দেশপ্রেম ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ এগিয়ে নিতে হবে :প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ২৬ মার্চ ২০১৯, ২২:৩৯

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশপ্রেম ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে শিশু-কিশোরদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘আজকের শিশু আগামী দিনের কর্ণধার। আজকের শিশুদের মধ্যেই কেউ প্রধানমন্ত্রী হবে, মন্ত্রী হবে, বড় বড় চাকরি করবে, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশকে ভালোবেসে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ গড়ে তুলবে।’ গতকাল মঙ্গলবার মহান স্বাধীনতা এবং জাতীয় দিবস উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং ঢাকা জেলা প্রশাসন আয়োজিত শিশু-কিশোর সমাবেশে দেশে এবং প্রবাসে অবস্থানকারী সকল শিশুর প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে তোমাদেরকেই। তোমরাই গড়ে তুলবে আগামী দিনের উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।’ তিনি আরো বলেন, এই বাংলাদেশ হবে দক্ষিণ এশিয়ার উন্নত শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ একটি দেশ। আমরাই জাতির পিতার এই স্বপ্ন পূরণ করবো। তার সরকার একটি সুন্দর ভবিষ্যত্ গড়ার চেষ্টা করছে, যেখানে শিশুরা সুন্দর, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ জীবন যাপন করতে পারবে। শিশুদের দোয়া ও আশীর্বাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তোমরা বাবা-মা’র কথা শুনবে, শিক্ষকদের কথা শুনবে, নিয়ম শৃঙ্খলা মেনে চলবে, সুন্দরভাবে জীবন-যাপন করবে— সেটাই আমরা কামনা করি।’  প্রধানমন্ত্রী সন্ত্রাস, মাদক এবং জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে তার সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি পুনরুল্লেখ করে বলেন, ‘সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ এবং মাদকের হাত থেকে আমরা দেশকে মুক্ত করতে চাই।’ 

স্বাধীনতা দিবসের তাত্পর্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সোনামনিরা আজকে আমাদের স্বাধীনতা দিবস। দীর্ঘ ২৪ বছরের সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মধ্যদিয়ে আমরা অর্জন করেছি আমাদের স্বাধীনতা। স্বাধীন দেশে প্রতিটি মানুষ সুন্দরভাবে বাঁচবে এবং একটি উন্নত জীবন পাবে এটাই ছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন। আজকে আমরা একটি লাল-সবুজ পতাকা পেয়েছি। একটা দেশ পেয়েছি, একটা জাতি হিসেবে আত্মমর্যাদা পেয়েছি। এই মর্যাদাকে আরো উন্নত করা—সেটাই ছিল জাতির পিতার লক্ষ্য। শিশুতোষ বয়স থেকে জনগণের কল্যাণে জাতির পিতা ছিলেন নিবেদিত প্রাণ উল্লেখ করে মাতৃভাষা বাংলায় কথা বলার অধিকার প্রতিষ্ঠায় জাতির পিতার সংগ্রামী ভূমিকা এ সময় তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, মাতৃভাষা বাংলায় কথা বলার অধিকার আদায়ে সেই ১৯৪৮ সাল থেকে তিনি যে যাত্রা শুরু করেছিলেন সেটাই ’৭১ সালে তাঁর নেতৃত্বে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করার মধ্যদিয়ে একটি সফল পরিণতি লাভ করে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার পাশাপাশি মানুষকে অর্থনৈতিক মুক্তি দেয়ার লক্ষ্যে সেই সময় থেকেই জাতির পিতার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের চুম্বক অংশ তুলে ধরেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতির পিতার দেশ স্বাধীনের লক্ষ্য ছিল এদেশের প্রতিটি শিশু শিক্ষা গ্রহণ করবে, প্রতিটি নাগরিক সুশিক্ষিত হবে। দেশ ক্ষুধা ও দারিদ্র্য মুক্ত, উন্নত-সমৃদ্ধশালী হিসেবে গড়ে উঠবে এবং সেই লক্ষ্য নিয়েই তিনি যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ গড়ে তোলার কাজ শুরু করেন।’ শেখ হাসিনা আরো বলেন, যখনই জাতির পিতা যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ গড়ে তুলে দেশকে উন্নয়নের পথে ধাবিত করা শুরু করেন। দুর্ভাগ্যক্রমে তখনই ’৭৫ এর ১৫ আগস্টের কালরাতে তাঁকে সপরিবারে নির্মমভবে হত্যা করা হয়।

তিনি বলেন, এরপর দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ আবার যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসে ঠিক তখন থেকেই পুনরায় উন্নয়নের অভিযাত্রা শুরু হয়। ’৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত সময়কে দেশের জন্য এক স্বর্ণযুগ আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, ‘আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছিলাম, বিদ্যুত্ উত্পাদন এবং সাক্ষরতার হার বাড়িয়েছিলাম।’ পুনরায় ২০০৮ সালে নির্বাচিত হয়ে এ পর্যন্ত রাষ্ট্র পরিচালনায় দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশকে আজকে আমরা উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উন্নীত করেছি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা ২০২০ সালে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করবো, ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী। আমরা ২০২০ থেকে ২০২১ পর্যন্ত সময়কে মুজিব বর্ষ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছি। আমরা এই সময়টাকে এমনভাবে কাজে লাগাতে চাই যেন বাংলাদেশ ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে ওঠে। বক্তব্যের শেষে এসে কবি সুকান্তের কবিতার পংক্তির সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে শেখ হাসিনা বলেন- যতক্ষণ এদেহে আছে প্রাণ/প্রাণপণে এ পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল/ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি/ নব জাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।

সমাবেশ উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামের গ্যালারিকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু, জাতীয় চার নেতা, মুক্তিযুদ্ধের সাত বীরশ্রেষ্ঠ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি এবং বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দৃশ্যবলী দিয়ে সুসজ্জিত করা হয়।

সকাল ৮টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছলে সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সংগীত পরিবেশিত হয়। প্রধানমন্ত্রী কোমলমতি শিশু-কিশোরদের কুচকাওয়াজ পরিদর্শন এবং সালাম গ্রহণ করেন। কুচকাওয়াজের পর শিশু-কিশোর সমাবেশে এবারের থিম সং ‘নোঙর তোল তোল’ পরিবেশিত হয়। এ সময় একটি দৃষ্টিনন্দন নৌকা স্টেডিয়ামে প্রবেশ করে চারপাশে ঘুরে বেড়ায় এবং এরসঙ্গে গাড়ি বহরের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরা হয়। প্রধানমন্ত্রী সারাদেশের বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিশু-কিশোরদের পরিবেশনায় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং ডিসপ্লে উপভোগ করেন। প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে দেশব্যাপী স্কুল পর্যায়ে অনুষ্ঠিত শুদ্ধ সুরে জাতীয় সঙ্গীত প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করেন। প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক এই তিন ক্যাটাগরিতে বিজয়ী ৯০ জনকে পুরস্কৃত করা হয়।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, ঢাকা জেলা প্রশাসক মো. আবু সালেহ মোহাম্মদ ফেরদৌস খানসহ মন্ত্রিসভার সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, সংসদ সদস্য, পদস্থ সামরিক এবং বেসামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

স্মারক ডাকটিকেট অবমুক্ত এবং ডাক বিভাগের ‘নগদ’ সেবা উদ্বোধন

বাসস জানায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে স্মারক ডাকটিকেট, একটি উদ্বোধনী খাম এবং একটি ডাটা কার্ড আনুষ্ঠানিকভাবে অবমুক্ত করেন। তিনি গতকাল মঙ্গলবার বিকালে গণভবনে ১০ টাকা মূল্যের স্মারক ডাকটিকেট, দশ টাকা মূল্যের উদ্বোধনী খাম এবং পাঁচ টাকা মূল্যের ডাটা কার্ড অবমুক্ত করেন। অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার, মন্ত্রণালয়ের সচিব অশোক কুমার বিশ্বাস, বাংলাদেশ ডাক বিভাগের মহাপরিচালক সুশান্ত কুমার মণ্ডলসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ জনগণের ক্রমবর্ধমান আর্থিক লেনদেনের চাহিদা মেটাতে ডিজিটাল আর্থিক লেনদেনের অংশ হিসেবে বর্তমানে প্রচলিত ‘পোস্টাল ক্যাশ কার্ড’ এবং ‘ইএমটিএস’ সেবার নবরূপায়িত রূপ ‘নগদ’ নামে একটি আর্থিক সেবা চালু করেছে। অনুষ্ঠানে ‘নগদ’ সেবাটিরও উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী ।

ডাক বিভাগের সূত্র মতে, ‘নগদ’ আর্থিক সেবা হচ্ছে বাংলাদেশ ডাক বিভাগের একটি সম্প্রসারিত আর্থিক সেবা। যা বিভিন্ন ডিজিটাল চ্যানেল যেমন অ্যাপ, মোবাইল ফোন, এটিএম, পিওএস টার্মিনাল, এনএফসি-এনাবেল্ড ডিভাইস, চিপ, ইলেকট্রনিক্যাল এনাবেল্ড কার্ড, বায়োমেট্রিক ডিভাইস, ট্যাবলেট সহ অন্য সব ডিজিটাল সিস্টেম এর মাধ্যমে দ্রুততার সাথে আর্থিক লেনদেনে সক্ষম।