রাজার হাতি, সড়ক দুর্ঘটনা ও কৌতুক

আপডেট : ২৬ মার্চ ২০১৯, ২১:১৭

চিররঞ্জন সরকার

এক সময় রাজ-রাজড়ারা হাতি পুষত। তাদের ছিল বিশাল হাতিশালা। হাতিরা সাধারণত সেখানেই থাকত। তবে মাঝে মাঝে তাদের চরাতে নিয়ে যাওয়া হতো। তো চরতে যাওয়ার সময় সেই হাতি যেদিক দিয়ে যেত, সেদিকটা লণ্ডভণ্ড করে দিত। আশপাশের গাছপালা, বাড়ি-ঘর শুড় দিয়ে ভেঙে দিত। ছোট-খাট পশুপাখি-কীটপতঙ্গও এই হাতির পায়ের নিচে পিষ্ট হতো। মাহুতও হাতিকে কিছু বলত না। কারণ এটা যে রাজার হাতি এবং সে নিজে এই মহান-হাতির রক্ষণাবেক্ষণকারী, তা বোঝাতে বরং মাহুতকে ভাঙচুরের পক্ষে একটু উস্কানিই দিতে দেখা যেত। ফলে নিরীহ সাধারণ মানুষের মধ্যে রাজার হাতি নিয়ে এক ধরনের ভীতি ছিল।

বাংলাদেশে এখন সেই ‘রাজার হাতির’ স্থান নিয়েছে গণপরিবহন। যাকে খুশি যেখানে খুশি পিষে দেবার অধিকার যেন তারা পেয়ে গেছে। এ ব্যাপারে কিছু বলা যাবে না, করা যাবে না। করতে চাইলেই তাদের শক্তিশালী ইউনিয়ন তেড়ে-ফুঁড়ে আসবে। সবকিছু অচল করে দিয়ে, শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার সব দাবি নস্যাত্ করে দিতে একজোট হয়ে মাঠে নামবে। ‘রাজার হাতি’ রক্ষায় এ এক অভিনব ব্যবস্থা!

বাংলাদেশে সড়কে মৃত্যুর মিছিল নিত্যদিনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। গতবছর নিরাপদ সড়কের দাবিতে ব্যাপক ছাত্র বিক্ষোভ হলেও পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন নেই। গত ২০ মার্চ রাজধানীতে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) ছাত্র আবরার আহমেদ চৌধুরী নিহত হওয়ার ঘটনায় আবারও রাজপথ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। আবার শুরু হয়েছে বিক্ষোভ।

নিরাপদ সড়ক চাই—এই দাবি নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। কিন্তু পরিস্থিতি তাতে বদলাচ্ছে না। আইন মানার ও মানানোর দায় কেউ নিচ্ছে না। ভাবটা এমন যেন কারো দায় নেই। কথায় বলে ‘ঘুমন্ত লোকের ঘুম ভাঙানো সম্ভব, কিন্তু জেগে জেগে ঘুমালে তা কঠিন’। শতচেষ্টায়ও তাকে জাগানো যায় না। আমাদের সড়ক ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের যেন সেই দশা।

গণপরিবহন খাতে যে ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা চলে আসছে, সেটি দূর করতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ন্যূনতম উদ্যোগ এখনও দেখা যাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবহন খাতের বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে কোম্পানিভিত্তিক বাস সার্ভিস চালু এবং লাইসেন্স প্রদানে নজরদারি বাড়ানোর বিকল্প নেই। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে যে কমিটি গঠিত হয়েছে, তার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। যিনি কমিটির প্রধান, তাঁর নেতৃত্বাধীন পরিবহন শ্রমিক সংগঠনই পরিবহন খাতের বিশৃঙ্খলার জন্য অনেকাংশে দায়ী। গত বছরের ২৯ জুলাই বিমানবন্দর সড়কে রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে দেশব্যাপী আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। সড়ক পরিবহন খাতে কীভাবে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হয়, সেটিও তারা সংশ্লিষ্টদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল। সে সময় সরকারের নীতিনির্ধারকদের কথাবার্তায় মনে হয়েছিল, দ্রুতই তারা সড়ক নিরাপদ করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন। কিন্তু গত আট মাসে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। বরং আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করলাম যে, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে যে আইনটি জাতীয় সংসদে পাস করা হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকেরা ধর্মঘট পালন করেছেন।

এদেশে গাড়ির ফিটনেস নেই। চালকের লাইসেন্স নেই। অনেক ক্ষেত্রে রুটপারমিট নেই। তাইত চালকরা এমন বেপরোয়া। তারা আইল্যান্ডে গাড়ি তুলে দিচ্ছে। জেব্রাক্রসিংয়ে মানুষ মেরে ফেলছে। চলন্ত গাড়ি থেকে যাত্রীকে ধাক্কা দিয়ে নামিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু আইন তাদের কেশাগ্রও স্পর্শ করতে পারছে না।

আসলে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু আমাদের দেশের মানুষের জন্য অনিবার্য নিয়তি হয়ে দেখা দিয়েছে। এর কোনো প্রতিবিধান হচ্ছে না। এ নিয়ে ক্ষোভ-শোক-অনুতাপ করে কোনো লাভ হবে বলে মনে হয় না। তার চেয়ে আসুন আমরা বরং চালকদের নিয়ে কয়েকটি প্রচলিত কৌতুক শুনি।

হাইওয়েতে একটি গাড়ি খুব ধীরগতিতে চলছে। এভাবে চললে পিছনের গাড়ির ধাক্কা খেয়ে বিরাট দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। কাজেই হাইওয়ে পুলিশ গাড়িটিকে আটকালো।

পুলিশ: আপনি মাত্র ১৫ কিলোমিটার গতিবেগে গাড়ি চালাচ্ছেন কেন?

চালক: হাইওয়ের শুরুতেই গতিসীমা লেখা ছিল ১৫।

পুলিশ: ওটা গতিসীমা নয়, ওটা হাইওয়ের নম্বর। অর্থাত্ এটা ১৫ নম্বর হাইওয়ে।

চালক: ওহ! তাহলে তো ভুল হয়ে গেছে। আচ্ছা, এখন থেকে আমি স্বাভাবিক গতিতে চালাব।

পুলিশ: কিন্তু এর আগে তো দেখলাম আপনি প্রচণ্ড গতিতে গাড়ি চালাচ্ছিলেন।

চালক: না মানে, একটু আগে ২১০ নম্বর হাইওয়ে পার হয়ে এলাম তো!

মহাসড়কে গাড়ি চালাচ্ছিলেন এক ব্যক্তি। তার গাড়ির গতিসীমা তখন ঘণ্টায় ৬০ কি.মি’র বেশি অতিক্রম করছে। এমন সময় সে লক্ষ্য করলো, পেছন থেকে একটা পুলিশের গাড়ি তাকে ধাওয়া করছে। সে বুঝলো, সে সর্বোচ্চ গতিসীমা অতিক্রম করে ফেলেছে। এখন উপায়? গাড়ি থামালেই একগাদা টাকা জরিমানা গুনতে হবে। মনে মনে সে একটা বুদ্ধি আঁটলো।

গাড়ির গতি না কমিয়ে সে আরও বাড়িয়ে দিল। পুলিশের গাড়িটাও তখন ঝড়ের বেগে ধেয়ে আসছে। হঠাত্ একটা পেট্রোল পাম্পের পাশে দাঁড়িয়ে গেল সে। গাড়ি থেকে নেমে এক ছুটে ঢুকে গেল পেট্রোল পাম্পের বাথরুমে।

পাঁচ মিনিট পর সে বের হয়ে দেখলো, পুলিশ তাকে ঘিরে ফেলেছে। সে পেটে হাত বোলাতে বোলাতে বললো, ‘বুঝতেই পারছেন, বেগটা একটু বেশি পেয়েছিল!’

অনেক সময় গতির কারণেও দুর্ঘটনা ঘটে। তেমনি এক বাসের গতি হঠাত্ করে বাড়িয়ে দিল বাস চালক।

চালকের কাছের আসনে বসা এক যাত্রী বলল: এতো জোরে গাড়ি চালাচ্ছেন কেন?

চালক: গাড়ির ব্রেক ফেইল করেছে ভাই!

যাত্রী: আরে ভাই, তাহলে স্পিড বাড়াচ্ছেন কেন? স্পিড কমান।

চালক: যেভাবেই হোক অ্যাকসিডেন্টের আগেই আমাদের গন্তব্যে পৌঁছাতে হবে।

তবে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য আমাদের ট্রাফিক পুলিশের দুর্নীতিও কম দায়ী নয়। এক বাস ড্রাইভার রাস্তায় নতুন একটি নোটিস দেখে তা পড়ার জন্য বাস থামাল। সঙ্গে সঙ্গে ট্রাফিক এসে জিজ্ঞেস করল:এই ব্যাটা, বাস থামালি কেন? দেখোস না বাস থামান নিষেধ।

ড্রাইভার: নতুন লাগাইসেন, দেহনের জন্যই তো থামাইলাম।

ট্রাফিক: বেয়াদব, মুখে মুখে তর্ক করোস? দে ৫শ’ টেকা দে!

দ্বিতীয় দিন বাস ড্রাইভার বাস না থামিয়ে চলে যাচ্ছিল, তবু ট্রাফিক থামাল।

ড্রাইভার: স্যার, আইজ তো থামাই নাই। আটকাইলেন ক্যান?

ট্রাফিক: থামাস নাই ঠিকই, তয় থামানের চিন্তা নিশ্চয়ই করছোস।

ড্রাইভার: এইহানে যাত্রী একটু বেশি পাওয়া যায়, তাই একবার চিন্তা করছিলাম।

ট্রাফিক: চিন্তা করলি ক্যান, দে ৫শ’ টেকা দে!

তৃতীয় দিন বাস ড্রাইভার বাস না থামিয়ে চলে যাচ্ছিল, ট্রাফিক থামাল।

ড্রাইভার: স্যার, আইজ তো থামাই নাই, থামানের চিন্তাও করি নাই, আইজ আটকাইলেন ক্যান?

ট্রাফিক: শালায় কয় কি! চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই নাকি গাড়ি চালায়। এ জন্যই তো দুর্ঘটনা ঘটে। দে ৫শ’ টেকা দে!

ড্রাইভার কুদ্দুস অ্যাকসিডেন্ট করে রাস্তার পাশের এক ড্রেনে বাস নামিয়ে দেয়। পুলিশ কিছুক্ষণ পর ঘটনাস্থলে আসে। তো, পুলিশ কুদ্দুসকে জিজ্ঞেস করে, ব্যাটা আহাম্মক! ফাঁকা রাস্তায় এরকম অ্যাকসিডেন্ট কি করে করলি?

কুদ্দুস বললো, স্যার, আমি ভালোভাবেই বাস চালাচ্ছিলাম। হঠাত্ করে এক পাগল রাস্তার মাঝে এসে নাচতে শুরু করল! আমি ভাবলাম যদি পাগলটাকে বাঁচাতে চাই, তাহলে বাসের সবাইকে মরতে হবে। আর যদি বাসের সবাইকে বাঁচাতে চাই, তাহলে পাগলটাকে মরতে হবে। যেহেতু একজনের চেয়ে সবাইকে বাঁচানো ভালো, তাই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম পাগলটাকেই মারব!

পুলিশ: তাহলে বাস এই ড্রেনে নামালি কেন?

কুদ্দুস: স্যার, আমি যখন পাগলটাকে মারতে গেলাম তখন পাগলটা দৌড়ে রাস্তার পাশের এই ড্রেনে নেমে গেল। তাই আমিও বাস নিয়ে ওর পিছু নিয়েছিলাম!

একবার এক ড্রাইভার ব্যাপক নেশা করে ট্রাক চালাতে গিয়ে ট্রাকসহ নদীতে পড়ে গেল। ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটল। ট্রাকের হেলপারসহ আরও যে কয়জন ছিল সবাই মারা গেল। সৌভাগ্যক্রমে ড্রাইভার বেঁচে যায়। ড্রাইভারকে থানায় নেওয়া হলো। তার সেবা-শুশ্রূষার পর ড্রাইভার কিছুটা স্বাভাবিক হলে থানার দারোগা তাকে জিজ্ঞেস করল, ট্রাকটা কীভাবে নদীতে পড়ল?

ড্রাইভার আস্তে আস্তে স্মৃতি হাতড়ে বলতে থাকল, প্রথমে দেখলাম আমার দিকে ধেয়ে আসছে একটা মোটরসাইকেল, আমি সেটাকে সাইড দিলাম। এরপর দেখি একটা প্রাইভেট কার আসছে, আমি সাইড দিলাম। এরপর অনেকগুলো বাসকেও আমি সাইড দিলাম। এরপর দেখলাম একটা ব্রিজ আসছে! ব্রিজটাকে সাইড দিতে গিয়েই আমি নদীতে পড়ে গেলাম! আমার আর কিছু মনে নেই!

n লেখক : রম্যরচয়িতা