আরশিনগর g বাহার উদ্দিন
যুদ্ধের আবহে, গুরুতর সামাজিক সংকটের মুহূর্তে মহাভারতে শ্রীকৃষ্ণ বলেছিলেন—অতীতের সঙ্গে বসবাস করো না। স্মৃতির অভিজ্ঞতা দিয়ে প্রাসঙ্গিক ঘটনাকে বিচার করো, সমসাময়িক প্রয়োজনকে গুরুত্ব দাও। ইতিহাসকে দেখো, ইতিহাসের নির্দেশে এগিয়ে চলো।
বাংলা ও বাঙালির, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা আর অসমের বঙ্গভাষীদের কারো কারো ভেতরের ও বাইরের অন্ধ অতীতমুখিতা খানিকটা সংশয় তৈরি করছে। তাদের ওপর ভর করছে চিন্তার নৈরাজ্য। আমরা অনেক সময় অতীতের শুদ্ধতার শক্তিকে অস্বীকার করি, ইতিহাসকে বিকৃত করে বিভ্রান্তির রাজনীতিকে আমল দিয়ে ইতিহাস-বিরুদ্ধ সিদ্ধান্ত নিয়ে বসি। কিন্তু ইতিহাসের নির্মাণ ও দর্শন আর তার প্রসারিত সত্য ভালোমন্দকে খতিয়ে দেখে বর্তমানের হইচই পেরিয়ে ভবিষ্যতের ইতিবাচক অভিমুখ গড়ে তোলে। নির্দিষ্ট দিশার দিকে নিয়ে যেতে চায় আমাদের। এই মুহূর্তে বাঙালির ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র একাংশ সাম্প্রদায়িকতাদুষ্ট রাজনীতির ফাঁদে গলিয়ে দিচ্ছেন পা। তাদের শক্তি সীমিত। চিন্তা অবরুদ্ধ। সংশয়াচ্ছন্ন। শারীরিক গতির বাস্তবতাটাও তারা ভুলে যাচ্ছেন যে, পদযুগল পেছনে হাঁটে না। হাঁটে সামনে, কেবলই সামনে। চোখও তেমনি সমুখে তাকায়, ডানদিকে-বাঁদিকে দেখে। হ্যাঁ কেউ যদি বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন, ফিরিয়ে আনতে চান পরিত্যক্ত খণ্ডিত অর্ধসত্যকে, তাহলে অতীতের কবলে বন্দি হয়ে তার দৃষ্টি আর চলত্শক্তি ভয়ঙ্করের শিকার বনে যায় এবং দিকদর্শী ‘গ্যালিলিও’ নাটকের প্রাচীনপন্থি পুরোহিতের মতো পেছন দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলতে থাকেন, যে পথে চলেছি, সে পথেই চলব।
আমাদের সৌভাগ্য, বঙ্গীয় সমতটে এদের সংখ্যা বেশি নয়। বৃহত্তর সমাজের আত্মোন্মোচন ও ঐতিহ্যপ্রীতির তুলনায় এদের দিশাহীন, স্বচ্ছতাহীন প্রবণতা অনেক অনেক দুর্বল; কিন্তু এই সব মানুষের অসংলগ্ন চিন্তার দারিদ্র্য যেহেতু সংক্রামক, আবেগতাড়িত বহিরাগতের উস্কানিতে পরিচালিত, সে কারণে অখণ্ড বাঙালির তারুণ্য আর আবহমান যাপনের বহুত্ব দিয়ে লৌকিক ও নাগরিক সংস্কৃতির সুন্দরকে সঙ্গে নিয়ে কিছু কিছু ঐতিহাসিক ঘটনা স্মরণ করে মূঢ় বিবেকহীন, যুক্তিহীন আচরণের বিরুদ্ধে প্ররোচনার বিরুদ্ধে বাড়িতে, বাড়ির বাইরে, রাজনীতির ময়দানে, আমাদের চিরচেনায় আড্ডার তর্ক-বিতর্কে প্রতিটি সতর্ক মুহূর্তে, নিরস্ত্র যুক্তিময় ভাবাবেগের লড়াই চালু রাখা একান্ত জরুরি। না হলে বিষবৃক্ষের চারা বাড়বে, ছায়া বাড়বে। বাড়বে দাঁতাল হিংসার অবাস্তব আর অবিশ্বাসের পরিধি।
বাঙালি বিশ্বের অন্যতম বড় নৃগোষ্ঠী। মিলনের প্রার্থনা, রবীন্দ্রনাথ যাকে বলেছিলেন একমানবের সাধনা, যে সাধনার অভ্যাস এ জাতির মজ্জাগত। সজল প্রকৃতি, নদীমাতৃক সভ্যতা, কৃষি নির্ভর উপার্জন গ্রাম-ছোঁয়া নাগরিকতার নির্মিত ইমারত জাতিকে, তার লৌকিক সৃষ্টিকে যুগযুগ ধরে প্রায় পাঁচ হাজার বছর জুড়ে সৌহার্দ্য আর ঐক্যের বার্তায় সমৃদ্ধ করেছে। দেশভাগের ট্র্যাজেডি মানচিত্রের ভাঙন সাম্প্রদায়িকতার হুঙ্কার ইত্যাদিকে অতিক্রম করে জাতীয়সত্তাকে সত্তার অবিভাজিত রূপকে সবসময় উঁচিয়ে ধরেছে। যখনই সে কোনো ফাটল কিংবা বিভাজন তৈরির আশঙ্কা লক্ষ্য করেছে সে তার বিবেক দিয়ে, যুক্তি ও বুদ্ধি দিয়ে, গঠনশীল রাজনীতি দিয়ে, ভাষা ও সাহিত্যের সোনালি ফসল দিয়ে, লৌকিকের চিরায়ত বিশ্বাসকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে এসেছে রাস্তায়। তার সর্বসেরা প্রজ্ঞাও রচনা করেছেন প্রায়োগিক ঐক্যতান। সুর তুলেছেন, বাঙালির গান, বাঙালির প্রাণ এক হোক এক হোক হে ভগবান। এ ভগবান কি অদৃশ্য ঈশ্বর? মনে হয় না। রূপায়িত অন্তরাত্মার সমবেত ইচ্ছা। তারই এক স্মরণীয় অনুকরণযোগ্য চেহারা আমরা দেখতে পাই ষাটের দশকের পূর্ব পাকিস্তানে। রবীন্দ্রনাথের জন্ম শতবর্ষে ভীতসন্ত্রস্ত সামরিক সরকার রবীন্দ্রসংগীতের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করল। প্রতিবাদ আর প্রতিরোধের ঝাণ্ডা উঁচু করল ছাত্রশক্তি। স্বাক্ষর অভিযানে ঝাঁপিয়ে পড়লেন বুদ্ধিজীবীরা।
প্রাতিষ্ঠানিকতা ঘাবড়ে গেল। হার মানল। হেরে গিয়েও সাম্প্রদায়িকতার আশ্রয় নিল, বিভাজনের নকশা আঁকতে থাকল, কখনো ধর্মের নামে, কখনো ভাষিক জনগোষ্ঠী সমতায় বিভেদ বাঁধিয়ে। অকুতোভয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমান রাজনীতির কঠিন পথ আঁকড়ে ধরলেন, গণঅসন্তোষ আর ছাত্রবিক্ষোভকে গণতান্ত্রিকতায় সাজিয়ে দিয়ে স্বৈরশাসনের মোকাবিলায় ব্যাপক অঙ্গীকার ছড়িয়ে দিলেন।
ঠিক ওই সময়েই হঠাত্ একটি সংকট ঘনিয়ে এল। কাশ্মীরের হজরতবাল দরগা থেকে উধাও হয়ে গেল হজরত মহাম্মদের (স.) পবিত্র কেশগুচ্ছ। উপমহাদেশের সব প্রান্তে উত্তেজনাময় পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটল। অশান্ত দুই বাংলাও। কলকাতা, খুলনা, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ রক্তক্ষয়ের সম্মুখীন, নষ্ট হচ্ছে অমূল্য সম্পদ, জনক্ষয়ে পরিবেশে আতঙ্ক। পাকিস্তানের তত্কালীন সরকার পয়গম্বরের কেশচুরির ঘটনা আর সামাজিক উত্তেজনা থেকে ফায়দা তুলতে মরিয়া। পশ্চিমবঙ্গেও কেউ কেউ বিভেদের নীলনকশা তৈরিতে ব্যস্ত। কিন্তু দাঙ্গাবাজদের বিরুদ্ধে দুই বাংলার সচেতন জনমত ঐক্যবদ্ধ। কলকাতার সুস্থ রাজনীতিও চুপ করে বসে থাকল না। ঢাকার মুজিবের উচ্চারণে কঠোর হুঁশিয়ারি। দলের কর্মীদের নিয়ে নেমে এলেন রাস্তায়। ১৫ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু আর ইত্তেফাক পত্রিকার অবিসংবাদিত সম্পাদক (বাংলাদেশের অন্যতম স্থপতি) তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার উদ্যোগে গঠিত হলো ৯০ সদস্যের দাঙ্গাবিরোধী কমিটি। কমিটির আহ্বায়ক শেখ মুজিব। ১৬ জানুয়ারি সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা রুখতে জনগণের উদ্দেশে দৃঢ়কণ্ঠে আহ্বান জানান কমিটি—পূর্বপাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও। সেদিন সব পত্রিকার ব্যানার হেডিং এটাই। অঙ্গীকার আর ভাবাবেগের দৃঢ়তায় সমবেত ইচ্ছার উদ্ভাসিত প্রস্তুতি। ভেস্তে গেল স্বৈরাচারী সামরিকতন্ত্রের জঘন্য ষড়যন্ত্র। এ-এক ঐতিহাসিক, মহান দৃষ্টান্ত। এ দৃষ্টান্তকে সামনে রেখেই এখনো বাংলাদেশ মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা আর সন্ত্রাসবাদকে নির্মূল করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বঙ্গবন্ধু, মানিক মিয়া ও তাঁদের সহগামীদের প্রতিরোধের প্রতিধ্বনি মুছে যায়নি। তাঁদের অভিপ্রায় আর অঙ্গীকার ইতিহাসেরই প্রত্যক্ষ নির্দেশ।
আমাদের পশ্চিমবঙ্গও বহু প্ররোচনা পরোক্ষ উসকানি সত্ত্বেও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে, ইতিহাসের বিকৃতির বিরুদ্ধে, বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে ওই সময় তার চিন্তাকে, তার মননের শক্তিকে, তার রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে যেভাবে অগ্রাধিকার দিয়েছে, আজ যেভাবে আরো বেশি সক্রিয় হয়ে উঠছে, তাতে আমরা নিঃসঙ্কোচে বলতে পারি, আসন্ন লোকসভা ভোটের আগে আর পরে বহিরাগতের মানুষখেকো রাজনীতির মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। এখানে একটি দুটি অযাচিত ব্যতিক্রমকে বাদ দিলে সব দল সংহতি আর নির্বিশেষের প্রেমকে, সুস্থতার স্থাপনাকে প্রধানতম ইস্যু ভাবাচ্ছে, বলতে চাইছে, জ্বালিয়ে রাখো হূদয়ের দীপশিখা, একস্বরে রুখে দাঁড়াও বাংলা। গুজব, ফিসফাস, পরিকল্পিত দূষণের নায়ক-নায়িকাদের বর্জন কর, জনরায় প্রয়োগ করে হঠাও ‘মেনমেড’ বৈষম্য, অবিচার ও ঔদ্ধত্যের ইশতেহার। বলতে ভালো লাগছে, জননেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বরের উচ্চতা, তার জেদ আর আক্রোশ ভারত অবাক হয়ে দেখছে। তাঁর সংযত অথচ সুদৃঢ় উচ্চারণ মুহুর্মুহু স্মরণ করিয়ে দেয় মহত্প্রাণ গুরুসদয় দত্তের অমৃত বাণী—বিশ্বমানব হবি যদি, কায়মনে বাঙালি হ।
n লেখক : ভারতীয় সাংবাদিক,
সম্পাদক, আরম্ভ
