ইহা কি আইএসের চূড়ান্ত পতন?

আপডেট : ২৬ মার্চ ২০১৯, ২১:১৬

বর্তমানে আক্ষরিক অর্থে ইরাক ও সিরিয়ায় বিশ্বজুড়িয়া বহুল আলোচিত উগ্রপন্থি ও জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট বা আইএস নিয়ন্ত্রিত কোনো অঞ্চল আর অবশিষ্ট নাই। কয়েক দিন আগে পূর্ব সিরিয়ায় তাহাদের সর্বশেষ ঘাঁটি বাঘুজের পতন হইয়াছে। যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত কুর্দি বিদ্রোহী গোষ্ঠী সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (এসডিএফ) আনুষ্ঠানিকভাবে তাহাদের পরাজয় ঘোষণা করে। এই পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলিয়াছেন, ‘১০০ ভাগ পরাজিত হইয়াছে আইএস’। ইহার মাধ্যমে আইএসের পাঁচ বত্সরের কথিত খিলাফতের অবসান হইয়াছে বলিয়া দাবি করা হইতেছে; কিন্তু সত্যি কি আইএসের শতভাগ পরাজয় নিশ্চিত হইয়াছে? যাহারা ভূ-রাজনীতি, সন্ত্রাসবাদ ও গেরিলা যুদ্ধের গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল, তাহারা এই ব্যাপারে যে ভিন্নমত পোষণ করিবেন না—তাহা নিশ্চিত করিয়া বলা যায় না।

যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরাকে আইএসের উত্থান ছিল বিস্ময়কর, তবে তাহা অপরিকল্পিত ছিল না। এই জঙ্গিগোষ্ঠীর উত্থান হয় মূলত ২০০৬ সালে ইরাকে। ২০০৩ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ও তত্কালীন শাসক সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর এক বিশেষ প্রেক্ষাপটে ইরাকের আল কায়েদার শাখার গর্ভে জন্ম নেয় আইএস। আইএসের মতো আল কায়েদা লইয়াও অনেক রহস্যের জট এখনো খুলে নাই। ২০১৩ সালে আল কায়েদার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করিয়া প্রথমে সংস্থাটির নামকরণ হয় ইসলামিক স্টেট ইন ইরাক অ্যান্ড লেভান্ট। ২০১৪ সালে তাহারা প্রথমে ইরাকের ফালুজা ও সিরিয়ার রাকা শহর দখল করিয়া নেয়। ইহার পর একই বত্সর জুন মাসে দখল করিয়া নেয় ইরাকের মসুল ও তিরকিত। এইসময় সংগঠনটির নামকরণ করা হয় শুধুই ইসলামিক স্টেট বা আইএস। তাহাদের শক্তি যখন তুঙ্গে তখন তাহারা ইরাক ও সিরিয়ার ৮৮ হাজার বর্গকিলোমিটার বা এক-তৃতীয়াংশ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করিত। তাহারা একসময় সিরিয়ার বৃহত্তম হোমস তেলক্ষেত্র দখল করিয়া নেয় এবং তেল বিক্রয়, চাঁদাবাজি ও অপহরণ বাণিজ্য ও ডাকাতি করিয়া শত শত কোটি ডলার আয় করে। এক অজানা আকর্ষণে সারা বিশ্ব হইতে হাজার হাজার যোদ্ধা যোগ দেয় আইএসের পক্ষে। পশ্চিমা জিম্মিদের শিরশ্ছেদ ও বিশেষত ইয়াজিদি নারীদের যৌনদাসিতে বাধ্য করা সংক্রান্ত তাহাদের কঠোর নীতি ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। ‘রেডফ্ল্যাগ অপোজ দ্য রেডফ্ল্যাগ’ নীতির মতো তাহাদের দ্বারা সবচাইতে ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে ইসলাম ও মুসলমানদের ভাবমূর্তি।

জানা যায়, আইএস শীর্ষ নেতা বাগদাদি এখনো ইরাকে অবস্থান করিতেছে। অনেকের মতে, আইএস এখনো বিশ্বের জন্য হুমকি। কারণ নাইজেরিয়া, ফিলিপাইন, আফগানিস্তান ও ইয়েমেনসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাহারা ছড়াইয়া পড়িয়াছে। ইরাক ও সিরিয়া অঞ্চলেই রহিয়াছে তাহাদের ১৫ হইতে ২০ হাজার সশস্ত্র সক্রিয় সদস্য। ইহার অনেকগুলিই ‘স্লিপার সেল’ এবং সুযোগ পাইলেই তাহারা আবার পুনর্গঠিত হইতে পারে। এই প্রেক্ষিতে বলা যায়, তাহারা আসলে ভূখণ্ডহীন হইয়াছে; কিন্তু তাহাদের সত্যিকার পতন হয় নাই। তাহারা গেরিলা যুদ্ধের নীতিতে যেকোনো সময় চোরাগোপ্তা হামলা চালাইয়া তাহাদের অস্তিত্ব জানান দিতে পারে। প্রকৃতপক্ষে তাহাদের যাহারা যে কারণে তৈরি করিয়াছে, তাহার কারণ অবশিষ্ট থাকা পর্যন্ত তাহাদের নিশ্চিত পরাজয় হইয়াছে, এমনটি ভাবিবার কোনো অবকাশ নাই।