আমি এতকিছু বুঝি না। তবু একজন মা বা মহিলা হিসেবে এই নাম শুনতে ভালো লাগে। আমার ভবিষ্যত্ কাজের অনুপ্রেরণা এই স্বীকৃতি। এই তালিকায় আছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের মেয়ে চেলসি ক্লিনটন, অস্ট্রেলিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী জুলিয়া গিলার্ড ও পাকিস্তানের প্রথম হিন্দু নারী সিনেটর কৃষ্ণকুমারীর মতো নারীরা।
—সীমা সরকার
মাঝে মাঝে অপরিচিত ফ্রেমই আমাদের চোখ দুটিকে ধাঁধিয়ে দেয়। যেসব দৃশ্য আমরা পরিচিত সমাজে বিশ্বাস করতে পারি না।
মা’কে নিয়ে সারা পৃথিবীতে নানারকম মিথ প্রচলিত। এই শ্বাশত চরিত্রের কোনো কলঙ্ক নেই। আছে অনেকরকম অবাক করা অধ্যায়। তেমনই এক মহিয়সী বাংলাদেশি মা-এর গল্প। সম্প্রতি সেই মায়ের ছবিটি ভাইরাল হয়েছে। আমরা তরুণরা যখন অনেক ফান, প্রাংকসহ হালকা বিষয়বস্তুকে শেয়ার করার প্রবণতায় থাকি। তারই ভেতরে কিছু দারুণ ছবিও সবার ভেতরে ছড়িয়ে যায়। কারণ এ রকম মায়ের গল্প যে বিরল!
স্বর্গের চেয়ে জননী অনেক বড়। এই কথাটি সবার জ্ঞাত হলেও এর বাস্তবতাও দেখা যায় এই সমাজে। অর্থাত্ মা বা জননী বিশাল কিছু। সন্তানের জীবনে মায়ের ভূমিকাই বেশি। মা তার সন্তানকে পেটে ধারণ থেকে শুরু করে ভূমিষ্ট হওয়া পর্যন্ত এবং পরেও লালন-পালন করেন। সন্তানও মাকে সম্মান করে থাকে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তার মায়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে ঝড়ের রাতে প্রমত্তা দামোদর নদী সাঁতরিয়ে পার হয়ে মায়ের কাছে গিয়েছিলেন। সমাজে মায়ের কী ভূমিকা সে কথা বীর যোদ্ধা নেপোলিয়নও বলেছেন। এতেই বোঝা যায় মায়ের স্থান কত ওপরে। আজ এখানে এমনই এক মায়ের কথা আমরা জানবো, যে মা তার প্রতিবন্ধী সন্তানকে জন্ম থেকে লালন-পালন করে বড় করেছেন এবং সমাজের এই প্রতিকূলতার মাঝে শিক্ষিত করার কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। যিনি আজ বিশ্বজুড়ে পরিচিত। বিবিসির জরিপে যিনি একশ’ মা বা মহিলার মাঝে ৮১তম। তিনি আর কেউ নন, নেত্রকোনার পৌরসভাধীন কুড়পাড় এলাকার সীমা সরকার। স্বপ্ন পূরণের মা সীমা সরকার।
সীমা সরকারের প্রতিজ্ঞা
সীমা সরকার তার জন্ম থেকে প্রতিবন্ধী সন্তান হূদয়কে শিক্ষিত করার জন্য যে পরিশ্রম বা শ্রম দিয়েছেন তা অতুলনীয়। সীমা রানী বলেন, জন্ম থেকেই হূদয় প্রতিবন্ধী। তার রোগের নাম সেরিব্রাল পালসি। চিকিত্সা করিয়েছেন, কিন্তু কোনো ফল হয়নি। ভালো চিকিত্সা নেই । এ অবস্থায় এই সন্তানকে মানুষ করার জন্য তিনি প্রতিজ্ঞা করেন। তার প্রতিজ্ঞা ছিল, যেকোনো উপায়ে ছেলেকে শিক্ষিত করে তুলবেন। সেই লক্ষ্যেই তিনি তখন থেকে কাজ শুরু করেন। বাসায় পড়ানোর পাশাপাশি তাকে স্কুলে কিভাবে ভর্তি করা যায়, সেই ভাবনা তাকে পেয়ে বসে। তিনি হূদয়কে নেত্রকোনা হলি চাইল্ড একাডেমিতে প্রথমে ভর্তি করান। সেখান থেকে সমাপনী পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করার পর হূদয়কে তিনি আঞ্জুমান সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ট শ্রেণিতে ভর্তি করান এবং সেখান থেকে হূদয় ২০১৬ সালে এসএসসি (৪.০৬) পাশ করে। পরে তাকে নেত্রকোনা আবু আব্বাস কলেজে ভর্তি করানো হয়। সেখান খেকে ২০১৮ সালে এইএচসি পাশ করে। এই যে দীর্ঘ সময় পার হলো, এজন্য সীমাকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। কোলে করে স্কুলে নেওয়া, ক্লাসে বসানো সব তাকেই করতে হয়েছে। স্কুলের প্রধান শিক্ষক থেকে শুরু করে কলেজের শিক্ষক এবং অধ্যক্ষ তাদের এ ব্যাপারে সহায়তা করেছেন। এবার যখন তিনি তার ছেলেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য ঢাকায় যান তখন ভিন্নরূপে তিনি আবির্ভূত হন। ‘খ’ ইউনিটের পরীক্ষা। কলা অনুষদে পরীক্ষা হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্ত্বরে যখন হূদয়কে নিয়ে পৌঁছালেন তখন রিকশা থেকে নেমে ছেলেকে কোলে নিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্র তাদের সাহায্য করতে চাইলেও তিনি তা বিনয়ের সাথে প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ‘আমার ইচ্ছা, আমার ছেলেকে আমি নিজে পরীক্ষার হলে বসাবো এবং কাছে থাকবো।’ কলা অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. আবু দেলোয়ার হোসেনের নিকট অনুমতি নিয়ে তিনি ছেলের পরীক্ষা কেন্দ্রের কাছে বারান্দায় থাকতে পেরেছিলেন বলে সীমা জানান।
বিপত্তি থেকে সমাধান
রেজাল্ট প্রকাশিত হওয়ার পর দেখা যায় মেরিট লিস্টে হূদয়ের স্থান ৩০৪৭। কিন্তু ভর্তির জন্য ফরম তুলতে গিয়ে বাঁধে যত বিপত্তি। বিশ্ববিদ্যালয়ে দৃষ্টি, শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধীদের কেবল ভর্তির সুবিধা রয়েছে। কিন্তু শারীরিক প্রতিবন্ধীর জন্য কোনো কোটা নেই। এ নিয়ে মিডিয়া এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সুশীল সমাজ বেশ কথাবার্তা বলেন। এ অবস্থায় ৯ নভেম্বর সিনেটের সভায় এই আইন সংশোধন করে তার ভর্তির সুযোগ করে দেওয়া হয়। এজন্য তিনি সিনেট ও মিডিয়ার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
সীমা সরকার জানান, তিনি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে হূদয়কে
কোলে নিয়ে হাঁটাচলা করছেন তখন অনেক ব্যক্তি তার সন্তানের লেখাপড়ার কথা শুনেছেন। কিভাবে তিনি এত কষ্ট করেছেন। তার জবাব, ‘সন্তানের জন্য কোনো মায়ের কষ্ট হয় না। আর আমার তো আরো হয়নি, কারণ আমার ছেলে প্রতিবন্ধী। তাকে তো বেশি যত্ন নিতে হবে। আমি এখানে অদম্য মা। সন্তানের লেখাপড়ার লক্ষ্যে আমার স্বপ্নপূরণের জন্য এ কষ্ট কিছুই না। প্রয়োজনে আমি আরো কষ্ট করবো। বিশ্ববিদ্যালয়ে হূদয় যেদিন ভর্তি হবে সেদিন বুঝবো আমার পরিশ্রম কিছুটা হলেও সার্থক হয়েছে। আমি সেদিনের অপেক্ষায় আছি।’ বিবিসির করা বিশ্বের ১০০ অনুপ্রেরণাদায়ী ও প্রভাবশালী নারীর তালিকায় স্থান পেয়েছেন সীমা সরকার। সন্তানের শিক্ষার জন্য তিনি কখনোই পিছপা হননি। ছেলেকে কোলে নিয়ে চলা-ফেরার সময় লোকজন শুধু দেখেছেন তার এই চলাফেরার চিত্র।
বিবিসির তালিকায় ৮১তম স্থানে রয়েছেন সীমা সরকার। বিশ্বের ৬০টি দেশের ১৫ থেকে ৯৪ বছর বয়সী বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রেরণাদায়ী ও প্রভাবশালী নারীদের নিয়ে এই তালিকা তৈরি করা হয়েছে। গত সোমবার বিবিসি অনলাইনে ওই প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। বিশ্বের ১০০ জনের মাঝে তার নাম শুনে তিনি প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘আমি এতকিছু বুঝি না। তবু একজন মা বা মহিলা হিসেবে এই নাম শুনতে ভালো লাগে। আমার ভবিষ্যত্ কাজের অনুপ্রেরণা এই স্বীকৃতি। এই তালিকায় আছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের মেয়ে চেলসি ক্লিনটন, অস্ট্রেলিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী জুলিয়া গিলার্ড ও পাকিস্তানের প্রথম হিন্দু নারী সিনেটর কৃষ্ণকুমারীর মতো নারীরা।
হূদয়ের মা সীমা রানী সরকার বলেন, ‘স্বামী ইটভাটার ব্যবস্থাপক। টানাটানির সংসারে হূদয়ের জন্ম হয় ২০০০ সালে। জন্ম থেকেই সে শারীরিক প্রতিবন্ধী। তবু তাকে অবহেলা করিনি। তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছি। কষ্ট করেছি, তাই এখন হয়তো সফলতার দিকে যেতে পারবো।’ হূদয়ের বাবা সমীরণ সরকার বলেন, ‘আমার এই প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য আমার স্ত্রী যা করেছেন, তার তুলনা নেই। তার জন্যই হূদয় এ পর্যন্ত যেতে পেরেছে। আমি আজ গর্বিত। আপনারা আশীর্বাদ করবেন, আমার স্ত্রীর স্বপ্ন যেন পূরণ হয়।’
সব কৃতিত্ব মায়ের
হূদয় বলেন, ‘ আমি যদি বিল্ডিং হই, আর সেই বিল্ডিংয়ের সকল পিলার হচ্ছেন আমার মা। আমার স্কুল থেকে কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার সবকিছুই মায়ের কৃতিত্ব। মা বলতেন, তুমি লেখাপড়ার জন্য যতদূর যেতে চাও আমি সবটুকই করবো। মা তা-ই করেছেন।’ হূদয়ের আর এক ছোট ভাই আছে। তার নাম অন্তু সরকার। সে আঞ্জুমান সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র, তবে সে স্বাভাবিক।
হূদয়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের পছন্দ আইআর। কেন এই সাবজেক্টে পড়ার ইচ্ছা সেই কারণ জানতে চাইলে তার জবাব, ‘দেশ সেবা করার জন্য এটা একটা বড় ক্ষেত্র। ডিপ্লোমেট হওয়ার আনন্দই আলাদা। দেশের স্বার্থ সংরক্ষণ করে বাইরে দেশকে তুলে ধরা যায়।’ এই সাবজেক্টে ভর্তি হতে তাকে এ ব্যাপারে সহায়তা করবেন বলে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ডিন সাদেকা হালিম আশ্বাস প্রদান করেছেন। শারীরিক সমস্যা এই ব্যাপারে কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে কি-না জানতে চাইলে হূদয় বলে, ‘না তা করবে না। ডিপ্লোমেট হচ্ছে মেধার বিষয়, গায়ের জোরের কিছুই না।’ যদি তিনি এই সাবজেক্টে ভর্তি হতে পারেন, তাহলে সে পড়ার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করবে।
নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক মঈনুল ইসলাম বলেন, ‘হূদয়ের লেখাপড়ার জন্য জেলা প্রশাসন থেকে যা যা করার তা করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে তার চলাফেরার জন্য তাকে অতিদ্রুত একটি হুইল চেয়ার প্রদান করা হবে।’
