রাজনৈতিক সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণে অবৈধ অস্ত্র

আপডেট : ২০ নভেম্বর ২০১৬, ২৩:৩৯

আন্ডার ওয়ার্ল্ডের অপরাধীদের হাতে এই মুহূর্তে খুব বেশি অস্ত্র নেই! অধিকাংশ অস্ত্রই এখন রাজনৈতিক পরিচয়ধারী সন্ত্রাসীদের হাতে। এদের কাছ থেকেই অস্ত্র ভাড়া নিয়ে ‘অপারেশনে’ যাচ্ছে পেশাদার অপরাধী ও সন্ত্রাসীরা। তবে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এক তথ্যে দেখা গেছে, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার আগের তুলনায় কমেছে। রাজধানী ছাড়াও এখন অবৈধ অস্ত্রের সবচেয়ে বেশি চাহিদা খুলনা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে। যদিও চট্টগ্রামের আশপাশের সীমান্ত দিয়েও দেশে অবৈধ অস্ত্র আসছে। তাই চট্টগ্রাম এই তালিকার মধ্যে আসেনি।

 
সাম্প্রতিককালে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে শাহাজাহানপুরের শাহজাদা মিয়ার ভাই ডিস বাবুসহ সোহরাওয়ার্দী, রিপন ওরফে বরিশাইল্যা রিপন, যশোরের ইকবাল, রইসসহ অনেকে। এদের সবার হেফাজত থেকেই অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ভাড়া দেওয়া ও হেফাজতে রাখার অভিযোগও পাওয়া গেছে। এরা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সর্বশেষ গ্রেফতার হওয়া ঝুনুও যশোরের শার্শার একটি ওয়ার্ডের নেতা। পুলিশের তদন্তে দেখা গেছে, তাদের মতো রাজনৈতিক পরিচয়ধারী সন্ত্রাসীদের কাছেই অস্ত্রের মজুদ দিন দিন বাড়ছে। রাজনৈতিক ছত্রছায়া পাওয়ায় তাদের অনেকেই ধরা ছোঁয়ার বাইরেও থাকছে। এর মধ্যে অবশ্য কয়েকজন মাঝে মধ্যে ধরা পড়ছে।
 
এক গোয়েন্দা তথ্যে দেখা গেছে, পাঁচটি সীমান্ত দিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে দেশে অস্ত্র আসছে। এর মধ্যে সাতক্ষীরা, যশোরের বেনাপোল ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ সীমন্ত দিয়ে অস্ত্র আসে বেশি। এছাড়া কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া সীমান্ত দিয়েও অস্ত্র আসে। যদিও সেটার পরিমাণ কম। অস্ত্র ব্যবসায়ীরা এরই মধ্যে গোয়েন্দাদের চোখে ধুলা দিতে অস্ত্রের রুট পরিবর্তন করেছে। আগে বেনাপোল দিয়ে অস্ত্র ঢুকলে মাগুরা, রাজবাড়ি ও মানিকগঞ্জ রুট দিয়ে ঢাকায় আসত। এখন এই অস্ত্র বেনাপোল দিয়ে ঢোকার পর নাভারণ হয়ে পিরোজপুর ও বরিশালের দিকে চলে যাচ্ছে। সেখান থেকে লঞ্চে করে ঢাকায় আসছে। এমন চালানও ধরা পড়েছে পুলিশের হাতে।
 
গত ১৩ নভেম্বর ৭টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রসহ চারজনকে গ্রেফতার করে ডিবি। এর মধ্যে একজন অস্ত্র ব্যবসায়ীও আছে। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে ৭.৬৫ বোরের পিস্তল ৪টা এবং শাটার গান ৩টা। গ্রেফতারকৃত চারজনের মধ্যে হুমায়ন কবির ঝুনু অস্ত্র ব্যবসায়ী। এই গ্রুপ ধরা পড়ার পর অস্ত্র ব্যবসায়ীদের সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। অস্ত্রের বর্তমান ব্যবহার, সীমান্তের ওপারে অস্ত্রের দাম কত, সবকিছুই তারা জানিয়েছে। অবৈধ ক্ষুদ্রাস্ত্রের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর দামও এরইমধ্যে বেশ বেড়েছে বলে জানা গেছে।
 
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার (পূর্ব) খন্দকার নুরুন্নবী ইত্তেফাককে বলেন, ‘৭টা অস্ত্র একসঙ্গে উদ্ধারের অর্থ এই নয় যে অবৈধ অস্ত্রের চোরাচালান বেড়ে গেছে। বর্তমানে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহারের পরিসংখ্যান দেখলেই বোঝা যাবে যে এটির ব্যবহার অনেক কমেছে। কোনোভাবে ফাঁকফোকর গলিয়ে এই অস্ত্রগুলো দেশে ঢুকে পড়েছিল এবং সেটা ধরাও পড়ে গেছে। প্রতিনিয়তই তারা অস্ত্র ব্যবসায়ীদের উপর নজর রাখছেন এবং গ্রেফতারও করছেন।’
 
সম্প্রতি গোয়েন্দাদের এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, যশোর কারাগারে বন্দি থেকেও এক সন্ত্রাসীর নির্দেশনায় অবৈধ অস্ত্রের হাতবদল হচ্ছে। লিটন নামের ওই সন্ত্রাসী একটি খুনের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত। কারাগারে বসে বাবু-আসলামসহ তার গ্রুপের অনেকের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখছে সে। কার কাছে কিভাবে অস্ত্র পৌঁছে দিতে হবে, সে ব্যাপারেও নির্দেশনা দিচ্ছে। তার এই নির্দেশনার কথোপকথনের রেকর্ড একটি গোয়েন্দা সংস্থার কাছে রয়েছে। এই সন্ত্রাসীর সেলে প্রায়ই তল্লাসি চালায় কারা কর্তৃপক্ষ। কিন্তু কিছুই পায় না, এটিই সবচেয়ে রহস্যময়।
 
গত দুই বছর সবচেয়ে বেশি অস্ত্র উদ্ধার করেছেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার সিগ্ধ আখতার। তিনি ইত্তেফাককে বলেন, সর্বশেষ ১৩ নভেম্বর যে ৭টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে, সেই অভিযানটি ছিল খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। শহর আলী, ঝুনু, ফেদু ও মানিক নামে চারজন ধরা পড়ে। এরা সবাই পেশাদার অপরাধী। এদের সবার বিরুদ্ধেই একাধিক অস্ত্র মামলা রয়েছে। সবমিলিয়ে এ বছর ২৯টি অস্ত্র উদ্ধার করেছেন তিনি। গেল বছরও ২২টি অস্ত্র উদ্ধার করেছেন। পুলিশের কোনো টিমের এটিই সর্বোচ্চ অস্ত্র উদ্ধার বলে জানা গেছে।
 
একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, সাম্প্রতিককালে দেখা গেছে নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে অবৈধ অস্ত্রের চাহিদা বেড়েছে। গার্মেন্টস কেন্দ্রিক ঝুট ব্যবসাসহ এলাকার নিয়ন্ত্রণে সন্ত্রাসীরা এর মধ্যে কয়েকটি ঘটনায় অস্ত্র ভাড়া নিয়েছে। পুলিশের তদন্তে এই দুই শিল্পনগরীকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি সিটি করপোরেশন নির্বাচন ও জেলা পরিষদ নির্বাচনকে ঘিরে অবৈধ অস্ত্রের চাহিদা আরো বাড়তে পারে বলে ধারণা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। তবে খুলনায় হঠাত্ কেন অস্ত্রের চাহিদা বেড়ে গেল সে ব্যাপারে কোনো তথ্য দিতে পারেননি তারা।
 
ইত্তেফাক/এএন