রুলিবালায় গৃহবধূর স্বপ্নগাঁথা

আপডেট : ২৩ নভেম্বর ২০১৮, ১৮:১৪

পিতল দিয়ে তৈরি রুলিবালা। আর এ রুলিবালা তৈরি করে গৃহবধু সুচরিতা সংসারে নিয়ে এসেছে স্বচ্ছলতা। ৩ বছর আগে যেখানে সাংসারিক কাজের পাশাপাশি প্রতিবেশীদের সাথে গল্প করে সময় পার করতেন। আর এখন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাতুড়ি ও ছোট ছোট সেনি দিয়ে পিতল থেকে তৈরি রুলিবালায় নানা ধরনের কারুকার্য করতে ব্যস্ত থাকেন। আর এর মাঝে কাজ করেন সংসারে। তিনি প্রতিদিন ৫ জোড়া রুলিবালা তৈরি করে ২শ’ টাকা মজুরি পান।

এ কাজ করে যে আয় করেন তা দিয়ে গত ২ বছর  প্রতিমাসে ২ হাজার টাকার ডিপিএস খুলেছেন। মেয়ে সুমাইয়াকে গ্রামের স্কুলে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়াশোনা করাচ্ছেন। স্বামী এনামুল সরদার মিলে কাজ করেন। ফলে দু’জনের উপার্জনে সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরেছে রনসিঙ্গার গ্রামের এ দম্পত্তির।

নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার সদর ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম রনসিঙ্গার। এ গ্রামের বাজারে সাবেক সেনাসদস্য এমদাদুল হক গড়ে তুলেছেন রুবিবালার কারখানা। কারখানাটির নাম রেখেছেন ‘এমদাদ বালাঘর’। এ গ্রামটি এখন কারিগর গ্রাম নামে পরিচিত পেয়েছে। এ গ্রামের প্রায় ১৫০ জন নারী রুলিবালার কাজ করেন। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কাজ করে সংসারে স্বচ্ছলতা নিয়ে এসেছেন দরিদ্র পরিবারের এসব গৃহবধূরা। এছাড়া উপজেলার খট্টেশ্বর, পশ্চিম বালুভরা, রাণীনগর বাজারসহ বিভিন্ন গ্রামে আরো প্রায় শতাধিক নারী কাজ করে থাকেন।

জানা গেছে, পিতল দিয়ে তৈরি হয় রুলিবালা। পিতলের রঙ এবং সোনার রঙ প্রায় সমান। স্বর্ণের দাম বেশি হওয়ায় সবার পক্ষে অলঙ্কারের স্বাদ গ্রহণ করাও সম্ভব হয় না। রুলিবালাতে কারুকার্য করে সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলা হয়। ফলে পছন্দের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে ক্রেতাদের। আর এ কাজে এলাকার বেকার নারীদের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় এসব রুলিবালা এখন সরবরাহ করা হচ্ছে।

রনসিঙ্গার গ্রামের গৃহবধূ হাসনাহেনা বলেন, ‘রুলিবালার ওপর নকশা করতে গ্রামেই ২০ দিনের একটা প্রশিক্ষণ নিই। গত ৪ বছর ধরে এ কাজ করছি। এখানকার প্রতিটি বাড়িতে রুলিবালা তৈরি করা হয়। আগে গল্প করে এ গ্রামের নারীরা সময় পার করলেও এখন সবাই রুলিবালা তৈরিতে ব্যস্ত। কারোই যেন অবসর নেই। প্রতিদিন প্রায় ১৫০-২০০ টাকা পারিশ্রমিক পান এ কাজ করে। এখন বাচ্চাদের নিয়ে একটু ভালোভাবে দিন কাটাতে পারছি।’

রাণীনগর উপজেলার রুলিবালা কারখানার মালিক এমদাদুল হক জানান, ২৩ বছর সেনাবাহিনীতে চাকরির পর ২০১৩ সালে অবসর গ্রহণ করেন। এরপর নাটোর, সৈয়দপুর ও পাবর্তীপুরসহ বেশ কয়েকটি জেলায় প্রায় ৬ মাস রুলিবালা তৈরির ওপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ২০১৪ সালে স্ত্রী রুমাকে রুলিবালার কাজ শেখান। এরপর বাড়িতে ১০ জন নারী শ্রমিক দিয়ে কারখানার কাজ শুরু করেন।

তিনি আরো জানান, বর্তমানে এ উপজেলায় প্রায় ৩৫০ জন নারী কারিগর রুলিবালার সাথে সম্পৃক্ত। তার কারখানায় কাজ করে ১৮৫ জন নারী শ্রমিক। কাজের মান ভেদে নারী শ্রমিকদের ৮-৯ হাজার টাকা বেতন দেওয়া হয়।  রুলিবালা বাজারে বিক্রি হয় রঙ ছাড়া ১৫০-১৬০ টাকা এবং রঙ’সহ বিক্রি হয় ২৫০-৩০০ টাকা জোড়া। এসব রুলিবালা ঢাকার তাঁতীবাজার, সিলেট, বগুড়া, নাটোর ও নওগাঁসহ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়।