ক্যাপসুল রাইট সিমুলেটর আরোহণের মাধ্যমে আপনি চলে যাবেন প্রাচীন পিরামিডের মধ্যে। যেমন আধুনিক রোলার কোস্টারে চড়ে আনন্দ উল্লাসে মেতে ওঠার অনুভূতি আপনাকে শিহরিত করবে, তেমনি ডিজিটাল ও সায়েন্টিফিক গ্যালারিতে মূর্তভাবেই দেখা দেবে নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ সূত্র। কিভাবে আপেলটি মাধ্যাকর্ষণ শক্তির বলে ভূমিতে আসে তা দেখা যাবে। নিজের ছবিকে যে কোনো প্রাণীর ছবিতে পরিণত করে আনন্দে ভাসতে পারেন সবাই মিলে। একই সঙ্গে মোশন ম্যাজিক মিররে নিজের প্রতিবিম্বের নানারূপ পুলকিত করবে আপনাকে। শুধু কি তাই আরো আছে ‘হররের’ জীবন্ত অস্তিত্ব আপনার পাশে থেকে শিহরিত করবে ফাইভ-ডি মুভি দর্শনের মাধ্যমে। নক্ষত্রশালার গম্বুজে পৃথিবী এবং নীল আকাশকে ফুটিয়ে তোলা হয়। সর্বাধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে নির্মিত এখানকার থিয়েটারে দর্শকরা ত্রিমাত্রিক পরিবেশে মহাশূন্যে হারিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন গ্রহে যাওয়ার অনুভূতি অর্জন করবেন। থিয়েটারের বাঁকানো ছাদে আকাশ এবং গ্রহ নক্ষত্রকে ঘূর্ণয়মান অবস্থায় দেখানো হয় ১২০ ডিগ্রি কোণে একটি বড় পর্দায় প্রতিফলিত করে। মহাকাশের নক্ষত্ররাজির আদ্যপান্তে খোঁজ আপনি পেয়ে যাবেন মহাকাশে ভ্রমণের অনুভূতি নিয়ে। এসব দেখতে দেখতে আপনি চলে যেতে পারেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মস্থান টুঙ্গিপাড়া, ৭ই মার্চের সেই ভাষণ শুনে মনে হবে আপনি সেখানেই ছিলেন।
বিজ্ঞানকে ভর করে এতসব আনন্দ নিজের অস্তিত্বে উপভোগ করার সুযোগ আপনাকে দিচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটারে। রাজধানীর বিজয় সরণীতে বিজ্ঞানের কলাকৌশল নিয়ে ‘বিনোদনের মাধ্যমে শিক্ষা’- স্লোগানকে সামনে রেখে এ নভোথিয়েটার চালু হয়।
কি আছে নভোথিয়েটারে :সমাজ থেকে কুসংস্কার এবং অন্ধবিশ্বাস দূর করে মানুষের মনে বিশেষ করে ছাত্রসমাজের সামনে ইতিবাচক বৈজ্ঞানিক ধ্যান-ধারণা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে একটি অনানুষ্ঠানিক বিজ্ঞান শিক্ষা কেন্দ্র এই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব নভোথিয়েটার। ২০০৪সালে বিজ্ঞান ও তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় প্রায় ২২০৯৬ বর্গমিটার জায়গার উপর প্রতিষ্ঠা করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব নভোথিয়েটার। বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে প্রায় ১২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে এই নভোথিয়েটারটি নির্মিত হয়। গুম্বুজ আকৃতির অংশে নক্ষত্রশালাটির প্রদর্শনী হয়। এরজন্য জাপান, আমেরিকা, কোরিয়া, ফ্রান্স, ইতালি এবং ভারত থেকে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ক্রয় করা হয়। এই নভোথিয়েটারে রয়েছে আকর্ষণীয় সিমুলেটর রাইড, ৫ডি মুভি থিয়েটার, ৫ডি ইণ্টেরিয়েকটিভ এডুটেইনমেণ্ট সিমুলেটর, গ্রহ এবং সৌরজগতের প্রতিরূপ, বিজ্ঞানভিত্তিক ডিজিটাল এক্সিবিটস গ্যালারিতে নতুনভাবে সংযুক্ত হয়েছে ৩০টি প্রদর্শনী। এই প্রদর্শনীতে আছে পদার্থ বিদ্যার সূত্র পর্যবেক্ষণ, টাচ মিতে আলোর প্রতিবিম্বের মাধ্যমে ডায়নোসরের ছবি দেখা, দেখা যাবে নিজের ইচ্ছেমতো প্রাণী তৈরি করে নিজের অনুগত করার খেলা, বিভিন্ন গ্রহে আপনার ওজন কত তা জানা, মনিটরের মাধমে পিয়ানো বাজানো, টর্নেডো সিস্টেম দেখা, ডিজিটাল গেমসহ নানা প্রদর্শনী। ত্রিশটার মধ্যে হেলিকপ্টার হোভারিং, স্পেস পাইলট ট্রেনিং, ডিজিটাল ক্যানভাসসহ বেশ কয়েটি নষ্ট। কারণ জানতে চাইলে নভোথিয়েটারের এক্সিবিটস অপারেটর জানান, এগুলো বেশ ব্যয়বহুল তাই একটা নষ্ট হলে সঙ্গে সঙ্গে ঠিক করা যায় না। তবে কাজের দরপত্র আহবান করা হয়েছে। ৫ডি মুভি থিয়েটার প্রদর্শিত হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উপর ৩০ মিনিটের ডিজিটাল ফিল্ম, ডাউন অব দ্যা স্পেস এজ, মিশন টু ব্ল্যাক হোল, জার্নি টু দ্যা ষ্টার্স, গুডনাইট গলডিলকম, সিমফোনি অব দ্যা ষ্টারি স্কাই ও জার্নি টু দ্যা ষ্টার্স।
বদরুননেসা কলেজের শিক্ষার্থী বুবলি এলন বলেন, প্রতিটি প্রদর্শনীর আলাদা টিকেট না করে দুটি তিনটি মিলে প্যাকেজ হলে ভালো হত। প্লানেট শো’এর জন্য ১০০টাকা, ডিজিটাল এক্সিবিটস এর জন্য ৫০ টাকা, ৫ডি মুভি থিয়েটার এর জন্য ৫০ টাকা এবং সিমুলেটর রাইড এর জন্য ৫০টাকার টিকিট কিনতে হচ্ছে। সাপ্তাহিক ছুটি বুধবার। এছাড়া শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা এবং অন্যদিন সকাল সাড়ে ১০টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত খোলা।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটারে কতটা আধুনিক এমন প্রশ্নের জবাবে পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িত্ ইলেক্্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক সুব্রত কুমার আদিত্য ইত্তেফাককে বলেন, অনেক বিখ্যাত নভোথিয়েটার প্রতিষ্ঠাতা আমেরিকার আর্কিটেড উইলিয়াম গুস এই নভোথিয়েটার প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জড়িত। প্রতিষ্ঠার বেশ কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ায় এটিকে একেবারে আধুনিক বলা যাবে না। পরিচালনা পর্ষদের অপর সদস্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এর তড়িত্ ইলেক্্ট্রনিক কৌশল বিভাগের অধ্যাপক এস এম মাহবুবুর রহমান বলেন, আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটার বেশ ভালো মানের।
নভোথিয়েটারের মহাপরিচালক আবুল বাসার মো: জুলফিকার ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, একটা ছবি বেশি দিন প্রদর্শিত হয় না। প্রতিদিন ৪-৭শত মানুষ এই নভোথিয়েটার দর্শনে আসে। ঈদ উত্সবে দর্শনার্থীর সংখ্যা তিন-চার হাজারে দাঁড়ায় বলে তিনি জানান।
বিজ্ঞান লেখক ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, এটি শিশুদের জন্য অন্য ধরনের একটি আবেদন- যা দেখে শিশুরা আনন্দিত হয়। নভোথিয়েটারে কম খরচে নিয়মিত বিজ্ঞানমনস্ক নতুন নতুন ছবি দেখানর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
ইত্তেফাক/এএন
