রাবিতে একই প্রশ্নে নিয়োগ ও পদোন্নতির পরীক্ষা

আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৮:৪২
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) একই প্রশ্নপত্রে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী পদে নিয়োগ এবং পদোন্নতির লিখিত পরীক্ষা গ্রহণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্তদের পছন্দের প্রার্থীদের নিয়োগ ও পদোন্নতির উদ্দেশে এমনটি করা হয়ে থাকতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন।
 
এ ঘটনাকে অনেকে ‘প্রিয় ভাজনের অভিনব কৌশল’ হিসেবেও আখ্যায়িত করেছেন। আবার অনেকে এই ঘটনাকে ক্ষমতার ভয়াবহ অপব্যবহার বলেও অভিহিত করেছেন। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ঘটনাটিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দুর্বলতা বলে মত দিয়েছেন। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়ে, প্রশাসনের এধরনের দুর্বলতা থাকা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
 
জানা গেছে, গত ২ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বিজ্ঞান ভবনের বিভিন্ন কক্ষে নিয়োগ ও পদোন্নতির পরীক্ষা একই সঙ্গে ও সময়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে। সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সাধারণ কর্মচারী পদোন্নতির বাছাই পরীক্ষা-২০১৬’ (সেট-১) এবং ‘গবেষণাগার পরিচারক পদে নিয়োগের বাছাই পরীক্ষা-২০১৬’ (সেট-২) উভয় প্রশ্নপত্রের একটি করে কপি আমাদের হাতে এসেছে। পর্যালোচনায় দেখা যায়, এমসিকিউ ৫০টি প্রশ্নের মধ্যে উভয় প্রশ্নপত্রের ৪৩টির হুবহু মিল রয়েছে। সেট-১ এর ১ থেকে ২০ পর্যন্ত ক্রমিকের প্রশ্নগুলো সেট-২ এর ২১ থেকে ৪০ পর্যন্ত ক্রমিকে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে সেট-২ এর ১ থেকে ২০ পর্যন্ত ক্রমিকের প্রশ্নগুলো সেট-১ এর ২১ থেকে ৪০ পর্যন্ত ক্রমিকে দেওয়া হয়েছে। উভয় প্রশ্নপত্রের ৪১, ৪৮ ও ৫০ নম্বর ক্রমিকে একই প্রশ্ন দেওয়া হয়েছে। তবে ৪২, ৪৩, ৪৪, ৪৫, ৪৬, ৪৭, ৪৯ এই ৭টি ক্রমিকে ভিন্ন প্রশ্ন রয়েছে।
 
এদিকে পরীক্ষার এক সপ্তাহ পরে ওয়েবসাইটে ফলাফল প্রকাশ করেছে আইসিটি সেন্টার। সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, পদোন্নতির জন্য আবেদনকারী ১০১ চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর মধ্যে একজন অনুপস্থিত ছিলেন এবং একজনকে পরীক্ষার হলে গিয়ে বহিষ্কার করেছেন উপ-উপাচার্য। বাকি ৯৯ জনের মধ্যে যে ৬০ পাশ করেছেন, তাদের ৫৫ জনই বিএনপি ও জামায়াতের অনুসারী বলে জানা গেছে। তবে অকৃতকার্য ৩৯ জন সরকার সমর্থক আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বলে দাবি করা হয়েছে। সূত্র মতে, আলোচিত পরীক্ষায় পদোন্নতির জন্য কৃতকার্যদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন যথাক্রমে- নগরীর ২৬ নং ওয়ার্ড যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নাসির আলী (পদ সটার); জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের বিভাগীয় সভাপতি লোকমান আলীর মেয়ে মোছা. লতিফা খাতুন (পদ জেনেটর); জামায়াতের চারঘাট থানার (পশ্চিম) আমির মিজানুর রহমান (পদ কেন্দ্রীয় লাইব্রেরীর ক্লিনার); জামায়াতের কাটাখালি পৌরসভার (পূর্ব) আমির আবুল কালাম আজাদ (পদ জেনেটর); জামায়াতের মির্জাপুর শাখার আমির মন্টু আলী (পদ সেন্ট্রাল ল্যাবরেটরীর ল্যাব এসিস্টেন্ট), নবাব আলী, নয়জল হক, রহমত আলী, লিটন, মোয়াজ্জেম হোসেন, মাইনুল ও সাত্তার প্রমুখ। অথচ মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ফজলুর রহমানের পুত্র, জনসংযোগ দপ্তরের অফিস সহায়ক আমিনুল ইসলাম চার বার পদোন্নতির পরীক্ষা দিয়েও পাশ করতে পারেন নি বলে জানা গেছে।
 
এনিয়ে সংশ্লিষ্ট সরকার সমর্থক আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। তবে কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না উপ-উপাচার্যের রোষানলে পড়ার ভয়ে। ভুক্তভোগী কর্মচারীরা জানান, প্রশ্ন প্রণয়নের দুর্বলতার বিষয়টি ধামাচাপার উদ্দেশ্যে সংশ্লিষ্ট নিয়োগ ও পদোন্নতির এখতিয়ারপ্রাপ্ত উপ-উপাচার্য ও কমিটির সদস্যগণ প্রশ্নের মধ্যেই টিক দিয়ে উত্তর দেয়ার নিয়ম করেন। যাতে কেউ প্রশ্ন বাইরে নিতে না পারেন। এদিকে পদোন্নতির জন্য আবেদনকারীদের প্রবেশপত্রে সাধারণ জ্ঞান, বাংলা ও ইংরেজী বিষয়ে এমসিকিউ উল্লেখ থাকলেও প্রশ্নে রহস্যজনক কারণে অংকও দেওয়া হয়েছে।     
ওয়াকিবহালদের অভিমত, স্বাভাবিক বিবেচনায় নিয়োগ এবং পদোন্নতির প্রশ্নপত্র একই ধরণের হওয়ার সুযোগ নেই। কারণ নিয়োগ ও পদোন্নতির প্রার্থীদের মধ্যে বয়সের বিরাট ব্যবধান থাকে। এছাড়া পদোন্নতির প্রার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ কর্মচারী। তাদের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ প্রশাসন ও কর্মকা্ল সম্পর্কিত প্রশ্নপত্র হতে পারতো বলে অনেকেই মতামত দিয়েছেন। 
এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাবির একজন সাবেক শিক্ষক সদস্য আক্ষেপ করে বলেন, ‘এটা খুবই দুর্ভাগ্য যে, চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের (পিয়ন) পদোন্নতির পরীক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রশাসন সম্পর্কিত কোনো প্রশ্নই করা হয়নি। অথচ পদোন্নতির প্রশ্নপত্রে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, প্রশাসন, সাবাস বাংলাদেশ, শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, বধ্যভূমি, শহীদ মিনার এবং বিভিন্ন ভবন-আবাসিক হলসহ বিভিন্ন স্থাপনা ও কর্মকা্ল ইত্যাদি বিষয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ ছিল।’ এসব বিষয়ে কোনোই প্রশ্ন না থাকায় তিনি এই প্রতিবেদকের কাছে গভীর হতাশা ব্যক্ত করেন।
 
দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক সিণ্ডিকেট সদস্য উদাহরণ হিসেবে একটি গল্প বলেন। গল্পটি হচ্ছে এমন— তাঁর এক অল্প শিক্ষিত নিকটাত্মীয়ের জন্য পাত্রী (কনে) দেখতে যাওয়া হবে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ায় নিকটাত্মীয় তাঁকে কিছুতেই সঙ্গে নিতে চাইছিলেন না। শেষ পর্যন্ত লুঙ্গি পরে যাবার শর্তে তাঁকে নেওয়া হয়। খাওয়া-দাওয়া শেষে কনে দেখার সময় দেখা দেয় বিপত্তি। কারণ অল্পবয়স্ক ওই কনের কাছে পাত্র পক্ষের লোকজন জানতে চাচ্ছিলেন- আমেরিকার প্রেসিডেন্টের নাম, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর নাম, আফগানিস্তানের রাজধানীর নাম ইত্যাদি। এতে করে বিব্রত ও ভীতসন্ত্রস্ত্র মেয়েটি যখন কাঁপছিল, তখন তিনি (বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক) ওই কনেকে প্রশ্ন করেছিলেন, এই মেয়ে তুমি কি, ভাত-তরকারী রান্না করতে পার? ধান সিদ্ধ করতে পার? তখন মেয়েটি সহজেই উত্তর দেওয়ায় পাত্র পক্ষের নিকটাত্মীয়রা তাকে মেয়ে পক্ষের লোক বলে কুটক্তি করেছিলেন। আলোচিত চতুর্থ শ্রেণির নিয়োগ ও পদোন্নতির একই প্রশ্নপত্র প্রসঙ্গে তিনি দুঃখ করে বলেন, আসলে মেথর ড্রেন ও পায়খানা সময়মত পরিষ্কার করতে পারে কীনা? পিয়ন সময়মত সঠিক অফিসে চিঠি পৌঁছে দিতে পারেন কিনা?
পদোন্নতির পরীক্ষা প্রসঙ্গে জানতে চাওয়ায় কনে দেখার সময়েরমত কটুক্তির ভয়ে তিনি নিজের নাম প্রকাশ করতে অপরাগত প্রকাশ করেন। তিনি আরো বলেন, আসলে মেথর ড্রেন পরিষ্কার করতে পারবেন কীনা? পিয়ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দেশিত অফিসে সময়মত চিঠি পৌঁছে দিতে পারবেন কীনা? কেরানী হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করলে তারা ওই কাজ ঠিকমত করতে পারবেন কীনা? এমন প্রশ্নই পদোন্নতির ক্ষেত্রে হওয়া উচিত। কিন্তু তা না করে বিসিএস টাইপে প্রশ্ন করায় সেগুলোর উত্তর অনেকেই স্বাভাবিক কারণে দিতে পারেন নি। এগুলো তো সংশ্লিষ্টদের ভাবা উচিত ছিল। এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের প্রতি কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত বিদ্বেষ ফুটে উঠেছে বলেও তিনি মত প্রকাশ করেন।        
সূত্র মতে, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের নিয়োগ ও পদোন্নতির বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্যের এখতিয়ারভূক্ত। তাই উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. চৌধুরী সারওয়ার জাহান নিজেই পছন্দের নিয়োগ ও পদোন্নতির কমিটির অন্তর্ভূক্ত কয়েক শিক্ষককে নিয়ে উভয় প্রশ্নপত্র প্রস্তুত করেছেন বলে জানা গেছে। তাঁকে সর্বোতভাবে সহায়তা করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক খাদেমুল ইসলাম মোল্যা।
এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে আইসিটি সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক খাদেমুল ইসলাম মোল্যা দাবি বলেন, ‘উভয় পরীক্ষার (নিয়োগ ও পদোন্নতি) প্রশ্নপত্র তৈরি করেছেন উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. চৌধুরী সারওয়ার জাহান। আমরা (আইসিটি সেন্টার) শুধু সমন্বয় করেছি মাত্র। এই বিষয়ে কথা বলার জন্য তিনি উপ-উপাচার্যের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। যোগাযোগ করা হলে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান বলেন, প্রশ্ন একই হলেও সেট আলাদা ছিল। জামায়াত-বিএনপির অনুসারীদের সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, যাদের যোগ্যতা রয়েছে তারাই পরীক্ষায় টিকেছে। এখানে আমার কিছুই করার নেই, বলারও নেই।
 
ইত্তেফাক/এএম।