ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরছে। দানবের মতো পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী রাতের অন্ধকারে হত্যা করছে নিরীহ মানুষ। তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ওঠে তাদের আর্তনাদ। মাটিতে লুটিয়ে থাকা লাশের স্তূপ। সেসব শহীদের শরীরে ছড়িয়ে দেওয়া হয় গুচ্ছ গুচ্ছ লাল গোলাপের পাপড়ি। এভাবেই ‘লালযাত্রা’র মাধ্যমে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানানো হয় কালরাতের শহীদদের। গতকাল সোমবার গণহত্যা দিবসের বিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বোপার্জিত স্বাধীনতা চত্বরে প্রতি বছরের ন্যায় পরিবেশনাটি উপস্থাপন করে নাট্যদল প্রাচ্যনাট। স্বোপার্জিত স্বাধীনতা চত্বর (টিএসসি) থেকে নাট্যদলটির শিল্পীবৃন্দ হেঁটে যান স্মৃতি চিরন্তন চত্বর পর্যন্ত। এসময় অংশগ্রহণকারীরা সম্মেলক কণ্ঠে গেয়ে শোনান ‘ধনধান্য পুষ্প ভরা’সহ দেশের গান। স্মৃতি চিরন্তন চত্বরে প্রদীপ প্রজ্বালনের মাধ্যমে শেষ হয় লালযাত্রা। লালযাত্রার মূল ভাবনায় ছিলেন রাহুল আনন্দ। এদিন কালরাত স্মরণে রাজধানী জুড়ে ছিল নানা আয়োজন।
কৃত্কলায় স্থাপনাশিল্প ‘কালরাত’: গতকাল সন্ধ্যায় কৃিশল্পীরা উপস্থাপন করেন ‘কালরাত’ শীর্ষক কৃত্কলায় স্থাপনাশিল্প প্রদর্শনী। একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর ভাবনা ও পরিকল্পনায় পরিবেশনাটি উপস্থাপন করেন আবু নাসের রবি, জয়দেব রোয়াজা, অর্পিতা সিংহ লোপা, ফারাহ নাজমুন, জাহিদ হোসেন, সৈয়দ ও মোহাম্মদ জাকির।
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের স্বাধীনতা উত্সব: কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও ধানমণ্ডির রবীন্দ্র সরোবর মঞ্চে চলছে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট আয়োজিত তিন দিনব্যাপী স্বাধীনতা উত্সব। গতকাল দ্বিতীয় দিনে শহীদ মিনারে দলীয় সংগীত পরিবেশন করে বহ্নিশিখা ও সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠী। একক কণ্ঠে মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণাদায়ী স্বদেশের গান শোনান সমর বড়ুয়া, বিমান চন্দ্র বিশ্বাস ও এস এম মেজবাহ। একক আবৃত্তি পরিবেশন করেন ইস্তেকবাল হোসেন, রেজীনা ওয়ালী লীনা ও আহ্কাম উল্লাহ। পথনাটক পরিবেশন করে মৈত্রী থিয়েটার। বৃন্দ নৃত্য পরিবেশন করে ভোরের পাখি নৃত্যকলা কেন্দ্র। একক সংগীত পরিবেশন করেন মহাদেব ঘোষ, মাহবুব রিয়াজ, শিউলি আহমেদ, শান্তা সরকার, রাজিয়া মুন্নি ও আশিকুর রহমান। একক আবৃত্তি পরিবেশন করেন মাসুদুজ্জামান, ঝর্ণা সরকার ও শামসুজ্জোহা। পথনাটক পরিবেশন করে ভিশন থিয়েটার ও নাট্যদ্বীপ।
‘গণহত্যা হাড়ের এ ঘরখানি’: ‘গণহত্যা: হাড়ের এ ঘরখানি’ শীর্ষক আলোচনার আয়োজন করে বাংলা একাডেমি। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন লেখক ও সাংবাদিক জাহীদ রেজা নূর। স্বাগত ভাষণ দেন একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী। আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির সভাপতি মাহফুজা খানম, এমপি আরমা দত্ত এবং প্রজন্ম ৭১-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মো. সাইদুর রহমান। সভাপতিত্ব করেন একাডেমির সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। আনিসুজ্জামান বলেন, পাকিস্তানি বাহিনীর পরিচালিত নৃশংস গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এখনো অর্জন হয়নি। আমরা আশা করি সরকারের প্রয়াস এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের শুভ বিবেক—অবশ্যই এই স্বীকৃতি আদায় করবে।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের আয়োজন: আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন যুগোশ্লাভিয়ার আইসিটিওয়াইয়ের প্রাক্তন প্রসিকিউটর নিকোল ইয়ানিসিভিত্স। একক সংগীত পরিবেশন করেন রোকাইয়া হাসিনা নিলি। সন্ধ্যায় জাদুঘরের শিখা চিরঅম্লান অঙ্গনে কালরাত স্মরণে প্রদীপ প্রজ্বালন করা হয়।
জাদুঘরে গণহত্যা দিবসের আলোচনা: গণহত্যা দিবস উপলক্ষে জাতীয় জাদুঘর কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এতে অংশ নেন অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান, অধ্যাপক ড. মুনতাসীর মামুন এবং বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা লে. কর্নেল (অবঃ) কাজী সাজ্জাদ আলী জহির বীরপ্রতীক। সভাপতিত্ব করেন শিল্পী হাশেম খান। স্বাগত বক্তব্য দেন মহাপরিচালক মো. রিয়াজ আহমেদ।
