গুলশান হামলা

পাঁচ মাসেও শনাক্ত হয়নি মূল পরিকল্পনাকারী

আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩:১৩

পাঁচ মাস অতিক্রম হলেও হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার মূল পরিকল্পনাকারীকে শনাক্ত করতে পারেনি তদন্তকারী সংস্থা ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম (সিটি) এন্ড ট্রান্স ন্যাশনাল সাইবার ক্রাইম ইউনিট। হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় এখন পর্যন্ত দুই জনকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। এরা হলেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সাবেক শিক্ষক হাসনাত রেজা করিম ও কল্যাণপুরে জঙ্গি বিরোধী অভিযানে আটক রাকিব ওরফে রিগ্যান। এর পাশাপাশি এ ঘটনা তদন্তে প্রায় একশ’ ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট। এদের মধ্যে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া ৩২ জন প্রত্যক্ষদর্শী হিসাবে তাদের জবানবন্দি দিয়েছেন। ঘটনা তদন্তে প্রাথমিক পর্যায়ে কাউন্টার টেরোরিজম ধারণা করে যে, এই হামলার অন্যতম মাস্টার মাইন্ড বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডা প্রবাসী তামিম আহমেদ চৌধুরী। পরবর্তীতে তদন্তে কর্মকর্তারা জানতে পারেন যে, তামিম আহমেদ চৌধুরী হলি আর্টিজানের জঙ্গি হামলায় অপারেশন কমান্ডার হিসাব কাজ করেছেন।

 
জঙ্গি হামলার মূল পরিকল্পনাকারী কে-এমন প্রশ্নের জবাবে ডিএমপি’র মিডিয়া শাখার উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান বলেন, এ হামলার পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে অনেকেই পুলিশের জঙ্গি বিরোধী অভিযানে নিহত হয়েছেন। অন্যতম পরিকল্পনাকারী তামিম আহমেদ চৌধুরীও নিহত হয়েছেন। এর সঙ্গে আরো বেশ কয়েকজন জড়িত রয়েছেন-যাদেরকে শনাক্ত করা ও আটকের চেষ্টা চলছে।
 
গুলশান হামলায় ব্যবহূত আগ্নেয়াস্ত্রগুলো      ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলার একটি অস্ত্র কারখানায় তৈরি করা হয়েছিল। চাঁপাই নবাবগঞ্জের সীমান্ত পথ দিয়ে ট্রাকে আমের ঝুড়িতে করে তা ঢাকায় আনা হয়। অস্ত্রের বাহক আটক হলেও ঐসব আগ্নেয়াস্ত্র তৈরিতে অর্থ কারা দিয়েছেন তা শনাক্ত হয়নি।
 
গত বছরের সেপ্টেম্বরে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএসের মুখপাত্র ‘দাবিক’ এর একটি সংখ্যায় তামিম আহমেদ চৌধুরী নিজেকে আবু দুজানভ আল-বাঙ্গালী নাম ধারণ করে বাংলাদেশে আইএসের কার্যক্রম চালানোর ঘোষণা প্রকাশ হয়। ঐ ঘোষণার পরপর বাংলাদেশে লেখক, শিক্ষক, ব্লগার, বিভিন্ন ধর্মের মানুষসহ অন্তত অর্ধশত ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়। আত-তামকীন নামে একটি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ১১টি হত্যার দায় স্বীকার করে আনসার আল-ইসলাম নামে একটি জঙ্গি সংগঠন। ওয়েবসাইটে তাদের এই তথ্য দুই নামে প্রচার করা হয়। কখনো প্রচারকারী নিজেকে আবু ইউসুফ আল বাঙ্গালী আবার কখনো আবু ইব্রাহীম আল-হানিফ নামে প্রচার করা হয়। মূলত তামিমের ওপরে এমন ব্যক্তি রয়েছেন যিনি এ জঙ্গি হামলার মূল পরিকল্পনাকারী। তার পরিচালনায় এই কথিত খেলাফত প্রতিষ্ঠার আন্দোলন চালানো হচ্ছে।
 
গত ৮ অক্টোবর সাভারের আশুলিয়ায় র্যাবের অভিযানে পাঁচতলা ভবন থেকে লাফিয়ে পড়েন আব্দুর রহমান নামে এক জঙ্গি। পরে হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। এ ঘটনার পর ২২ অক্টোবর র্যাব মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, নিহত আব্দুর রহমানই উগ্রবাদী সংগঠন নব্য জেএমবির প্রধান। মূল নাম সারোয়ার জাহান। আরেক সাংগঠনিক নাম শাইখ ইব্রাহীম আবু আল হানিফ। র্যাব মহাপরিচালকের দাবি, নব্য জেএমবির নিহত অর্থদাতা আব্দুর রহমানই ইসলামিক স্টেটের (আইএস) কথিত বাংলাদেশ প্রধান শায়খ আবু ইব্রাহিম আল হানিফ। ২৭ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় তামিম চৌধুরীর আস্তানায় কাউন্টার টেরোরিজম যখন অভিযান চালায় সেসময় এই দুইজনের মধ্যে কথোপকথন হয়। বিশেষ একটি অ্যাপসের মাধ্যমে তারা যোগাযোগ করে।
 
আব্দুর রহমান নব্য জেএমবির প্রধান ও গুলশান হামলার মূল পরিকল্পনাকারী-র্যাবের এই দাবির পরপর ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম ঐ দাবি নাকচ করে দেন। তিনি সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘নিহত আব্দুর রহমান নব্য জেএমবির তৃতীয় সারির নেতা’।
 
ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘গুলশান হামলার মূল পরিকল্পনাকারী এখনো জীবিত। তাকে আমরা খুঁজছি। যদিও সে নিজেকে ‘হানিফ’ নাম বলে প্রচার করছে; কিন্তু সে নব্য জেএমবিতেই আছে আধ্যাত্মিক নেতা হিসাবে।’
 
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র জানায়, গুলশান হামলার পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত এটিএম তাজ উদ্দিন, নূরুল ইসলাম মারজান, জোনায়েদ খান, খালিদ, আজাদুল ওরফে কবিরাজ, বাশারুল্লাহ, রিপনসহ অন্তত ২৫ জনের নাম শনাক্ত করা হয়েছে। এদেরকে আটক করা সম্ভব হলে মূল পরিকল্পনাকারীর নাম জানা যাবে।
 
পহেলা জুলাইয়ে গুলশানের ৭৯ নম্বর রোডে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গিরা হামলা চালিয়ে ১৭ বিদেশিসহ ২০ জনকে হত্যা করে।
 

ইত্তেফাক/এএন