আশুলিয়ার তাজরিন ফ্যাশন হইতে শুরু করিয়া পুরাতন ঢাকার নিমতলী, চকবাজার ও সর্বশেষ বনানী ট্রাজেডি হইতে কি প্রমাণিত হয় না যে, অগ্নিকাণ্ডের ব্যাপারে আমাদের সার্বিক সচেতনতা এখনো আসে নাই? গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর অন্যতম অভিজাত এলাকা বনানীতে যে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটিল, তাহা পুরাতন ঢাকা হইলে হতাহতের সংখ্যা আরো বাড়িত নিঃসন্দেহে। প্রশস্ত রাস্তা, নির্বিঘ্নে পানির সরবরাহ এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের কারণে উদ্ধার অভিযানের মাধ্যমে অনেকেরই জীবন রক্ষা পাইয়াছে। নিশ্চয়ই ইহা আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সক্ষমতা বৃদ্ধির নির্দেশক। বিএসইসি ভবন ও বসুন্ধরা সিটিতে যখন আগুন লাগে, তখন আমাদের দমকল বাহিনী ছিল একপ্রকার অসহায়। এখন ২০ তলা পর্যন্ত পানি ও কর্মী বহন করিবার মতো ক্রেন রহিয়াছে আমাদের। কিন্তু তাহার পরও অনেক মানুষের আর্তনাদে শেষপর্যন্ত আমরা সাড়া দিতে পারি নাই। অনেকেই বহুতল ভবনটি হইতে লাফ দিয়া পড়িয়া গিয়া হতাহত হইয়াছেন। গতকালের সর্বশেষ খবর অনুযায়ী বনানীর এফ আর টাওয়ারে আগুন লাগিবার ঘটনায় একজন শ্রীলঙ্কান নাগরিকসহ ২৫ জন নিহত ও ৭৩ জন আহত হইয়াছেন। আমরা এই ঘটনায় গভীর দুঃখ ও শোক প্রকাশ করিতেছি। হতাহতদের পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়-স্বজনের প্রতি জানাইতেছি আন্তরিক সমবেদনা।
বাংলাদেশ একটি ক্ষুদ্র আয়তনের দেশ, অথচ ইহার জনসংখ্যা সেই তুলনায় অনেক বেশি। ফলে দেশে বহুতল ভবন নির্মাণের যৌক্তিকতাকে অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু এইজন্য যে নিয়ম-নীতি ও নিরাপত্তা বিধানের কথা রহিয়াছে, তাহা কি ঠিকমত অনুসৃত হইতেছে? যে ভবনটিতে আগুন লাগিয়াছে তাহার অনুমোদন আছে ১৮ তলা পর্যন্ত। কিন্তু তাহা ২৩ তলা করা হইল কী করিয়া? আবার গত ১৪ বত্সর ধরিয়া এই অনিয়ম বহাল রহিয়াছে কীভাবে? স্বাভাবিকভাবে এই প্রশ্নও ওঠে যে, রাজউক আসলে কী করিতেছে? সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলির অবহেলার কারণেই আজও অগ্নিনির্বাপণ ও জরুরি নির্গমন ব্যবস্থা নাই রাজধানীর অধিকাংশ ভবনে। ফায়ার সার্ভিস ইহা লইয়া বিভিন্ন সময় ভবন মালিকদের নোটিস দিলেও অনেকেই তাহার জবাব পর্যন্ত দিতেছেন না। ভবন নির্মাণ ও সমপ্রসারণ এবং অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপণ সংক্রান্ত যেইসব আইন ও বিধিমালা রহিয়াছে তাহা যথাযথভাবে না মানিবার কারণেই বারবার মানুষের জীবন আজ বিপন্ন হইতেছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষের মতে, মোটা দাগে অগ্নিকাণ্ডের ১৯টি কারণ রহিয়াছে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হইল—চুলার আগুন, বৈদ্যুতিক শটসার্কিট, সিগারেটের টুকরা, খোলা বাতির ব্যবহার, উত্তপ্ত ছাই বা জ্বালানি, রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া, বাচ্চাদের আগুন লইয়া খেলা, বাজি পোড়ানো ইত্যাদি। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত ১৫ বত্সরে আগুনে পুড়িয়া মারা গিয়াছেন ১,৯৭০ জন, আহত হইয়াছেন ১০,৪২৫। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করিতে হইলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সংস্থার কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। প্রয়োজন উদ্ধার অভিযানের সময় উত্সুক মানুষের ভিড় হইতে রক্ষায় আশেপাশের এলাকা ঘিরিয়া ফেলা। ইহা ছাড়া ভবন তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণে যাহাতে আমাদের কোনো ত্রুটি না থাকে, এইজন্য আরো সতর্ক ও সচেতন হওয়া একান্ত আবশ্যক।
