তৃতীয়বারের মতো ব্রেক্সিট চুক্তি পাসে ব্যর্থ থেরেসা মে

আপডেট : ৩০ মার্চ ২০১৯, ০১:০৬

ব্রেক্সিট পরবর্তীকালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে ব্রিটেনের সম্পর্ক কেমন হবে তা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে’র করা খসড়া চুক্তিটি তৃতীয়বারের মতো ব্রিটিশ পার্লামেন্টে অনুমোদন পেতে ব্যর্থ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরও গতকাল শুক্রবার হাউস অব কমন্সে তার খসড়া চুক্তিটি ৫৮ ভোটে বাতিল হয়েছে। এর আগে প্রথম দফায় ২৩০ ও দ্বিতীয় দফায় ১৪৯ ভোটে এই খসড়া চুক্তি প্রস্তাব নাকচ করেছিলেন ব্রিটিশ এমপিরা।

ব্রেক্সিট গণভোটের রায় অনুযায়ী গতকাল শুক্রবার ইইউ থেকে ব্রিটেনের আনুষ্ঠানিকভাবে বেরিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কোন প্রক্রিয়ায় ব্রেক্সিট হবে সে বিষয়ে ব্রিটেনের এমপিরা এখনো একক কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেননি। ব্রিটেনের সময় চাওয়ার প্রেক্ষিতে ইইউ ২৯ মার্চের পরিবর্তে ১২ এপ্রিল বেক্সিটের সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। তবে ইইউ জানিয়েছে, এক সপ্তাহের মধ্যে মে’র চুক্তি পার্লামেন্টে অনুমোদন পেলে ব্রেক্সিট কার্যকরের সময়সীমা ২২ মে পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে। কিন্তু তৃতীয় দফায়ও মে’র খসড়া অনুমোদন না পাওয়ায় এবং এমপিরা বিকল্প কোনো প্রস্তাব দিতে ব্যর্থ হলে ১২ এপ্রিলেই কোনো চুক্তি ছাড়াই ব্রেক্সিট সম্পন্ন হতে পারে। মে’র খসড়া চুক্তি নাকচ হওয়ায় আগামী ১০ এপ্রিল ইউরোপীয় কাউন্সিলের জরুরি বৈঠক ডাকা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে’র দলের এমপিরা বলেছিলেন, তিনি পদত্যাগ করলে অনিচ্ছা সত্ত্বেও তারা ব্রেক্সিট খসড়া চুক্তি অনুমোদনে ভোট দেবেন। তিনি পদত্যাগে সম্মতি দিলে তার দলের কিছু এমপি ভোট দিতে রাজি হয়। কিন্তু ‘ব্যাকবেঞ্চার’ হিসেবে পরিচিত তার দলের কয়েকজন এমপি চুক্তির বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকে। অন্যদিকে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের দল ডিইউপি জানায়, তারা মে’র খসড়া চুক্তির পক্ষে ভোট দেবে না। এ রকম অনিশ্চয়তা নিয়ে গতকাল পার্লামেন্টে এই খসড়া চুক্তির ওপর তৃতীয় দফায় ভোটাভুটি হয়। ভোটে মে’র খসড়া চুক্তির পক্ষে ভোট পড়েছে ২৮৬টি অন্যদিকে বিরুদ্ধে ভোট পড়েছে ৩৪৪টি। ভোটের পর মে বলেন, এর প্রভাব খুবই গুরুতর। এই ব্যর্থতার জন্য ব্রিটেনকে ১২ এপ্রিল ইইউ ছাড়তে হতে পারে। এছাড়া ‘নো ডিল ব্রেক্সিট’ এড়াতে একটি আইন করার জন্য পর্যাপ্ত সময়ও পাওয়া যাবে না।

মে’র খসড়া চুক্তি ব্যর্থ হওয়ার পর ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড টুস্ক বলেছেন, খসড়া চুক্তি হাউস অব কমন্সে বাতিল হওয়ায় ১০ এপ্রিল ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের জরুরি বৈঠক হবে। ইউরোপীয় কমিশন এক বিবৃতিতে বলেছে, নো ডিল ব্রেক্সিট এখন ‘বাস্তবতা’ হয়ে উঠছে।

অনিশ্চিত হয়ে গেল

 ব্রেক্সিটের ভবিষ্যত

গতকাল যখন ব্রিটিশ এমপিদের ভোটের ফল প্রকাশ্যে আসে তখন চারদিক থেকে হাজার হাজার ব্রেক্সিটপন্থি পার্লামেন্ট স্কোয়ারে এসে জড়ো হয়। তারা দ্রুত চুক্তি পাস ও ব্রেক্সিট কার্যকরের দাবিতে বিভিন্ন শ্লোগান দিতে থাকে এবং একটি কার্যকর চুক্তিতে পৌছাতে ব্যর্থ হবার কারণে এমপিদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে। তাদের ‘লজ্জিত হওয়া উচিত’ বলেও তারা তাদের বক্তব্যে উল্লেখ করে। এসময় বিক্ষোভকারীরা শ্লোগানে শ্লোগানে গোটা এলাকা প্রকম্পিত করে তোলে।

এদিকে, ব্রেক্সিট কখন হবে বা আদৌ যুক্তরাজ্য ইইউ থেকে বেরিয়ে যেতে পারবে কিনা তা এখন পুরোপুরি অস্পষ্ট হয়ে পড়ল। এ ভোটটিকেই শেষ সুযোগ বলে পার্লামেন্টকে জানিয়েছিলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মে। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন, এ চুক্তি পাস না হলে ব্রেক্সিটে কোনোরকম দেরীর ক্ষেত্রে তা ১২ এপ্রিলের পর পর্যন্ত পিছিয়ে যাবে। চুক্তি প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ‘পরিণতি গুরুতর’ হবে বলেই মন্তব্য করেছিলেন মে। গতকালের পরাজয়ের পর তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি হাউজের প্রতিটি সদস্যের জন্যই এটি খুবই গভীর পরিতাপের বিষয় যে, আমরা আবারো সুশৃঙ্খলভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে সমর্থন করতে ব্যর্থ হয়েছি। এ সিদ্ধান্তের পরিণতি খুবই গুরুতর। আপাতত ব্রেক্সিট প্রক্রিয়ার জন্য হাতে সময় আছে ১২ এপ্রিল পর্যন্ত। অর্থাত্, মাত্র ১৪ দিন। কোনো কিছুতে সম্মত হওয়া, কোনো আইন করা কিংবা কোনো চুক্তি অনুমোদন করার জন্য এ সময় যথেষ্ট নয়। আর হাউজও এটি পরিষ্কার করে দিয়েছে যে, তারা চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিট অনুমোদন করবে না। একটি প্রতিযোগিতায় যদি সকল পক্ষ জিততে চায় সেটা কখনো সম্ভব হয় না। সেকারণে আমাদেরকে সামনে আগানোর একটি বিকল্প পন্থায় একমত হতে হবে।’

ওদিকে, মে’র ব্রেক্সিট চুক্তি পার্লামেন্টে চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয়েছে মন্তব্য করে তাকে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ব্রেক্সিটপন্থি কনজারভেটিভদের ইউরোপীয় রিসার্চ গ্রুপের ডেপুটি চেয়ারম্যান স্টিভ বেকার। তিনি বলেন, ‘চুক্তি পাস হয়নি। এটি পাস হবেও না। এখন মে’র উচিত নতুন নেতা আসার পথ করে দেওয়া, যিনি একটি ব্রেক্সিট চুক্তি পার্লামেন্টে পাস করাতে পারবেন।’ যুক্তরাজ্যের বিরোধীদলীয় লেবার নেতা জেরেমি করবিনও প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগ করে একটি নির্বাচন দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

চুক্তিহীন ব্রেক্সিট এড়াতে আগামী ২২ মে পর্যন্ত সময় বেধে দিয়েছে ইইউ। শুক্রবারের ভোটের ফলের কারণে এখন নিশ্চিতভাবেই সেই সময়সীমা মানতে ব্যর্থ হবে যুক্তরাজ্য। তবে তার আগে আগামী ১২ এপ্রিল ইইউ’র কাছে নতুন করে সময় চাওয়ার সুযোগ রয়েছে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সামনে। খবর বিবিসি ও সিএনএনের।