গাইবান্ধা সদর উপজেলার কামারজানি ইউনিয়নের ব্রহ্মপুত্র নদের প্রত্যন্ত চরাঞ্চলের কুন্দেরপাড়া গণ উন্নয়ন একাডেমি নামক মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি আগুনে ভস্মিভুত হয়েছিল। কিন্তু শিক্ষার আলোয় আলোকিত হওয়ার উদ্যমে ভাটা পড়েনি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকসহ এলাকাবাসীদের।
এদিকে এ ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে থানা পুলিশ ন্যাশনাল ব্যাংক গাইবান্ধা শাখার ব্যবস্থাপক ওয়াশিবুল হক চিশতিকে থানায় ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। অন্যদিকে প্রধান সন্দেহভাজন মো. রঞ্জু মিয়াকে (৩০) রবিবার বিকেলে কুন্দেরপাড়া (পারদিয়ারা) গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। রঞ্জু মিয়া ওই গ্রামের মজিবর রহমানের ছেলে।
এছাড়া স্কুলটির শ্রেণীকক্ষ নির্মাণ ও আসবাবপত্র কেনার নিমিত্তে জরুরী ভিত্তিতে সরকারি তহবিল থেকে ৪৫ হাজার টাকা ও ১৫ বান্ডিল ঢেউটিন এবং স্থানীয় তহবিল থেকে আরো ২০ হাজার টাকার অনুদান প্রদান করেছে জেলা প্রশাসক। এক লাখ টাকার আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে জেলা পরিষদের তহবিল থেকে।
সোমবার সরেজমিনে ওই এলাকা পরিদর্শন করে শিক্ষার্থীদের পাঠদানের এক অভুতপূর্ব দৃশ্য দেখা যায়। শিক্ষার্থীদের আগ্রহ এবং শিক্ষকদের অংশগ্রহণে যেন আগের মতই মুখরিত হয়ে উঠেছে বিদ্যালয় এলাকা।
উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে বিদ্যালয় কক্ষের ধংসস্তুপকে পেছনে রেখে খোলামাঠে বন্যা আশ্রয়ন কেন্দ্রের শ্লেটারে ও তাঁবুতে এবং অর্ধেক পুড়ে যাওয়া টিনসেডের শ্রেণীকক্ষের মেঝেতে চলছে লেখাপড়া।
স্কুলের প্রধান শিক্ষক আসাদুজ্জামান আসাদ বললেন, যতদিন শ্রেণীকক্ষ নির্মাণ সম্ভব না হবে, ততদিন এভাবেই আমরা শিক্ষাদান অব্যাহত রাখবো।
বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীর শিক্ষার্থী শাপলা আক্তার বলে, ‘স্কুল পুড়ে গেলেও আমরা পড়া বন্ধ করিনি। কারণ দেশের ভালো মানুষরা আমাদের এ স্কুল নিয়ে ভাবছে, আমাদের কথা ভাবছে। তাই খারাপ লোকদের পরাজয় হয়েছে। আগুন দিয়ে ভালো কিছুকে নষ্ট করা যায় না। আমাদের স্কুল ভবিষ্যতে আরো বড় হবে।
গাইবান্ধা সদর থানার ওসি একেএম মেহেদী হাসান জানান, কুন্দেরপাড়া গণ উন্নয়ন একাডেমি পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় জড়িত সন্দেহভাজন প্রধান আসামি হিসাবে রঞ্জু মিয়াকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি আরো বলেন, আগুনে বিদ্যালয় পুড়ে যাওয়ার অলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। এছাড়া অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার রহস্য উদঘাটনে রবিবার বিকালে র্যাব ও অপরাধ সনাক্তকরণ ইউনিট পৃথকভাবে তদন্ত কাজ পরিচালনা শুরু করেছে।
তিনি আরো জানান, এ ঘটনায় গ্রেফতারকৃত রঞ্জু মিয়াসহ বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, পার্শ্ববর্তী স্থানে অন্য একটি স্কুল তৈরি করাকে কেন্দ্র করে ব্যাংকের সংশ্লিষ্টতার কথা। গত রবিবার সে কারণে মূলতঃ ন্যাশনাল ব্যাংক গাইবান্ধা শাখার ব্যবস্থাপক ওয়াশিবুল হক চিশতিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
এদিকে পুরনো স্কুলের সঙ্গে প্রস্তাবিত স্কুল তৈরি নিয়ে কোন বিরোধের কারণে গণ উন্নয়ন একাডেমিতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে ওসি বলেন, এখনই চূড়ান্তভাবে কিছু বলার সময় আসেনি। অন্য কোন কারণও থাকতে পারে। অভিযোগের ভিত্তিতে রঞ্জুকে আটক করা হয়েছে। তাকে নিয়ে অন্যান্য সন্দেহভাজনদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
এছাড়া স্কুল নিয়ে বিরোধের পাশাপাশি জামায়াত-শিবির ও জঙ্গিপ্রবণ ফুলছড়ি ও সাঘাটার চরাঞ্চলগুলো কুন্দেরপাড়াসংলগ্ন হওয়ায় স্কুলে আগুন দিতে জঙ্গিগোষ্ঠীকে কেউ কাজে লাগিয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
স্থানীয় ও বিদ্যালয় সুত্রমতে ন্যাশনাল ব্যাংক চর পারদিয়ারায় মাধ্যমিক স্কুল স্থাপনের উদ্যোগ নিলে স্থানীয় একটি চক্র সেই সুযোগটি গ্রহণ করে ফায়দা লোটার চেষ্টা করে। চক্রটি প্রস্তাবিত স্কুলকে কেন্দ্র করে নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা করে।
এদিকে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করার পর ন্যাশনাল ব্যাংক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ থেকে কিছুটা পিছিয়ে যায়। তখন থেকেই গণ উন্নয়ন বিদ্যালয়ের সঙ্গে ওই চক্রটি বিরোধ শুরু হয়। ফলে অগ্নিসংযোগের পর থেকে ব্যাংকের স্কুলের জন্য জমিদানে আগ্রহী মজিবর রহমানের ছেলে রঞ্জু মিয়াকে মূল সন্দেহভাজন হিসেবে পুলিশ টার্গেট করে এবং রবিবার বিকালে তাকে গ্রেফতার করে।
ইত্তেফাক/এএন
