্লেখ করতে হবে, তেমনি দশবার ধর্ষণ করলে সেই সংখ্যা হবে দশ। কারণ ধর্ষিতাকে দশবার শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে। সে হিসেবে ধর্ষিতা নারীর সংখ্যা অনেক বেড়ে যাবে এবং তা বাস্তবসম্মত। কিন্তু ধর্ষিতারা যেহেতু সমাজে অবহেলিত তাই সরকারিভাবে এর সংখ্যা কম দেখানো হয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে গবেষণা করতে যেয়ে আমরা দেখেছি বাস্তবতা ভিন্ন। একই বিষয় বধ্যভূমি ও গণকবরের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

বর্তমানে তরুণ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে জানতে ও কাজ করতে আগ্রহী হচ্ছেন। কিন্তু আমাদের প্রজন্ম একটি বিকৃত ইতিহাস পড়ে বেড়ে উঠেছে। সেসময়ে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজ করা ছিল কঠিন। জানতে দেয়া হয়নি সঠিক ইতিহাস। তারপরও মুনতাসীর মামুন ও শাহরিয়ার কবিরসহ কয়েকজন অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য নিরলস আন্দোলন ও সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছিলেন।

আমার গুরু মুনতাসীর মামুন—যাঁর হাত ধরে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণা শুরু। তিনি জীবনে অনেক প্রতিকূলতা অতিক্রম করে বর্তমান অবস্থায় পৌঁছেছেন। তাঁকে যেমন জেল খাটতে হয়েছে তেমনি অনেক মামলাও লড়তে হয়েছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখালেখি থেমে থাকেনি। তাঁর ছাত্র হিসেবে সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থেকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চা করে যেতে চাই। আমার ছাত্ররাও যদি এই পথ অনুসরণ করে, তবেই সার্থকতা। আমরা যদি ভয় পেয়ে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাসচর্চা বন্ধ করে দেই তবে পরবর্তী প্রজন্মের নিকট জবাবদিহি করতে হবে। তাই সকল বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিরলস কাজ করে যেতে চাই। সে মহাযজ্ঞে তরুণ প্রজন্মের সহযোদ্ধাদের অংশগ্রহণ মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে সে প্রত্যাশা রইল।

 

লেখক :সহকারী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়