বুক ক্যাফেতে বিনোদন

আপডেট : ২৯ মার্চ ২০১৯, ২২:৪৩

রাজধানীতে এখন বাইরে ‘সময়’ কাটানো মানেই রেস্টুরেন্টে বসে খাওয়া-দাওয়া। পরিবার নিয়ে হোক কিংবা বন্ধুদের আড্ডা— ভরসা সেই রেস্টুরেন্টই। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে কনসেপ্ট। গড়ে উঠছে থিম রেস্টুরেন্ট। সেই ধারাবাহিকতায় রাজধানীতে নতুন সংযোজন বুক ক্যাফে।

প্রায় ৯ বছর আগে রাজধানীতে প্রথম এমন বুক ক্যাফে নিয়ে আসে পাঞ্জেরি বুক সেন্টার- পিবিএস। চার হাজার বর্গফুটের বিশাল পরিসরে দুই লাখ বই পড়ার আয়োজন যেমন রয়েছে; তেমনি রয়েছে গান শোনা আর কফির পেয়ালায় চুমুক দেওয়ার সুযোগ। পিবিএসের পর একে একে এসেছে পাঠক সমাবেশ কেন্দ্র, পূর্ব-পশ্চিম, দীপনপুর এবং সবশেষে বেঙ্গল বই। এরপর যুক্ত হয়েছে চট্টগ্রামের বাতিঘর। দীপনপুর আর বেঙ্গল বই আসার পর তরুণ-তরুণীদের মাঝে জনপ্রিয়তা পায়। রাজধানীতে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে বুক ক্যাফের কনসেপ্ট। এসব বুক ক্যাফেগুলোর কর্ণধার সবারই প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বুক ক্যাফেগুলো তারই অংশ।

পিবিএস: শান্তিনগর মোড়েই এ বুক সেন্টার। ২০১০ সালের ১২ মার্চ দেশের প্রথম চেইন বুক শপ হিসেবে যাত্রা শুরু হয় পিবিএসের। পাঞ্জেরি পাবলিকেশন্স লিমিটেডের তিন পরিচালক কামরুল হাসান শায়ক, আব্দুল্লাহ আল বাকী ও কাওসার হাসানের পরিকল্পনায় গড়ে ওঠে এ প্রতিষ্ঠান। শান্তিনগরের শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সড়কের ৪৩ নম্বর বাড়ির দ্বিতীয় তলায় থরেথরে সাজানো বই। দেশের সব স্বনামধন্য প্রকাশনীর গুরুত্বপূর্ণ বই তো রয়েছেই, তেমনি রয়েছে বিদেশের খ্যাতিমান প্রকাশনীর নানা বই। রয়েছে ছোটদের বিশাল বইয়ের সমাহার। পাশেই রয়েছে বাচ্চাদের খেলার জায়গা, ছবি আঁকার জন্য রঙিন ভুবন। ভবনের তৃতীয় তলায় রয়েছে মিউজিক কর্নার। রয়েছে কফিশপ, থ্রিডি থিয়েটার কর্নার।

বইপ্রেমীদের জন্য প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকে পিবিএস। বিভিন্ন বিষয়ের সকল প্রয়োজনীয় বই পাওয়া যাবে পিবিএসে। আর যদি বইটি না পেয়ে থাকেন, তাহলে অর্ডার দিলেই যথাসময়ে তা বাড়িতে পৌঁছে দেবেন পিবিএসের কর্মীরা। অনলাইনে বই অর্ডারের সুবিধাও রয়েছে।

বইয়ের রাজ্য ছাড়াও পিবিএসে রয়েছে অত্যাধুনিক ক্যাফে। এখানে বই পড়া ও দেখার পাশাপাশি চা, কফি ও তাজা ফলের জুস পাওয়া যায়। আরো রয়েছে স্বাস্থ্যসম্মত নাশতা। রয়েছে শিশু-কিশোরদের জন্য স্বপ্নরাজ্য। যে রাজ্যে শিশুরা বই পড়ার পাশাপাশি খেলাধুলাও করতে পারছে। রয়েছে ছবি আঁকার সুযোগও। সে সঙ্গে ঢাকার বইঘরগুলোর মধ্যে একমাত্র পিবিএসেই রয়েছে থ্রিডি চলচ্চিত্র দেখার ব্যবস্থা। প্রতিদিনই এখানে শিশুরা দেখতে পারে নানা চলচ্চিত্র।

পাঠক সমাবেশ কেন্দ্র: শাহবাগে আজিজ সুপার মার্কেটের উল্টো পাশেই পাঠক সমাবেশ কেন্দ্র। পাঠক সমাবেশ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান হিসাবেও বেশ নামকরা। ১৯৮৭ সালে যাত্রা শুরু করে প্রকাশনা সংস্থা পাঠক সমাবেশ। ২০১৪ সাল থেকে যাত্রা শুরু করে পাঠক সমাবেশ কেন্দ্র। নানা দেশের, নানা ভাষার, নানা রকমের বই কিনতে প্রতিদিনই বইপ্রেমীরা ভিড় জমাচ্ছেন সেখানে।

দীর্ঘ পথচলায় রুচিশীল নানা বিষয়ের বই প্রকাশ করে পাঠকদের দৃষ্টি আর্কষণ করা এ প্রকাশনা সংস্থটি থেকে ২০১৪ সালে একটি কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠান হিসেবে চালু করে পাঠক সমাবেশ কেন্দ্র। যা ঢাকা শহরের দ্বিতীয় বইঘর। শাহবাগের পাশাপাশি গুলশান লিংক রোডেও পাঠক সমাবেশ কেন্দ্রের আরেকটি শাখা রয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শহিদুল ইসলাম বিজু।

এখানে প্রায় লক্ষাধিক বইয়ের সংগ্রহ রয়েছে। এখানে বই বসে পড়ার ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া, বই সংক্রান্ত যেকোনো আয়োজন করা যেতে পারে এখানে। সুযোগ রয়েছে বইয়ের মোড়ক উন্মোচনের ব্যবস্থা।

পূর্ব পশ্চিম: ২০১৬ সালের ১৬ জুন যাত্রা শুরু করে ঢাকার শহরের আরেকটি জনপ্রিয় বইঘর-পূর্ব-পশ্চিম। শুক্রাবাদের মেট্রো শপিং মলের ঠিক বিপরীতে পূর্ব-পশ্চিমে অবস্থান।

দেশের স্বনামধন্য চারটি প্রকাশনা সংস্থা আগামী প্রকাশনী, পাঞ্জেরি পাবলিকেশনস্, জ্যার্নিম্যান বুকস এবং অন্যপ্রকাশ যৌথভাবে পূর্ব-পশ্চিম বইঘরটি চালু করেছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তাব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে একটি পরিচালনা পর্ষদ। যার প্রধানের দায়িত্বে রয়েছেন আগামী প্রকাশনীর কর্ণধার এবং জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সাবেক সভাপতি ওসমান গনি।

সেখানে এ চার প্রকাশনা সংস্থার পাশাপাশি দেশের অন্যান্য ও বিদেশি বইও পাওয়া যাচ্ছে। জায়গাটি ছোট হলেও, আয়োজনটি বড়। সব ধরনের বই রয়েছে এখানে। ফলে যেকোনো বয়সের, যেকোনো রুচির পাঠক এখান থেকে নিজের জন্য প্রিয় বই কিনতে বা বসে পড়তে পারবেন।

দীপনপুর: জঙ্গি হামলায় নিহত জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ফয়সাল আরেফিন দীপনের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্যই দীপনপুর গড়ে তুলেছেন তার স্ত্রী রাজিয়া রহমান জলি। ২০১৭ সালের ১২ জুলাই দীপনের ৪৫তম জন্মদিনে চালু করা হয় বইঘর ‘দীপনপুর’। পুরো বইঘরটিতেই ছড়িয়ে রয়েছে ফয়সাল আরেফিন দীপনের স্মৃতি।

রাজধানীর কাঁটাবন মোড় থেকে খানিকটা এগুলেই অটবির শো-রুমের দোতলায় দীপনপুরের অবস্থান। প্রায় ২০ হাজার বইয়ের সমারোহ দীপনপুর জুড়ে। সেখানে যেকোনো বয়সের পাঠক এসে বই পড়তে পারবেন। এছাড়াও যেকোনো বইয়ের অর্ডার দিলে দীপনপুরের কর্মীরা আপনার ঘরে পৌঁছে দেবে বইটি। শিশুদের জন্য রয়েছে ‘দীপান্তর’। এর পুরোটাই শিশুতোষ বই দিয়ে সাজানো। রয়েছে কিছু খেলনাও। তবে সেগুলোও শিক্ষামূলক। তেপান্তরের মাঠের মতো সবুজ ঘাসের আদলে সাজানো এ জায়গাটি বড় পছন্দের শিশুদের কাছে। হৈ-হুল্লোড় করতে করতে বেশ মজা করেই সেখানে বই পড়ে শিশুরা। সে সঙ্গে প্রতি সপ্তাহের শুক্র ও শনিবার এখানে বসছে শিশুদের ছবি আঁকার বিদ্যালয়। রয়েছে শিশুদের জন্য গল্প বলার আসর এবং বরেণ্য ব্যক্তিদের সঙ্গে শিশুদের মতবিনিময় সভা।

দীপনপুরের রয়েছে ‘ক্যাফে দীপাঞ্জলি’। বই পড়া, গল্প-আড্ডার সঙ্গে এখানে রয়েছে চা-কফি, জুস কিংবা হালকা খাবার। এছাড়াও বয়স্ক পাঠকদের নিরিবিলিতে বই পড়ার জন্য রয়েছে ‘সিনিয়র সিটিজেন কর্নার’। এছাড়াও সেখানে রয়েছে প্রার্থনা কক্ষ।

বেঙ্গল বই: বুক ক্যাফের ধারণা বদলে দিয়েছে বেঙ্গল ক্যাফে এসে। শিল্প-সংস্কৃতির অন্যতম পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে রাজধানীর লালমাটিয়ার ডি ব্লকের ১/৩ নম্বর বাড়িতে বেঙ্গল বইয়ের অবস্থান। জোড়া ভবন মিলিয়ে প্রায় ১২ হাজার বর্গফুটের জায়গা নিয়ে বেঙ্গল বই। যেখানে প্রদর্শন করা হচ্ছে প্রায় লাখখানেক বই। ‘বইয়ের মাঝে ডুব’ এ প্রতিপাদ্যে শুরু হওয়া এই বইঘরটিতে আসলেই বইয়ের মাঝে ডুব দেওয়ার সকল ব্যবস্থা রয়েছে।

ধানমন্ডির সাবেক ২৭ নম্বরের মুখে মীনা বাজারের গলির মুখে দাঁড়াতেই নজরে আসে বেঙ্গল বই। নিচতলার একপাশে বেশ এলোমেলো সাজানো হয়েছে অনেকগুলো বই। নিচের তলায় সম্পূর্ণ আয়োজনটির শিরোনাম- বৈঠকখানা। যাতে পুরোনো বইয়ের সঙ্গে রয়েছে চা-সিঙ্গারার মতো হালকা নাস্তার ব্যবস্থা। আর প্রতি শুক্র ও শনিবার সকালে এখানে রয়েছে লুচি আর খিচুড়ি খাওয়ার ব্যবস্থা। নিচতলাতেই রয়েছে খোলা লন। যাতে বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে জমিয়ে আড্ডা দেওয়া যাবে যতক্ষণ মন চাই ততক্ষণ।

দ্বিতীয় তলা থেকেই মূলত বইয়ের আয়োজন শুরু। ‘বইয়ের হাট’ শিরোনামের এ আয়োজনে দেশ-বিদেশের অসংখ্য বইয়ের সংগ্রহ। বাংলাদেশের ২৫টি ও ভারতে ১৫টি প্রকাশনার বই পাওয়া যাবে এখানে। গল্প, উপন্যাস থেকে শুরু করে মিলবে শিল্পকলা, সাহিত্য, স্থাপত্যবিষয়ক বইও। বাংলাদেশের প্রকাশিত যেকোনো বই ২০ শতাংশ ছাড়ে কিনতে পারবেন। তবে ভারতীয় বইয়ের ক্ষেত্রে বইয়ের গায়ে লেখা মূল্যের দ্বিগুণ পরিশোধ করতে হবে। দ্বিতীয় তলাতেই রয়েছে কফিশপ- বারান্দায় কফি। বই হাতে নিয়ে কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে প্রিয় বইয়ের পাতায় চোখ রাখা যাবে এখানে।

তৃতীয় তলার আয়োজনটি পুরোটাই বাচ্চাদের জন্য। ‘আকাশকুসুম’ নামের এ আয়োজনের চারপাশে রয়েছে শিশুতোষ সজ্জা। যার মাঝে হেসেখেলে শিশুরা পড়তে পারবে নিজেদের প্রিয় বইগুলো। তাদের বসার আয়োজনটিও দারুণ। কোথাও চারকোনা কিংবা কোথাও গোল করে বসার ব্যবস্থা রয়েছে শিশুদের। আর সে সঙ্গে রয়েছে ছোট্ট একটি মঞ্চও। যেখানে শিশুদের জন্য গল্পবলার আয়োজনও রয়েছে নিয়মিত। ‘আকাশকুসুম’র একপ্রান্তে রয়েছে শিশুদের একাডেমিক বই ও নানা স্টেশনারি পণ্যের আয়োজন। ‘ইসকুলের বই’ ও ‘খাতাকলম’ শিরোনামের এ আয়োজনে শিশুদের পড়াশোনার পাশাপাশি চিত্রকর ও স্থপতিদের জন্য রয়েছে নানা স্টেশনারি পণ্য।

বাতিঘর: ২০০৫ সালে চট্টগ্রামের ছোট্ট স্থানে শুরু হয় বাতিঘর। ২০১২ সালে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব ভবনে প্রায় তিন হাজার বর্গফুটের বিস্তৃত পরিসরে পুরোনো জাহাজের আদলে সম্প্রসারিত হয় ‘বাতিঘর’। চট্টগ্রামে সফলতার পর ২০১৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর ঢাকার বাংলামোটরের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ভবনের অষ্টম তলায় যাত্রা শুরু করে বাতিঘরের ঢাকা শাখা। দেশি-বিদেশি এক হাজার প্রকাশনা সংস্থা, ১০ হাজার লেখক এবং এক লাখের ওপরে বই নিয়ে মুঘল স্থাপত্য লালবাগ কেল্লার আদলে নির্মিত হয়েছে ‘বাতিঘর’। চালুর পর থেকেই বইপ্রেমীদের অন্যতম আড্ডাস্থল হয়েছে বাতিঘর।

শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির নানা শাখার বিষয়াবলির পাশাপাশি খেলাধুলা, রাজনীতি ও সমকালীন বিজ্ঞান, দর্শন আর লোকসংস্কৃতির ওপর রচিত লক্ষাধিক বইয়ের সংগ্রহ রয়েছে ‘বাতিঘর’-এ। ভ্রমণ, বাংলা ও বাঙালি ও বিশ্ব সভ্যতার বিকাশ, ইতিহাস, সমাজচিন্তা, রাজনীতির নানা বিষয় নিয়ে সাজানো হয়েছে ভ্রমণ ও প্রবন্ধ কর্নারটি। যারা কবিতা ভালোবাসেন, তাদের জন্য রয়েছে কবিতা কর্নার। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, সুফিয়া কামাল, শামসুর রাহমান, আসাদ চৌধুরীসহ বাংলার শত কবির কাব্যগ্রন্থ পাওয়া যাবে এখানে। দর্শন বিষয়ক নানা প্রবন্ধ, সংকলন, প্রকাশনা নিয়ে সাজানো হয়েছে দর্শন কর্নার। এ ছাড়াও, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও সমরেশ মজুমদারের রচনাবলি সাজানো হয়েছে শীর্ষেন্দু-সুনীল-সমরেশ কর্নারে। সংকলনের পাশাপাশি আলাদাভাবে পাওয়া যাবে তাদের রচনা।

যারা ছোট গল্প পড়তে ভালোবাসেন, তাদের জন্য জননন্দিত গল্পকার, কথাসাহিত্যিকদের রচনাবলি নিয়ে সাজানো হয়েছে ছোটগল্প কর্নার। লোকসংস্কৃতি, ইতিহাস গবেষকদের জন্য এখানে রয়েছে লোকসংস্কৃতি, চলচ্চিত্র, থিয়েটার, শিল্প ও স্থাপত্য, ইতিহাস কর্নার।

বইঘরটিতে আরো রয়েছে- সাংবাদিকতা, রাজনীতি, বিজ্ঞান ও গণিত, খেলাধুলা, কল্পবিজ্ঞান, রম্য রচনা, রহস্যগল্প কর্নার। তরুণ প্রজন্মের অন্যতম প্রিয় লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবালের গল্প, উপন্যাস, রহস্য উপন্যাস নিয়ে সাজানো হয়েছে মুহম্মদ জাফর ইকবাল কর্নার।