পাঁচ-ছয় কেজি ওজনের স্কুলব্যাগ কাঁধে নিয়ে হাঁটছে এগারো বছরের শাহীনূর। তবে এই স্কুল ব্যাগ তার নিজের নয়। যে বাড়িতে শাহীনূর গৃহপরিচারিকার কাজ করে, সেই বাসার নয় বছরের শিশু আয়মানের ব্যাগ ওটি। স্কুলে যেতে ইচ্ছে করে কি না জানতে চাইলে, শাহীনুর বলে, ‘এখন আর পড়তে ইচ্ছে করে না, ঘুমাইতে ইচ্ছে করে।’ কেন শুধু ঘুমাতে ইচ্ছে করে জানতে চাইলে সে বলে, ‘ভোর ৫টায় ঘুম থেকে উঠি। রাতে ঘুমাতে যাই ১২টার পর।’ শ্যামলা বর্ণের উষ্কখুষ্ক মুখের শাহীনূরের চোখ ঘুমে ঢুলুঢুলু করছে। শাহীনূর মোহাম্মদপুর তাজমহল রোডের একটি বাসায় দুই বছর ধরে কাজ করে।
শুধু শিশু শাহীনূর নয়, এ রকম শিশু দাসত্বের শিকার দেশের ৪ লাখ ২১ হাজার শিশু শ্রমিক। এসব শিশু গৃহশ্রমিক ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৮ ঘণ্টাই কাজ করে শুধু তিন বেলা পেট পুরে খাবার ন্যে। অথচ তার পরও তাদের ওপর চলে অমানবিক শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার। শিশুদের নিয়ে কাজ করা ১৬৭টি সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত ‘শিশু অধিকার ফোরাম’-এর করা ‘গোপন শিশু দাসত্ব : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় আরো দেখা যায়, গৃহকর্মে নিয়োজিত ৫৪ শতাংশ শিশু নানাভাবে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়। মানসিক নির্যাতনের শিকার হয় ৫৭ শতাংশ শিশু গৃহকর্মী। আর ৮০ শতাংশ শিশু দৈনিক ১৫ দশমিক ৯ ঘণ্টা কাজ করে। দ্য নিলসেন কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড পরিচালিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, গৃহকর্মে নিয়োজিত ৬৬ শতাংশ শিশু মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়। আর ধর্ষণের শিকার হয় ৭ শতাংশ। শিশু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৮ ঘণ্টা কাজ করানো, এটা অত্যন্ত অমানবিক। এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে এবং যারা কাজে রাখছেন শিশুদের তাদের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে।
গবেষণায় সারাদেশের সবগুলো বিভাগীয় শহরে এই গবেষণা করা হয়েছে। গবেষণায় ১২৩০ জন শিশুর সাক্ষাত্কার নেওয়া হয়েছে। তবে ৪০ ভাগ শিশু সাক্ষাত্কার দিয়েছে তাদের গৃহকর্ত্রীর সামনে। শিশু গৃহকর্মীর মধ্যে ৯৯ ভাগই মেয়েশিশু। তাদের বয়স ৮ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। গড় বয়স ১৩ দশমিক ৫ ভাগ। মেয়েশিশুরা তাদের বিয়ের আগ পর্যন্ত অনেকটা সময় কাজে থাকতে পারে বলে মেয়েশিশুদের গৃহকর্মী হিসেবে চাহিদা বেশি। এদের এক-তৃতীয়াংশের অক্ষরজ্ঞান নেই। দৃই-তৃতীয়াংশের কিছুটা অক্ষরজ্ঞান আছে। ১২ শতাংশ শিশুর পিতা-মাতা নেই। ৯০ ভাগ কিছু বেতন পায়। ৭৫ ভাগ শিশুর বেতন গ্রহণ করেন তাদের অভিভাবকরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, শিশুদের কোনোভাবেই গৃহের শ্রমিক হিসেবে দেখতে চাই না। একজন শিশু স্কুলে যাবে আর তার পেছনে গৃহশ্রমিক শিশুটি ব্যাগ বয়ে নিয়ে স্কুলে এগিয়ে দিয়ে আসবে, এটা আমরা দেখতে চাই না। তিনি বলেন, জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।
শিশু অধিকার ফোরামের চেয়ারম্যান মো. ইমরানুল হক চৌধুরী বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ কাজের মধ্যে গৃহশ্রম অন্তর্ভুক্ত হয়নি। তবে সরকার একটি শিশু দাসত্ব বিষয়ক নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। সেটার আলোকে একটি আইন হলে, গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুদের মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করা সহজ হবে। যে মৌলিক চাহিদার জন্যে শিশু অন্যের বাড়িতে কাজ করে সেই চাহিদাগুলো পূরণ করতে হবে। খাদ্য, স্বাস্থ্য-পুষ্টি এসব পূরণ করতে হবে। শিশুর শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে এবং তার বাবা-মাকে যদি ক্ষুদ্র ঋণের আওতায় আনা যায় তাহলে তারা আর শিশুকে কাজে পাঠাবে না এবং গৃহভৃত্যের জন্য বৃত্তি চালু করা যায়, যা দিয়ে শিশুর খাদ্য পুষ্টির চাহিদা পূরণ হবে।
ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের কো-অর্ডিনেটর সাবিরা সুলতানা নূপুর বলেন, শিশুশ্রম বন্ধে আমরা কাজ করছি, তাদের আমরা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করে দিচ্ছি, যাতে তাদের শিশুদের কাজে না পাঠায়। যাদের বয়স একটু বেশি তাদের আমরা কারিগরি ট্রেনিং করাচ্ছি, যেটা ওরা চায়। সরকার গৃহশ্রমকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে না। তারা একটা নীতিমালা করেছে। শিশু আইনে বলা আছে কোনো শিশুকে নির্যাতন করা যাবে না, শিশুকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করলে এক লাখ টাকা জরিমানা ও পাঁচ বছরের জেলের বিধান রয়েছে।
ইত্তেফাক/এএন
