নিরাপদ পানির সংকট সমাধানে এখনই উদ্যোগী হতে হবে

আপডেট : ২৭ মার্চ ২০১৯, ২১:৪৬

মাহমুদুল হাসান

মানুষের জীবনধারণের জন্য যদি একটি উপাদানের কথা বলা হয়, তাহলে অকপটে বলে দেওয়া যায় উপাদানটি হলো পানি। এ জন্যেই বলা হয় পানির অপর নাম জীবন। আসলে এই নামমাত্র পানিই কি জীবন। আমরা দেখেছি এই পানির মাধ্যমে কিছু জীবাণু বাহিত হয়ে মানবদেহে রোগের প্রাদুর্ভাব সৃষ্টি করে যাকে পানিবাহিত রোগ বলে। আজ থেকে কয়েক যুগ আগে এই পানিবাহিত রোগ মহামারি আকার ধারণ করেছিল যা অনেক প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল। বর্তমানেও এই পানিবাহিত রোগ অনেক ক্ষেত্রে প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তাই প্রশ্ন আসে পানির অপর নাম কি আসলে জীবন? উত্তর হলো কথাটি হবে নিরাপদ পানির অপর নাম জীবন।

এই পৃথিবীতে শতকরা ৭০ ভাগই হলো পানি। কিন্তু প্রশ্ন হলো পান করার যোগ্য কতটুকু পানি? ইউনেস্কোর তথ্যমতে, মোট পানির ৯৭ ভাগ লবণাক্ত আর ৩ ভাগ হলো স্বাদু পানি। এই স্বাদু পানির ৬৯ ভাগ আবার বরফাচ্ছন্ন, ৩০ ভাগ ভূগর্ভস্থ এবং প্রায় ১ ভাগ পানি আছে নদী-নালা, লেক, পুকুর ও অন্যান্য জলাশয়ে।

তাহলে সামগ্রিকভাবে দেখা যায়, মাত্র ৩ ভাগ পানি ব্যবহার্য। কিন্তু এই স্বাদু পানি কতটুকু নিরাপদ? আসুন হিসেব মেলাই। আমরা দৈনন্দিন কাজে যে পানি ব্যবহার করি তার উত্স হলো নদী-নালা, পুকুর, ডোবা, ঝর্ণা এবং অনেক ক্ষেত্রে ভূগর্ভস্থ পানি। আর শিল্প-কারখানার জন্যে মূলত নদী-নালা ও লেকের পানির ব্যবহার উল্লেখযোগ্য। অপরদিকে পান করার জন্য প্রধানত যে পানি ব্যবহার করি তা হলো ভূগর্ভস্থ ও কিছু বৃষ্টির পানি।

এখন আমরা যদি প্রান্তিক অঞ্চল থেকে হিসেব করি তাহলে দেখব দৈনন্দিন গড়ে প্রায় ৩৯ এলপিসিডি পানি ব্যয় হয় যার উত্স হলো নদী-নালা, পুকুর, ডোবা, অনেক সময় ভূগর্ভস্থ পানি ইত্যাদি। এই ব্যবহার্য পানির অবশিষ্ট পুনরায় নদী-নালা, পুকুর, জলাশয় ইত্যাদিতে গিয়ে সেখানকার পানি দূষিত করে। আবদ্ধ জলাশয়ের পানি দ্রুত দূষিত হয়, চলমান স্রোতধারার পানি দূষিত হতে সময় লাগে। আর যদি শহর ও শিল্প-কারখানার কথা চিন্তা করি তাহলে দেখব ব্যবহার্য পানি সুয়েজ বা নর্দমা হয়ে নদীতে আসে যা নদী দূষণ করে। উদাহরণস্বরূপ বুড়িগঙ্গা নদীর কথা বলা যায়। একইভাবে শিল্প-কারখানার ব্যবহূত পানি নামমাত্র শোধন করে পরিবেশে ছেড়ে দেওয়া হয় যা দূষণের মাত্রা অনেকগুণ বাড়িয়ে দেয়। ফলে দিন দিন পানি দূষিত হচ্ছে। আর আমাদের নিরাপদ পানির জন্য নির্ভর করতে হচ্ছে ভূগর্ভস্থ ও বৃষ্টির পানির উপর। কিন্তু বৃষ্টির পানি ঋতুকেন্দ্রিক হওয়ায় তা খুবই সামান্য যা দিয়ে প্রয়োজন মেটানো প্রায় অসম্ভব। অপরদিকে ভূগর্ভস্থ পানি সব জায়গায় সহজলভ্য নয়। ফলে নির্ভর করতে হচ্ছে সেই মুক্ত স্বাদু পানির উপর যা ইতোমধ্যেই আমাদের অব্যবস্থাপনার কারণে দূষিত হয়ে রয়েছে।

এখন ভূগর্ভস্থ পানি নিয়ে আলোচনা করা যাক। এই ভূগর্ভস্থ পানি আবার বিভিন্ন কারণে দূষিত হয়। অনিরাপদ পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাই এর অন্যতম কারণ। আবার কোনো অঞ্চলে এতে আয়রনের পরিমাণ ০.৩ মি.গ্রা এর বেশি থাকে যা পানাহার্য নয়। একইভাবে আর্সেনিকের পরিমাণ ০.০৫ মি.গ্রা এর বেশি থাকে যা পানের জন্য অনিরাপদ। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের তথ্যানুসারে বাংলাদেশের প্রায় ২২% টিউবওয়েল আর্সেনিক দূষণ রয়েছে। আবার অত্যধিক ভারী ধাতুর উপস্থিতিও ভূগর্ভস্থ পানি দূষণের অন্যতম কারণ। ফলে মিনারেল ওয়াটার মিনারেল না হয়ে দূষিত হয়ে পড়ে। অবশ্য বিজ্ঞানের কল্যাণে পানি বিশুদ্ধ করার কিছু ট্রিটমেন্ট ব্যবস্থা আছে যা ব্যয় সাপেক্ষ এবং অপ্রতুল। ইউনেস্কোর জরিপ অনুসারে বাংলাদেশে প্রায় ৬৬.৬৪ শতাংশ লোক এখনও নিরাপদ পানির আওতার বাইরে।

বাংলাদেশে ৮০ ভাগ লোক ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করে এবং ঢাকা শহরের সরবরাহকৃত পানির ৯৭ শতাংশই ভূগর্ভস্থ পানি। বাংলাদেশে উত্তরাঞ্চল ও কিছুটা দক্ষিণাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানি পাওয়া যায়। উপকূলীয় ভূগর্ভস্থ পানি কিছুটা লবণাক্ত। তদুপরি বিভিন্ন কারণে যেমন সেচ ব্যবস্থা, বহুতল স্থাপনা, খরা, অনাবৃষ্টি, প্রয়োজনাতিরিক্ত পানি উত্তোলন ইত্যাদি কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অনেক নিচে নেমে যাচ্ছে। গবেষকগণ আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে এভাবে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশে ভূগর্ভস্থ পানি পাওয়া দুষ্প্রাপ্য হবে। কাজেই পানিসম্পদের সঠিক ও টেকসই ব্যবস্থাপনাই পারে এই আশঙ্কা কাটিয়ে উঠতে। এখনই সময় নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার।

n লেখক :শিক্ষার্থী, মাওলানা ভাসানী

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়