২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ হইতে ৮ কোটি ১০ লক্ষ মার্কিন ডলার হ্যাকাররা চুরি করিয়া নিয়া যায়। সার্ভারে অনুপ্রবেশ করিয়া এই ডিজিটাল কারচুপির খবর আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বহুল আলোচিত একটি ঘটনা। এই রহস্যের কূল-কিনারা এখনো হয় নাই। ইহার মধ্যে আবারও সরকারি সার্ভারে অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটিয়াছে। অবশ্য এখানে সরাসরি অর্থ নহে, এইরকম জালিয়াতির মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার পণ্য চুরির অভিযোগ উঠিয়াছে। এবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সার্ভার হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে নূতনভাবে এই চৌর্যবৃত্তির আশ্রয় নেওয়া হইয়াছে। বিস্ময়কর ব্যাপার হইল, এই ঘটনাও ঘটিয়াছে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির প্রায় একই সময়ে, যদিও দুইটি ঘটনার গতি-প্রকৃতি ভিন্ন। একটি সংঘবদ্ধ চক্র ২০১৬ সাল হইতে তিন হাজার ৭৭৭ বার লগইন করিয়াছে এনবিআরের সার্ভারে। তাহারা সরকারি আইডি, পাসওয়ার্ড ও চিঠি জালিয়াতি করিয়া চট্টগ্রাম বন্দর হইতে ৩০টি কনটেইনার পাচার করিয়াছে। ঘোষণা অনুযায়ী এইসব কনটেইনারে ছিল লোহা ও ইস্পাত পণ্য। তবে শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ধারণা—ইহাতে ছিল বিদেশি সিগারেট, দামি মদ ও পোশাক কারখানার পণ্য। এইরূপ জালিয়াতির মাধ্যমে পণ্য আমদানি ও ছাড় করিবার ঘটনা সত্যিই উদ্বেগজনক।
প্রকৃতপক্ষে চট্টগ্রাম কাস্টম, বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত বেসরকারি সংস্থার একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহায়তা ব্যতীত এইরূপ জালিয়াতি সম্ভব নহে। কেননা কাস্টমস কর্মকর্তাদের আইডি ও পাসওয়ার্ড সহজলভ্য হইবার কথা নহে। এই ঘটনায় আমাদের সাইবার নিরাপত্তা লইয়া আবারও বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হইল। ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের অংশ হিসাবে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ডিজিটালাইজেশনের ব্যাপক প্রভাব পড়িয়াছে। ইহার ইতিবাচক ফল সাধারণ মানুষও এখন ভোগ করিতেছেন। বর্তমান সরকারের যত সাফল্য আছে, তন্মধ্যে তথ্য-প্রযুক্তির উন্নয়ন অন্যতম। কিন্তু সরকারের বিভিন্ন সংস্থার গোপন আইডি ও পাসওয়ার্ড যদি অপরাধীদের হাতে চলিয়া যায়, তাহা হইলে তাহা গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থার নিরাপত্তার জন্যই হুমকিস্বরূপ। এইজন্য আমাদের সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থার ত্রুটি ও দুর্বলতাগুলি দূর করিতে হইবে। ইহার সঙ্গে জড়িত সকল অপরাধীকে দ্রুত গ্রেফতার করিয়া আইনের হস্তে সোপর্দ করা উচিত। এখানে আমাদের বলিবার কথা এই যে, সার্ভারে অনুপ্রবেশ করিয়া ই-মেইল হ্যাকিং করা অনেক কষ্টসাধ্য কাজ। ইহার জন্য অনেক কুবিদ্যা-কুবুদ্ধি লাগে। কিন্তু ইহার চাইতেও সহজেই এখানে অর্থ লোপাট করা হইয়াছে, তাহার ব্যাপারে কি কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইয়াছে?
সিপিডির এক হিসাব অনুযায়ী ব্যাংকখাতের শীর্ষ দশ কেলেঙ্কারিতে গত বত্সরের শেষ নাগাদ ২২ হাজার ৫০২ কোটি টাকা লোপাট হইয়াছে। বিশেষ করিয়া হলমার্ক ও বিসমিল্লাহসহ কয়েকটি গ্রুপের অনিয়ম-দুর্নীতি এখনো মানুষের মুখে মুখে ফিরিতেছে। অর্থাত্ শুধু হ্যাকিংয়ের মাধ্যমেই অর্থপাচার বা লোপাট হইতেছে না, অন্য যেসব মাধ্যমে হইতেছে, তাহার পথও বন্ধ করিতে হইবে। সফটওয়ারের আইডি বা পাসওয়ার্ড যাচাই করিবার জন্য দুই বা তিন স্তরের নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা সংযুক্ত করিতে হইবে। সংশ্লিষ্ট কোনো কর্মকর্তা অবসর নিলে বা বদলি হইলে সঙ্গে সঙ্গে তাহার আইডি বা পাসওয়ার্ডটি বন্ধ করিবার ব্যবস্থা করিতে হইবে। যিনি এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ই-মেইল অ্যাড্রেস পরিচালনা করিবেন, তাহাদের অবশ্যই দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হইবে।
