নামেমাত্রই এটি একটি বিদ্যালয়! নেই বিদ্যালয়ের সরকারি কোন অনুমোদন, নেই কোন ভবন বা পাঠদানের নিয়মানুগ সুষ্ঠু কাঠামো। তবু স্কুল হচ্ছে দেখিয়ে স্থানীয় অনেক যুবককে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়ার প্রলোভনে তাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয়া হয়েছে লক্ষাধিক টাকা। ঘটনাটি ঘটেছে, সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলার ১০নং খেশরা ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের খেশরা গ্রামে। বিদ্যালয়টি নামও দিয়েছে ‘দক্ষিণ খেশরা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়'।
ঘটনার সূত্রপাত আরো বছর বিশেক আগে, ১৯৯৬ সালে ক্ষমতাবলে স্কুলটি প্রতিষ্ঠায় প্রথম চেষ্ঠা করা হয়। তবে কোন রকম নিয়ম নীতি অনুসরণ না করায় তৎকালীন জেলা প্রশাসক, দায়িত্বরত শিক্ষা কর্মকর্তারা তা বন্ধ করে দেন। ২০১৩ সাল পর্যন্ত তা অব্যাহত ছিল। আবারো মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে এলাকার একটি মহল। বিভিন্ন দপ্তরে বড় পরিমাণের টাকা-পয়সা দিয়ে আবারো অনুমোদনের চেষ্টা করছে সেই চক্রের উত্তরসূরীরা। সরকারি রেজিষ্ট্রেশন আইনে রয়েছে একই গ্রামে পাশাপাশি দুই কিলোমিটারের মধ্যে কোন প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। তবু নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে এলাকার একটি মহল বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার জোর তৎপরতা চালাচ্ছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, যে জায়গা দেখিয়ে স্কুলটি অনুমোদনের চেষ্টা করা হচ্ছে তার চারপাশে সারিসারি সুপারি গাছ, এক পাশে পানের বরজ, আশাপাশে নেই কোন ভবনের অস্তিত্ব। অবিশ্বাস্য এরকম জায়গায় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়! যার না আছে কোন সরকারী অনুমোদন, শিক্ষার্থী কিংবা শিক্ষক। তবু এলাকার প্রভাবশালী একটি চক্র টাকার বিনিময়ে উপজেলা শিক্ষাকর্মকর্তাদের সহায়তায় বিদ্যালয়টির অনুমোদনের চেষ্টা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করলেন এলাকাবাসী। এলাকাবাসী বলতেই পারে না এ জায়গাটি যে কোন ধরণের ঝোপঝাড় বাগানের ভেতরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। অন্যদিকে স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা গেছে, কথিত এই বিদ্যালয়টি নিয়ে দীর্ঘ কয়েক বছর দেনদরবার করছে এলাকার বিএনপি নেতৃত্বাধীন একটি প্রভাবশালী মহল। অনুসন্ধানে জানা গেছে, অনুমোদনহীন ঐ বিদ্যালয়টির ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি খেশরা ইউনিয়নরে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা লিয়াকত হোসেন। ভিত্তিহীন এমন জায়গায় কিভাবে স্কুল রয়েছে সে বিষয়ে জানতে তার সাথে যোগাযোগ করা হলেও যোগাযোগ সম্ভব হয়নি। তালা উপজেলার একই গ্রামে ১৩২নং পশ্চিম খেশরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হতে দক্ষিণ খেশরা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুরত্ব ১.০৩ কিলোমিটার। স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অভিযোগ, কথিত ঐ বিদ্যালয়টির পাশে অবস্থিত দুটি প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে-প্রণোদিতভাবে এমন জোর চেষ্টা চালাচ্ছে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান লিয়াকত হোসেন।
শাহাজাতপুর গ্রামের দক্ষিণ শাহাজাতপুর নব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো: আব্দুস ছালাম মোড়ল বলেন, ঘটনাটি সত্য, উক্ত বিদ্যালয় হতে আমার প্রতিষ্ঠান ১ /৪ কিলোমিটার দুরত্ব এবং লিয়াকত হোসেন অবৈধভাবে স্কুলটির অনুমোদনের জন্য জেলা ও উপজেলা শিক্ষাকর্মকর্তাদের কাছে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে। তবে যে জায়গায় স্কুলটির কথা বলা হচ্ছে, সেটি তো এখনও পানের বরজ আর গাছগাছালিতে ঢাকা। শুধুই দক্ষিণ খেশরা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নয়, খেশরার আরো দুই গ্রামে এভাবেই সরকারী অনুমোদনের জোর তদবীর চলছে। এসব ইউনিয়নে বর্তমান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ২৩টি এবং ইউনিয়নে গ্রামের সংখ্যা ১৯টি। নতুন করে মুকুন্দপুর দক্ষিণ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নামের একটি ও কলাগাছি পূর্বপাড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নামের আরো একটি বিদ্যালয়ের অবৈধ অনুমোদনের চেষ্টা করছে ইউপি চেয়ারম্যানে নেতৃত্বে প্রভাবশালী চক্রটি। বিষয়টি নিয়ে সরাসরি জেলা প্রশাসকের সাথে কথা বলার চেষ্টা করা হয়।
সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক আবুল কাশেম মো. মহিউদ্দীন বলেন, ‘নিয়মবর্হিভূতভাবে দক্ষিণ খেশরা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নামের যে স্কুলটি অনুমোদনের চেষ্টা চালানো হচ্ছে, এ বিষয়ে খবর পেয়েছি। বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে ডিপিও ও ইউএনও’র সাথে কথাও বলেছি। তারা আমাকে নিশ্চিত করেছে।’ তবে নিয়ম না মেনে কোন স্কুলের অনুমোদন দেয়া হবে না বলে সাফ জানান এ জেলা কর্মকর্তা। জেলা প্রশাসক আরো বলেন, ‘বিষয়টি নোট রেখেছি, স্কুলের রেজিষ্ট্রেশন বা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে কোন কিছু করতে হলে তা তো জেলা প্রশাসন হয়েই যেতে হবে মন্ত্রনালয়ে। দরকার হয় নামেমাত্র তদন্ত না করে, সুষ্ঠু ব্যবস্থায় সরেজমিনে গিয়ে নিজেই দেখার কথা জানালেন সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক।
ইত্তেফাক/ এমএআর
