‘সর্ব অঙ্গে ব্যথা’ বলে একটা কথা শুনেছিলাম, বিষয়টি কী আমি এই মুহূর্তে সেটি টের পাচ্ছি, কিন্তু মজার কথা হচ্ছে এই বিষয়টি নিয়ে আমি নিজের কাছে কিংবা অন্য কারো কাছেই অভিযোগ করছি না বরং এই আমি ছেলে মানুষের মতো তা উপভোগ করছি। আমার মনে হয় বিষয়টা আরেকটু ব্যাখ্যা করা দরকার।
প্রতিবছর স্বাধীনতা দিবসের আগে আগে আমাদের এভারেস্ট বিজয়ী পর্বতারোহী নিশাত মজুমদার আমাকে ফোন করে বলে, স্বাধীনতা দিবসের ভোরবেলা তারা শহীদ মিনার থেকে তাদের অদম্য পদযাত্রা শুরু করবে, সেটা শেষ হবে সাভার স্মৃতিসৌধে। আমি কি তাদের সঙ্গে খানিকটা পথ হাঁটতে পারব? প্রতিবছরই আমি আনন্দের সঙ্গে রাজি হই এবং তাদের সঙ্গে ঘণ্টাখানেক হাঁটি। তারপর বিদায় নিয়ে চলে আসি। একদল তরুণ-তরুণী কিশোর-কিশোরী বালক-বালিকা এমনকী শিশুরা বাংলাদেশের এবং মুক্তিযুদ্ধের বিশাল বিশাল পতাকা ঘাড়ে নিয়ে হেঁটে যেতে থাকে। দেখে আমার খুব ভালো লাগে।
কাজেই এ বছরেও আমি আনন্দের সঙ্গে রাজি হয়েছি। রাতে ঘুমাতে দেরি হয়েছে বলে উঠতে একটু দেরি হয়েছে এবং কোনোভাবে তাড়াহুড়া করে শহীদ মিনারে হাজির হয়েছি। পুরো দলটি ঠিক সেই মুহূর্তে পদযাত্রা শুরু করেছে এবং আমি কোনোভাবে তাদের পেছনে সামিল হয়েছি। এই পদযাত্রাটি মূলত তরুণ-তরুণীদের, সংগঠনটির নাম ‘অভিযাত্রী’। এখন তাদের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর যুক্ত হয়েছে, পদযাত্রাটি নিবেদিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের জন্য তহবিল সংগ্রহের উদ্দেশ্যে।
ঠিক কতোক্ষণ হাঁটব তা ঠিক করে আসিনি, তাই মনে হলো মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর পর্যন্ত যাওয়া যেতে পারে। সেখানে অনেক ছেলেমেয়ে জড়ো হয়, দেশাত্মবোধক গান গায়, ব্রতচারী নৃত্য হয়। পদযাত্রায় অংশ নেয়া সবাইকে নাস্তা খাওয়ানো হয়। হাঁটতে হাঁটতে এক সময় আমরা মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে পৌঁছালাম, আমার খুবই প্রিয় একটি জায়গা। সারা বাংলাদেশে দেখার মতো যে কয়টি জায়গা আছে এটি তার মাঝে অন্যতম। সেখানে একজন শ্বেতাঙ্গিনী মহিলার সঙ্গে দেখা হলো, জাদুঘরের অন্যতম ট্রাস্টি মফিদুল হক আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, ইনি বসনিয়ার যুদ্ধাপরাধী রেডোভান কারাডিচের ট্রাইব্যুনালের প্রসেকিউটর ছিলেন। (যে বিচার কাজ সমাপ্ত হবার পর কারাডিচের চল্লিশ বছর জেল হয়েছে!) আমি অবাক হয়ে মহিলার দিকে তাকিয়ে রইলাম, বললাম, এরকম একটি ঐতিহাসিক কাজ করেছে যে মানুষটি ধারণা করেছিলাম সে নিশ্চয়ই আরো অনেক বয়সী হবে। ভদ্রমহিলা হাসলেন, বললেন, “আমাকে যে- বয়সী দেখায়, আসল বয়স তার থেকে অনেক বেশি!” বিনয়ের কথা। সবসময়েই দেখেছি পৃথিবীর বড় বড় মানুষেরা বিনয়ী হয়।
আমি যখন পদযাত্রা শেষ করে বাসায় ফিরে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছি তখন হঠাত্ মনে হলো আরো একটু হাঁটলে কেমন হয়? তাই আবার পদযাত্রীদের সঙ্গে নেমে গেলাম! আমি তখন তাদের মতোই টকটকে লাল টি-শার্ট পরেছি, সেখানে লেখা “শোক থেকে শক্তি অদম্য পদযাত্রা” এবং “’৫২ থেকে ’৭১ স্বাধীনতার পদরেখায় পদযাত্রা”। আমার সঙ্গে যারা হাঁটছে তাদের বললাম, “পরের বার একটা গামছা নিয়ে আসতে হবে।” মুখ থেকে কথাটি বের হওয়ার আগেই একজন তার ব্যাকপ্যাক থেকে লাল টকটকে একটা গামছা বের করে আমার গলায় ঝুলিয়ে দিল। আরেকজন রোদ থেকে বাঁচার জন্যে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের একটা বেসবল ক্যাপ আমার মাথায় পরিয়ে দিল! সবাই আমাকে দেখেশুনে রাখছে যেন আমার কোনো কষ্ট না হয়। চৈত্র মাসের বিখ্যাত কটকটে রোদে হেঁটে হেঁটে আমরা মিরপুরের জল্লাদখানা বধ্যভূমিতে পৌঁছেছি। দেখব দেখব করেও ঢাকায় থেকেও এই বধ্যভূমিটি আগে দেখা হয়নি। সবার সঙ্গে হেঁটে হেঁটে জল্লাদখানা বধ্যভূমিটি দেখলাম। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের তত্ত্বাবধানে এটাকে তৈরি করা হয়েছে, উপস্থাপনাটি সব মিলিয়ে অসাধারণ। একাত্তর সালে এটা মূল জনবসতি থেকে একটুখানি দূরে ছিল বলে সাধারণ মানুষদের ধরে এনে জবাই করে এখানে ফেলে দেওয়া হতো। আমাদের দেশে যে ভয়াবহ গণহত্যা হয়েছে, বাংলাদেশ এখন তার একটা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার চেষ্টা করছে। আমার ধারণা জল্লাদখানার মতো দুই-একটি বধ্যভূমি দেখলেই এই দেশে সংঘটিত পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম জেনোসাইড নিয়ে কারো কোনো সন্দেহ থাকবে না।
জল্লাদখানা থেকে সবাই বোটানিক্যাল গার্ডেনের ভেতর দিয়ে চটবাড়ী ঘাট পর্যন্ত যাবে। সেখান থেকে ঘণ্টাখানেক পথ নৌকায়। তরুণ-তরুণী কিশোর-কিশোরীরা যখন বাংলাদেশ এবং মুক্তিযুদ্ধের পতাকা নিয়ে রাজপথ প্রকম্পিত করে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছে, আমি তখন খানিকটা পথ গাড়ি করে চলে এসেছি। বোটানিক্যাল গার্ডেনের ছায়া ঢাকা পথ দিয়ে হেঁটে হেঁটে একসময় চটবাড়ী ঘাট নামে নৌকা ঘাটে পৌঁছেছি। সেখানে আমাদের নেওয়ার জন্যে তিনটি বড় বড় ট্রলার অপেক্ষা করছে। নদীর কালো বিষাক্ত দুর্গন্ধময় পানির ভেতর দিয়ে ট্রলারগুলো যেতে থাকে এবং আমি নিজের ভেতর এক ধরনের বেদনা অনুভব করি। বাংলাদেশের নদীর মতো এত সুন্দর নদী পৃথিবীর কোথাও নেই। অথচ এই নদীগুলোর এখন কী ভয়াবহ করুণ অবস্থা! আমাদের নদীগুলোকে রক্ষা করার জন্য তাদেরকে প্রায় মানুষের সম্মান দিয়ে আইন পাস হয়েছে। নদীগুলো যেহেতু নিজেরা কথা বলতে পারে না, তাদেরকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে কাতর কণ্ঠে আর্তনাদ করতে পারে না তাই মানুষেরা এখন তাদের পক্ষে আইনি সহায়তা চাইতে পারবে। আমাদের বিচার বিভাগের কী অসাধারণ একটি অবদান। কবে আমরা তার সুফল পেতে শুরু করব?
এক সময় নৌকা ঘাটে থেমেছে। আমরা সবাই নৌকা থেকে নেমে আবার হাঁটতে শুরু করেছি। হেঁটে হেঁটে দুটি স্কুল পার হয়েছি। একটি স্কুলের বাচ্চা ছেলেরা নাড়ু-মুড়কি আর সরবত তৈরি করে অপেক্ষা করছে। দ্বিতীয় স্কুলটিতে দুপুরের খাবারের আয়োজন। এর মাঝে কত কিলোমিটার হাঁটা হয়েছে কে জানে, কিন্তু অনেকেই ক্লান্ত হতে শুরু করেছে। দুপুরে খাবার পর আবার হাঁটা শুরু হলো। এবারে গন্তব্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানকার লোক প্রশাসন বিভাগের কম বয়সী বিভাগীয় প্রধানও আমাদের সঙ্গে আছেন। তার উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ছেলেমেয়ে এই অভিযাত্রী দলটিকে অভ্যর্থনা করার জন্য অপেক্ষা করছে।
কাঠফাটা রোদটিকে দেখে আমি হেঁটে যাবার সাহস পেলাম না। গাড়ি করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে অন্য সবার জন্যে অপেক্ষা করতে থাকি। ততক্ষণে সূর্য ঢলে পড়তে শুরু করেছে। রোদের তীব্রতা নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারে অপেক্ষা করতে করতে একসময় বিশাল পতাকা হাতে অভিযাত্রী বাহিনীটিকে দেখতে পেলাম। তারা পতাকা উড়িয়ে উড়িয়ে আসছে। শহীদ মিনারে খানিকক্ষণ সময় কাটিয়ে সবাই স্মৃতিসৌধের দিকে রওনা দিল।
সারাদিন এই তরুণ-তরুণীর সঙ্গে কাটিয়ে তাদের সম্পর্কে অনেক কিছু জেনেছি। গত ছয় বছর থেকে তারা এই পদযাত্রা করে যাচ্ছে। এই বছর শুধু ঢাকায় নয়, জামালপুরের অভিযাত্রীরা পিটিআই বধ্যভূমি থেকে শুরু করে প্রায় একুশ কিলোমিটার দীর্ঘ পদযাত্রা করে মুক্তি সংগ্রাম জাদুঘরে যাচ্ছে। এই অভিযাত্রী দলের পদযাত্রায় স্বাভাবিকভাবে নানা ধরনের খরচ থাকে, কিন্তু তারা কখনোই কর্পোরেট স্পন্সরদের মুখাপেক্ষী হয়নি এবং হবেও না। তারা নিজেরা সবাই মিলে এই খরচটি বহন করে। তাদের এই পদযাত্রায় যোগ দেবার জন্যে সারাদেশ থেকে ছেলেমেয়েরা আসে। গত বছর পাঁচ-ছয় বছরের একটি শিশু পুরো পথটি হেঁটে হেঁটে অতিক্রম করেছে।
কাজেই আবার হাঁটছি। হাঁটছি এবং হাঁটছি। কণা নামের যে মেয়েটি সারাক্ষণ আমাকে একটা শিশুর মতো দেখে রাখছে সে এক মুহূর্তের জন্যেও আমাকে চোখের আড়াল করেনি। এভারেস্ট বিজয়ী নিশাত মাঝে মাঝেই আমার খবর নিচ্ছে। একবার আমাকে জিজ্ঞেস করল, আমার কী অবস্থা। আমি বললাম, “আমি ভালোই আছি। শুধু হাঁটু দুটো আমার কথা শুনতে চাইছে না। বিদ্রোহ করতে চাইছে।” সে বলল আমি চাইলে আমাকে মোটরবাইকের পিছনে বসিয়ে নিয়ে যেতে পারে। আমি বললাম, মনে হয় তার প্রয়োজন হবে না।
আমরা যখন স্মৃতিসৌধে পৌঁছলাম তখন সন্ধ্যে সাড়ে সাতটার মতো বাজে। বাইরে অনেক মানুষের ভিড়, ভেতরে অন্ধকার, নিরিবিলি এবং ফাঁকা। শুধু এক পাশে দূরে গান-বাজনা হচ্ছে, না হলেই ভালো হতো। স্মৃতিসৌধের ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে এই চটুল গান-বাজনা মানায় না। হেঁটে হেঁটে স্মৃতিসৌধের কাছাকাছি এসে সবাই চুপচাপ বসে পড়ে। ঘুটঘুটে অন্ধকার ইলেকট্রিসিটি নিয়ে হয়ত একটু সমস্যা রয়েছে। স্মৃতিসৌধটিও অন্ধকারে আবছা অবস্থা দেখা যাচ্ছে। হঠাত্ করে স্মৃতিসৌধের আলো জ্বলে উঠল, বিশাল স্মৃতিসৌধটি তার পুরো ভাবগাম্ভীর্য নিয়ে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। যতবার আমি স্মৃতিসৌধটি দেখি ততবার মনে হয় এই বিশাল স্মৃতিসৌধের একটুখানি আমার, মুক্তিযুদ্ধে আমার যে আপনজন, আমার যে বন্ধুরা শহীদ হয়েছে তাদের অধিকারে স্মৃতিসৌধের একটুখানিও আমার নিজস্ব হয়ে গেছে। একান্তভাবেই আমার।
অভিযাত্রী দল এখানে এসে একটা শপথ নেয়, শপথ নেওয়ার আগে তারা আমাকে কিছু বলতে বলল। আমি কি বলব? যেটা অনুভব করি সেটাই বললাম। আমি বললাম, তোমরা কেউ নিজের চোখে মুক্তিযুদ্ধ দেখোনি। সেই কবে মুক্তিযুদ্ধ হয়ে গেছে। এতদিন পরে তোমরা যদি মুক্তিযুদ্ধের কথা ভুলে যেতে আমাদের কিছু বলার ছিল না। কিন্তু কী আশ্চর্য। মুক্তিযুদ্ধের জন্যে আমাদের ভেতর যে আবেগ, তোমাদের ভেতরেও সেই আবেগ। সেই ভালোবাসা।
তারপর তারা শপথ পাঠ করল। এই শপথ বাক্যগুলো এত সুন্দর যে সেগুলো লেখার জন্যেই আমি আগের পুরো লেখাটুকু ভূমিকা হিসেবে লিখেছি। তাদের কথা শুনে মনে হলো স্মৃতিসৌধটি বুঝি পাথর এবং কংক্রিটের একটি বস্তু নয়। এই সৌধটির ছদ্মবেশে লাখ লাখ শহীদ, লাখ লাখ মুক্তিযোদ্ধা সামনে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে, আর এই তরুণ-তরুণী, কিশোর-কিশোরীরা তাদের কাছে শপথ করছে। তারা বলল:
“হে আমার মহান অগ্রজেরা, তোমাদের উপর অর্পিত কর্তব্য তোমরা পালন করেছো অসীম সাহসিকতায় বিরল ভালোবাসায় আর নিপুণ নিষ্ঠায়। কর্তব্যের সময় এবার আমাদের।
জীবন উত্সর্গকারী হে শ্রেষ্ঠ সন্তানেরা তোমাদের সাহস, ভালোবাসা ও নিষ্ঠা সঞ্চারিত হোক আমাদের হূদয়ে, মস্তিষ্কে শহীদের রক্তের মতো উজ্জ্বল হয়ে জ্বলে উঠুক আমাদের মেধা-মনন, শিল্পবোধ ও রুচি। অসাম্প্রদায়িক মানবিকতা, জ্ঞান-দক্ষতা ও সাধনা শক্তিতে সমাজ হয়ে উঠুক বলীয়ান।
যে মহান আত্মত্যাগে আমরা আজ উচ্চশির স্বাধীন সেই ত্যাগ স্মরণ করে শপথ নেই, তোমাদের আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেব না। যে শক্ত ভিত্তির পত্তন তোমরা করেছো, তারই ওপর নির্মাণ করব সৌধের পর সৌধ। সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক সৌধ, অর্থনৈতিক উন্নয়নের সৌধ, সম্প্রীতির সৌধ আর জাতির নবজাগরণের সৌধ।”
শপথ শেষ করে সবাই নিঃশব্দে বসে রইল অনেকক্ষণ।
২.
আমি যখন চলে আসছি তখন আট-নয় বছরের ছোট একটি মেয়ে আমার কাছে ছুটে এসে বলল— স্যার, আজকে আমি পুরো পথটি নিজে নিজে হেঁটে এসেছি।
আমি শিশুটির দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। তারপর তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম। যে দেশে এরকম শিশু জন্মায় সেই দেশ নিয়ে আমাদের ভয় কী?
হ্যাঁ, এই মুহূর্তে আমার সর্ব অঙ্গে ব্যথা। বসলে দাঁড়াতে পারি না, দাঁড়ালে বসতে পারি না। কিন্তু আমার মুখে এগাল ওগাল জোড়া হাসি। হঠাত্ করে এরকম অসাধারণভাবে স্বাধীনতা দিবস পালন করতে পারলে কার না আনন্দ হবে?
n লেখক :শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক
