তাজরীনে অগ্নিকাণ্ডে দায়ী ব্যক্তিদের দ্রুত বিচার দাবি

আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০১৬, ০০:০১

তাজরীন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার চার বছর পূর্ণ হলো গতকাল বৃহস্পতিবার। স্বজনরা চোখের জলে স্মরণ করেছেন নিহত ও নিখোঁজ শ্রমিকদের। সেই ভয়াল রাতটির কথা এখনো ভুলতে পারেনি বেঁচে যাওয়া শ্রমিকরা। ঘটনার চার বছরেও দায়ী ব্যক্তিদের বিচার না হওয়ায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন তারা। অনেকেই এখনো ক্ষতিপূরণ পাননি বলেও অভিযোগ করেছেন। ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শ্রমিকদের জন্য কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন।

 
গতকাল সাভারের নিশ্চিন্তপুরে তাজরীনের অগ্নিকাণ্ডস্থল, রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাব ও জুরাইন কবরস্থানে নিহত শ্রমিকদের স্মরণসভা, বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধনের আয়োজন করে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন। এসব অনুষ্ঠানে দায়ী ব্যক্তিদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা, সব শ্রমিককে ক্ষতিপূরণের আওতায় আনা, তাদের শারীরিক ও মানসিক চিকিত্সার দাবিও ওঠে। 
 
২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর সাভারের নিশ্চিন্তপুরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত হন ১১৪ জন শ্রমিক। আহত হন আরো দুই শতাধিক। পুড়ে অঙ্গার হওয়া ৪৯টি লাশ সনাক্তই করা যায়নি। এসব লাশের নমুনা রেখে তাদের জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয় বেওয়ারিশ হিসেবে। পরবর্তীতে এর বেশিরভাগ লাশই সনাক্ত করা গেছে।
 
গতকাল জুরাইনে কবরস্থানে গিয়ে নিহতদের স্মরণ করেছেন, কেঁদে বুক ভাসিয়েছেন স্বজনরা। অতি আপনজনকে শেষ বারের মত দেখা কিংবা কবরস্থ করতে না পারার বেদনাও লুকাতে পারেনি। সকাল থেকেই জুরাইন কবরস্থানে গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরাম, গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, জাগো বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন, শ্রমিক নিরাপত্তা ফোরামসহ বেশ কয়েকটি শ্রমিক সংগঠন শ্রমিকদের স্মরণে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে।
 
এ সময় গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মোশরেফা মিশু বলেন, চার বছর পরও শ্রমিক হত্যায় দায়ীদের বিচার নিয়ে টালবাহানা চলছে। গত বছরের অক্টোবরে বিচার কাজ শুরুর পর এ পর্যন্ত ১৩টি সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য ছিল। এই সময়ে শতাধিক সাক্ষীর মধ্যে সরকারপক্ষ মাত্র ৪ জন সাক্ষীকে হাজির করতে পেরেছে। সর্বশেষ গত ১৩ নভেম্বর ৪ জন সাক্ষীকে কোর্টে হাজির করার কথা থাকলেও একজনকেও হাজির করতে পারেনি। এ রকম দুইজন সাক্ষীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানিয়েছেন, তাদের সঙ্গে কোন ধরনের যোগাযোগই করা হয়নি। এ সময় শ্রমিক সংগঠনের নেতারা বলেন, বিচারহীনতার কারণে থামছে না শ্রমিক হত্যা। সর্বশেষ গ্যাস লাইটার কারখানায় আগুনে দগ্ধ হয়েছেন প্রায় ৫০ জন শ্রমিক।
 
জাতীয় প্রেসক্লাবেও আহত শ্রমিকরা সমাবেশ ও মানববন্ধন করেছেন। এ সময় তাদের অনেকেই ক্ষতিপূরণের অর্থ পাননি বলে দাবি করেছেন। আলাদা আলাদা এসব সমাবেশ ও মানববন্ধনে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন শ্রমিক নেতা সিরাজুল ইসলাম রনি, মন্টু ঘোষ, সাদেকুর রহমান শামীম, কাজী রুহুল আমিন, কে এম মিন্টু, তপন সাহা প্রমুখ।
 
এদিকে সাভারে তাজরীন অগ্নিকাণ্ডস্থলে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। এসময় শ্রমিক নেতারা বলেন, ৪ বছর পার হলেও তাজরীনের মালিক দেলোয়ারসহ অন্যদের শাস্তি নিশ্চিত হয়নি। উল্টো তিনি জামিনে হাজতের বাইরে। সরকার নিজেকে শ্রমিকবান্ধব বললেও তাজরীনের মালিক শাস্তির আওতার বাইরে থাকাই প্রমাণ করে এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি বন্ধে সরকার আন্তরিক নয় বলে নেতারা দাবি করেন। গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতি আশুলিয়া শাখার উদ্যোগে তাজরীন ও রানা প্লাজার ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সাথে নিয়ে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করেন।
 
আশুলিয়া শাখার সভাপ্রধান আমিনুল ইসলামের সভাপতিত্বে সভায় বক্তব্য রাখেন তাসলিমা আখতার, নুরুল ইসলাম। এছাড়া বক্তব্য রাখেন তাজরীন গার্মেন্টসের আহত শ্রমিক ও রানা প্লাজার নিহত পরিবারের সদস্যরা। উপস্থিত হয়ে সংহতি জানান গণসংহতি আন্দোলনের আশুলিয়া শাখার নেতা সেলিম রেজা, তানভীর আহমেদ এবং ছাত্র ফেডারেশনের আতাউল্লাহ।
 
এ সময় বাংলাদেশ পোশাক শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি তুহিন চৌধুরী, গার্মেন্টস শ্রমিক ফ্রন্ট সাভার-আশুলিয়া কমিটির সভাপতি সৌমিত্র কুমার দাস, জাগো বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের ঢাকা জেলা কমিটি উত্তরের আহবায়ক মো. আব্বাস উদ্দীন, বাংলাদেশ বস্ত্র ও পোশাক শিল্প-শ্রমিক লীগের সাভার ও আশুলিয়া কমিটির সভাপতি মো. সরোয়ার হোসেন, বাংলাদেশ তৃণমূল গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মো. শামীম খাঁনসহ অন্যান্য শ্রমিক সংগঠন নিহতদের প্রতি ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
 

ইত্তেফাক/এএন