মহামতি ফকির লালন শাহ তার দর্শনে জাত-পাত ও ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে মানুষগুরুর কথা বলেছেন। সোনার মানুষ হতে হলে মানুষকে ভজতে হবে। সেকথা তিনি তার গানে গানে বলেছেন। সে কারণে আমরা ছেঁউড়িয়াতে আসি আত্মশুদ্ধিলাভের আশায়। সাধন-ভজনের মধ্য দিয়ে সকল পাপ ধুয়ে-মুছে পবিত্র হতে। একতারা হাতে ছেঁউড়িয়ায় এসব কথা বলছিলেন লালন অনুসারী মোতালেব সাধু।
লালন শাহের ১২৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে ছেঁউড়িয়ায় আগত সাধুরা সাঁইজির ধামে ধ্যানে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। গতবারের তুলনায় এবার খেলাফতপ্রাপ্ত সাধু-গুরুদের আখড়াবাড়িতে বেশি আগমন ঘটেছে। সারারাত নির্ঘুম সাধু-ভক্তরা সাধুসঙ্গ আর মহাগুরু সাঁইজির স্মরণে ধ্যান করছেন। সাধু ভক্ত-অনুসারীসহ সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে মহামিলন মেলায় পরিণত হয়েছে পুরো ছেঁউড়িয়া আখড়াবাড়ি। তিন দিনব্যাপী লালন স্মরণোত্সবের দ্বিতীয় দিনে গতকাল কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়া লালন আখড়াবাড়ির আঙিনা কানায় কানায় ভরে ওঠে। লালনের মাজারের সামনে মরা কালী নদীর তীরে স্থায়ী লালনমঞ্চে সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা। এতে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক জহির রায়হান। বক্তব্য রাখেন পুলিশ সুপার প্রলয় চিসিম, কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. সরওয়ার মুর্শেদ, কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের প্রশাসক জাহিদ হোসেন জাফরসহ অন্যরা। রাতভর চলছে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের গুণী শিল্পীদের পরিবেশনায় লালন সঙ্গীত। গান পরিবেশন করেন ওস্তাদ শফি মণ্ডল, কাঙালিনী সুফিয়া, টুনটুন বাউল, ফরিদ বাউল, সমির বাউল, বিজয়সহ অন্যরা।
আখড়াবাড়িতে আসা রঞ্জিত ফকির বলেন, কোন মায়াজালের মধ্যে আমরা পড়ে আছি। মানুষে মানুষে হানাহানি, ধর্মে ধর্মে হানাহানি, অর্থলিপ্সা- এইসব নিয়ে আমরা মেতে আছি। অথচ গুরুভক্তির মধ্যদিয়ে আমরা শান্তির মানবসমাজ গড়ে তুলতে পারি। আর এজন্যই সাঁইজির আদর্শের পথে চলতে হবে, সাঁইজিকে জানতে হবে।
ফকির আতিকুল বলেন, আজ সমাজে তোষামোদি, বাগাড়ম্বর বেড়ে গেছে। ক্ষুদ্র স্বার্থে মানুষ আজ মানবিক আচরণ হারিয়ে ফেলছে। ভুলে যাচ্ছে সৃষ্টির অনিন্দ্য সুন্দরের কথা। সাঁইজি বলেছেনঃ সিরাজ সাঁই কয়, সোনরে লালন, হোসনে কারো ইনতেজার। সাঁইজির দেখানো পথে হাঁটলে মানুষ কখনো কারো ইনতেজার হবে না। আপন আলোয় মানুষ প্রজ্ঞাবান হবে।
আখড়াবাড়ির মূল আঙিনা ও এর আশপাশ দিয়ে আগত সাধুরা স্ব স্ব ভক্তদের নিয়ে আস্তানায় বসে একদিকে সময়মতো বাল্যসেবা, পূর্ণসেবা, অধিবাস করছেন অপরদিকে কখনো একতারা দোতারা খঞ্জনি হাতে আরার কখনোবা বাদ্যযন্ত্র বাদে গেয়ে চলেছেন সাঁইজির রেখে যাওয়া মানবতাবাদী ও দেহতত্ত্ব গান। গানশেষে ভক্তদের বুঝিয়ে দিচ্ছেন গানের প্রতিটি শব্দের অর্থ। সাধুদের গান ও বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ শুনে সাধারণ দর্শনার্থীরা আস্তানায় আস্তানায় ভিড় জমিয়ে নেচে-গেয়ে আনন্দ করে চলেছেন।
তিনদিনের উৎসবে মরা কালীগঙ্গা নদীর তীরে বসেছে গ্রামীণ মেলা। মেলায় মানুষের উপচেপড়া ভিড়। মেলায় একদিকে স্থান পেয়েছে একতারা, দোতারা, তবলাসহ বাদ্যযন্ত্র। অপরদিকে সাংসারিক ব্যবহারের জিনিসপত্র ও নানা ধরনের গ্রামীণ খাবার।
ইত্তেফাক/আরএ
