যুদ্ধের প্রাঙ্গণে দাঁড়াইয়া অর্জুন যখন যুদ্ধ করিতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগিতেছিলেন তখন শ্রীকৃষ্ণ জানাইলেন যে, অর্জুনের এইরূপ দ্বিধা করিবার কোনো কারণ নাই। কারণ, এই যুদ্ধে অর্জুন নিমিত্ত মাত্র, যুদ্ধ শুরুর পূর্বেই কৃষ্ণ সকলকে মারিয়া রাখিয়াছেন এবং অর্জুনদের বিজয় পূর্ব হইতেই সুনির্দিষ্ট করা আছে।
গণতন্ত্রকে যতই ‘অফ দ্য পিপল বাই দ্য পিপল ফর দ্য পিপল’ বলা হউক না কেন, যাহার ভিত্তির ওপর গণতন্ত্র দাঁড়াইয়া থাকে, জনগণের সেই ভোট তথা ম্যান্ডেটকে ম্যানুপুলেট করিবার অভূতপূর্ব সকল উপায় কিছু কিছু জনপদে এখন দেখিতে পাওয়া যাইতেছে। থাইল্যান্ডে গত রবিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচন লইয়া নানা বিতর্ক উঠিয়াছে। নির্বাচনের ফলাফলে কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় নাই। সেনা সমর্থিত দল ও থাকসিন সমর্থিত পিউ থাই পার্টি নির্বাচনে জয় এবং সরকার গঠনের পাল্টাপাল্টি দাবি করিতেছে। ইতোমধ্যে থাইল্যান্ডের বেসরকারি নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা ওপেন ফোরাম ফর ডেমোক্র্যাসি ফাউন্ডেশন (পি-নেট) জানাইয়াছে যে, নির্বাচন নিরপেক্ষ এবং সুষ্ঠু হয় নাই। অন্যদিকে ২০০৬ সালে ক্ষমতাচ্যুত থাকসিন বলিয়াছেন যে, অনেক স্থানে ভোটারের চাইতেও বেশি ভোট পড়িয়াছে। কিছু আসনে পরাজিত হইয়াও বিজয়ী হইয়াছে সরকার সমর্থিত দল। আরো অভিযোগ উঠিয়াছে যে, নির্বাচনের ফল অনুকূলে আনিতে দেশটির সামরিক কর্তৃপক্ষ সকল ব্যবস্থাই করিয়া রাখিয়াছিল। বিশ্লেষকরা মনে করেন যে, ভোটের ফলাফল যাহাই হউক না কেন, সেনাবাহিনী প্রণীত নূতন সংবিধানের কারণে দেশটির শাসনক্ষমতায় তাহাদের কর্তৃত্বই বহাল থাকিবে।
যখন কোনো যুদ্ধের শুরুতেই দেখা যায়, তাহার ফলাফল কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের মতো পূর্বেই নির্ধারণ করিয়া দেওয়া আছে, তখন সেই যুদ্ধ কোনো গুরুত্ব বহন করে না। বিজয়ের ক্ষেত্রে সেই যুদ্ধ হইয়া পড়ে একটি উছিলা মাত্র। নির্বাচনও এক ধরনের যুদ্ধ। এবং বিশ্বের অনেক দেশেই এই নির্বাচন-যুদ্ধ এখন পরিণত হইয়াছে স্রেফ প্রহসনে। এমনকী কোনো কোনো ভূখণ্ডে জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচনের অনিয়মের প্রভাব পড়িতেছে স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনেও। জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচনের ফলাফলের বিপরীত চিত্র যদি স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিফলিত হয়, তাহা হইলে জাতীয় নির্বাচনটি প্রশ্নবিদ্ধ হইতে পারে—এমন কারণেই হয়ত প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের সিলসিলা দেখা যায় স্থানীয় নির্বাচনেও। ইহা বুঝিয়া অনেক ক্ষেত্রে নির্বাচনের প্রতি জনগণের উদাসীনতাও প্রকটভাবে দেখা যাইতেছে।
মনে রাখিতে হইবে যে, অধিক ক্ষমতায় দায়িত্বের ভারও অনেক। ইহা ভুলিয়া গেলে চলিবে না যে, সাধারণ মানুষের জন্য নিঃশ্বাস নেওয়ার ন্যূনতম পরিবেশটিকেও যদি দিনের পর দিন রুদ্ধ রাখা হয়, তখন সামান্য রন্ধ্র দিয়াই নূতন নূতন সন্ত্রাস জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়া উঠিবার ক্ষেত্র তৈরি হইয়া যায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলিয়াছেন, ‘মানবচরিত্রের উপরে পরাধীনতার অবনতিকর ফল আছে। অসত্যাচরণ কপটতা অধীন জাতির আত্মরক্ষার অস্ত্রস্বরূপ হইয়া তাহার আত্মসম্মানকে, তাহার মনুষ্যত্বকে নিশ্চিতরূপে নষ্ট করিয়া ফেলে।’ কবিগুরুর ভাষাতেই এখন সাধারণ্যে নির্বিশেষে অবস্থা এইরূপ যে—‘সুখহীন নিশিদিন পরাধীন হয়ে ভ্রমিছ দীনপ্রাণে। সতত হায় ভাবনা শত শত, নিয়ত ভীত পীড়িত—শির নত কত অপমানে।’
সুতরাং পূর্ব নির্ধারিত বিজয়ের ফল কোনো না কোনো সময় বিষফল হইয়া দেখা দিতে পারে।
