দেশজুড়ে মৃদু থেকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ

আপডেট : ১৫ জানুয়ারি ২০১৭, ০৯:০১
 
কনকনে ঠান্ডায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে প্রায় সারা দেশ। একটু একটু করে শীত জেঁকে বসতে শুরু করেছে। উত্তরাঞ্চলে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ চলছে। প্রতিদিন নামছে তাপমাত্রা। গতকাল পঞ্চগড়ের তেতুলিয়া, কুড়িগ্রামের রাজারহাটসহ কয়েকটি এলাকায় তাপমাত্রা ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসে। উত্তরের হিমালয় থেকে নেমে আসা ঘন কুয়াশা আর হিমেল হাওয়া কাহিল করে ছেড়েছে জনজীবন। টাঙ্গাইল, শ্রীমঙ্গল, রাজশাহী, পাবনা, দিনাজপুর, নীলফামারী ও চুয়াডাঙ্গার উপর দিয়েও মাঝারি শৈত্য প্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। কুয়াশায় ঢাকা পড়েছে প্রকৃতি-পরিবেশ। রাজধানী ঢাকায়ও এখন পাওয়া যাচ্ছে শীতের আমেজ। উত্তরের জেলাগুলোতে কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ ঘর থেকে বের হতে বেশ কষ্ট পাচ্ছে। অনেকে টাকার অভাবে কিনতে পারছেন না শীতবস্ত্র। গরম কাপড়ের অভাবে করুণ দশা অনেকের। বিশেষ করে ছিন্নমুল-হতদরিদ্র মানুষের অবস্থা শোচনীয়। খড়কুটো জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছে তারা। সবচেয়ে বেশী প্রভাব পড়েছে বৃদ্ধ ও শিশুদের মধ্যে।
 
রাজশাহীতে পড়ছে কনকনে শীত। হিম কুয়াশার সঙ্গে ঠান্ডা বাতাস কাঁপিয়ে দিয়েছে পুরো জনপদ। বাড়ছে শীতজনিত রোগ। গত পাঁচ দিনে তিনগুণ রোগী ভর্তি হয়েছে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে।
 
আবহাওয়াবিদ রুহুল কুদ্দুস বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) জানান, রাজধানীসহ সারাদেশেই শীতের তীব্রতা অনুভূত হচ্ছে। কারণ উত্তরের হাওয়ার বেগ বেড়েছে। আরও দুদিন তাপমাত্রা একইরকম থাকতে পারে। তিনি জানান, উত্তরাঞ্চলে শৈত্যপ্রবাহের তীব্রতা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। বরিশাল বিভাগ এবং ফরিদপুর, মাদারীপুর, গোপলগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, সীতাকুন্ড, রাঙ্গামাটি, কুমিল্লা, ফেনী, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, রংপুর, সৈয়দপুর, খুলনা, সাতক্ষীরা, যশোর ও কুষ্টিয়া অঞ্চলসমূহের উপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারী ধরণের শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। রাজধানীতে গতকাল সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১১ দশমিক ৮ ডিগ্রী সেলসিয়াস। ঢাকায় শৈত্যপ্রবাহ নয়, শীতল বাতাস বইছে। তিনি বলেন, তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রী সেলসিয়াসের নিচে চলে গেলে তখন তাকে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ, ৮ ডিগ্রীর নিচে গেলে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ ও ৬ ডিগ্রির নিচে গেলে তীব্র শৈত্য প্রবাহ বলে উল্লেখ করা হয়। সে হিসেবে ঢাকায় এখনও শৈত্যপ্রবাহ শুরু হয়নি। রুহুল কুদ্দুস বলেন, গতকাল মাদারীপুরে ৯ দশমিক ৮ ডিগ্রী, ময়মনসিংহে ১০ দশমিক ৫ চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে ৯ দশমিক ৬, সিলেটের শ্রীমঙ্গলে ৭ দশমিক ৫, রাজশাহীর ঈশ্বরদীতে ৭ দশমিক ৪, খুলনার চুয়াডাঙ্গায় ৯ দশমিক ২ এবং বরিশালে ১০ দশমিক ২ ডিগ্রী সেলসিয়াস সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে।
 
এ আবহাওয়াবিদ আরো বলেন, শীতের তীব্রতা থাকবে। আর জানুয়ারির শেষে আবার শৈত্যপ্রবাহ আসতে পারে। মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত সারাদেশে হালকা থেকে মাঝারী ধরণের কুয়াশাও অব্যাহত থাকতে পারে বলে তিনি জানান।
 
এদিকে হরেক করমের শীতবস্ত্রের পসরা নিয়ে বসেছে মৌসুমী ব্যবসায়ীরা। সরকারিভাবে জেলা, উপজেলা প্রশাসন, বিজিবি, বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, বীমা ও সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে কিছু কিছু এলাকায় গরম কাপড় বিতরণ করলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা অতি সামান্য।
 
ঈশ্বরদী (পাবনা) সংবাদদাতা জানান, গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি ও ঘন কুয়াশার পর শুক্রবার হতে  ঈশ্বরদীতে তীব্র শীত জেঁকে বসেছে। শুক্রবার এখানকার তাপমাত্রা ৭ দশমিক ৪ ডিগ্রী রেকর্ড করা হলেও একদিনের ব্যবধানে গতকাল শনিবার প্রায় ২ ডিগ্রী নেমে ৫ দশমিক ৫ ডিগ্রীতে দাঁড়িয়েছে। তীব্র ঠান্ডায় পদ্মা পারের ও চরাঞ্চলের ছিন্নমূল মানুষ হাড় কাঁপানো শীতে নাজেহাল হয়ে পড়েছে। সন্ধ্যার পর এবং সকালে মানুষ পথের ধারে খড়-কুটো জ্বালিয়ে শীত নিবারণের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।
 
মৌলভীবাজার প্রতিনিধি জানান, গত কয়েকদিন থেকে এ অঞ্চলে তীব্র শীত জেঁকে বসেছে। হাড় কাঁপানো শীতে জনজীবনে একপ্রকার স্থবিরতা নেমে এসেছে। বাড়ছে শীতজনিত নানা অসুখ বিসুখ। পৌষে শীত কম থাকলেও মাঘের প্রথম দিনে শীত হানা দিয়েছে। কুয়াশার পরিমাণ কম থাকলেও কনকনে হিমেল হাওয়া বইছে। বিশেষ করে শ্রীমঙ্গল উপজেলায় তীব্র শীত পড়েছে। বেশি প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছে না।
 
সৈয়দপুর (নীলফামারী) সংবাদদাতা জানান, সৈয়দপুরে কনকনে হাড় কাঁপানো শীত আর শৈত্য প্রবাহে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। শিশু ও বৃদ্ধরা শীতজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। দরিদ্র এবং খেটে খাওয়া মানুষের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে।
 
 
 
 
 
লোকজ উত্সব শুরু
সোনারগাঁওয়ের লোকশিল্প জাদুঘর প্রাঙ্গণে চলছে মাসব্যাপী কারুশিল্প মেলা ও লোক গানের আসর
সোনারগাঁও (নারায়ণগঞ্জ) সংবাদদাতা
 
দেশজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ঐতিহ্যের সব উপকরণ যেন এক চৌহদ্দির মাঝে এসে ঠাঁই নিয়েছে। কিংবা এভাবেও বলা যেতে পারে আমাদের জাতিগত পরিচয়কে বুকে জড়িয়ে ধরে রয়েছে যেসব গান বা লোকজ উপাদান সেসব ছোট্ট ছোট্ট বিষয় এসে জড়ো হয়েছে সোনারগাঁওয়ের লোকশিল্প জাদুঘর সংলগ্ন চত্বরে। শুরু হয়েছে দেশের ঐতিহ্যবাহী লোক কারুশিল্প মেলা ও লোকজ উত্সব।
 
এখানে বাংলার লোক গানের আসর যেমন বসেছে তেমনি রয়েছে কারুশিল্পীদের শিল্পকর্ম। সব মিলিয়ে বাংলার আত্মপরিচয়ের সন্ধান মিলবে এই মেলায় এলে। পরিচয় মিলবে হাজার বছরের বাঙালির যে ইতিহাস তার ধারাবাহিক সাংস্কৃতিক বিবর্তনের। গতকাল শনিবার উদ্বোধনের দিনেই মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে মেলা প্রাঙ্গণ। বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন এই মেলার আয়োজন করেছে। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত এ মেলা। চলবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।
 
মেলায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কারুশিল্পীদের পণ্য বিক্রির জন্য ১৯৩টি স্টল স্থান পেয়েছে। মেলার পাশাপাশি লোকজ মঞ্চে প্রতিদিন বাউলগান, কবিগান, পালাগান, জারি-সারি ও ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া গান এবং লোক জীবন প্রদর্শনীসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান চলবে। মেলা চত্বরে খেলার মাঠে বিভিন্ন ধরনের হারিয়ে যাওয়া গ্রামীণ খেলার প্রদর্শনীও চলবে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ৫৪ জন কারুশিল্পীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে তাদের শিল্পকর্ম তৈরি, প্রদর্শন ও বিক্রির জন্য। এদের মধ্যে রয়েছে ঝিনাইদহ ও মাগুরার শেলা শিল্প, রাজশাহীর শখের হাড়ী, চট্টগ্রামের তালপাতার হাতপাখা, রংপুরের শতরঞ্জি, সোনারগাঁওয়ের কাঠের পুতুল, কাঠের কারুশিল্প ও নকশী কাঁথা, সিলেটের শীতল পাটি, ধামরাইয়ের তামা কাঁসা ও পিতলের কারুশিল্প, বান্দরবান ও রাঙামাটির ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কারু পণ্য ও টাঙ্গাইলের বাঁশের কারুশিল্প।
 
সংস্কৃতি রক্ষার লড়াইয়ে নামার আহবান সংস্কৃতি মন্ত্রীর: শনিবার এই লোক কারুশিল্প মেলা ও লোকজ উত্সবের উদ্বোধন করেন সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। উদ্বোধনী ভাষণে তিনি বলেন, জঙ্গিবাদ কিন্তু শেকড় গড়তে শুরু করেছে, এ থেকে পরিত্রাণের জন্য প্রয়োজন মানবিক শিক্ষা। রাজনৈতিক লড়াইতো আমরা করছি, আমাদের প্রকৃত লড়াই সংস্কৃতি রক্ষার লড়াই। কারণ বর্তমানে সংস্কৃতিকে বাণিজ্য হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। তিনি জানান, অচিরেই সোনারগাঁও লোকশিল্প জাদুঘরে নতুন ভবন তৈরি করা হবে। তাছাড়া পানাম নগরীর ৫২টি ঐতিহাসিক ভবন সংস্কার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
 
ফাউন্ডেশনের পরিচালক কবি রবীন্দ্র গোপের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন স্থানীয় সাবেক এমপি আব্দুল্লাহ আল কায়সার, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব আক্তারী মমতাজ, নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক রাব্বী মিয়া প্রমুখ।
 
সম্মিলিত কণ্ঠে জাতীয় সংগীত পরিবেশন ও মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সূচনা হয়।  শেষে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন অতিথিবৃন্দ। এতে গান পরিবেশন করেন বরেণ্য শিল্পী কিরণ চন্দ্র রায়, আইনাল হক বাউল, আনিসা প্রমুখ।