‘একটা সময় ছিল দেশে মুক্তিযুদ্ধের কথা বলা যেত না। মুক্তিযোদ্ধারা নিজেদের পরিচয় দিতেন না। এমন সময় ছিল রাজাকাররা দেশের মন্ত্রী হয়েছিলেন। সেই সময় আজ গত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনালালিত সময় ফিরে এসেছে। এখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আমাদের ভবিষ্যত্ গড়বার সময়।’
তাম্রলিপি প্রকাশ করেছে ৬৪ খণ্ডে ৬৪ জেলার ‘কিশোর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস’। এ গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করতে এসে গতকাল বৃহস্পতিবার শিক্ষাবিদ ও লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবাল এসব কথা বলেন। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এসময় আরো উপস্থিত ছিলেন শিক্ষাবিদ ইয়াসমিন হক, বইটির সম্পাদক ড. আমিনুর রহমান সুলতান, কবি আনিসুল হক, তাম্রলিপির প্রকাশক এ কে তরিকুল ইসলাম রনি প্রমুখ।
প্রকাশকরা জানালেন, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গ্রন্থের সবচেয়ে বড় ক্রেতা তরুণ ও কিশোররা। মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক রচনার প্রতি সব বয়সী পাঠকের আগ্রহ থাকলেও নবীনদের আগ্রহের মাত্রাটা অনেক বেশি। ফলে প্রকাশকরাও এসব বই প্রকাশে বিশেষভাবে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। সেই সূত্র ধরে প্রতিবছরই মেলায় আসছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক নতুন নতুন বই। তথ্যসংবলিত বইয়ের পাশাপাশি গল্প-উপন্যাস কিংবা কবিতার চরণেও উঠে আসছে একাত্তরের বীরত্বগাথা।
মুক্তিযুদ্ধের ২৪ বই: গতকাল মেলা ঘুরে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি স্টলেই মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বই। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বইয়ের প্রতি পাঠকের সহজাত আগ্রহ রয়েছে। এদিকে গত নয়দিনে মেলায় মুক্তিযুদ্ধের বই এসেছে ২৪টি। এরমধ্যে তাম্রলিপি এনেছে ৬৪ জেলার ‘কিশোর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস’, অনন্যা এনেছে ইমদাদুল হক মিলনের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস ‘নয় মাস’, অনুপম প্রকাশনী এনেছে সুব্রত বড়ুয়ার ‘এই আমাদের বাংলাদেশ’, সময় প্রকাশন এনেছে কর্নেল অব. তৌফিকুর রহমানের ‘গেরিলা ১৯৭১’, অক্ষর প্রকাশনী এনেছে রফিকুর রশীদের ‘একুশের ও মুক্তিযুদ্ধের কিশোর গল্প’, রানা জামানের ‘একাত্তরে রণাঙ্গনে’, ফখরে আলমের স্মৃতিচারণ গ্রন্থ ‘আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখেছি’, একুশে বাংলা এনেছে বিপ্রদাশ বড়ুয়ার ‘সাদা কফিন ও মুক্তিযোদ্ধারা’, বিভাস এনেছে মজিবর রহমানের প্রবন্ধগ্রন্থ ‘বাঙলা বাঙালি বাংলাদেশ’, বাংলা প্রকাশ এনেছে ইসহাক খানের গল্পগ্রন্থ ‘বিচ্ছু কাহিনী’ প্রভৃতি।
গতকাল মেলা পরিদর্শনে এসেছিলেন ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া। তিনি বলেন, ‘আমরা মেলার শুরু থেকেই কয়েক স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। এখনও সেইভাবে চলছে। মেলার নিরাপত্তার জন্য এর আশেপাশের এলাকার সমস্ত হকার ও ফুটপাতে অবস্থিত বিভিন্ন দোকানপাট তুলে দেওয়া হয়েছে। এরপরেও যদি কেউ বাড়তি নিরাপত্তা চায় তাহলে আমরা বিশেষ নিরাপত্তা দেওয়ার ব্যবস্থা করবো।’
মোড়ক উন্মোচন:গণসঙ্গীত শিল্পী ফকির আলমগীরের দুটি গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন হয় গতকাল। অনন্যা থেকে ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ’ ও ‘ইউরোপের পথে পথে’ গ্রন্থ দুটির মোড়ক উন্মোচন করেন বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন।
নতুন বই:মেলায় গতকাল নতুন বই এসেছে ১২৫টি। জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্র এনেছে ড. মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন এর ‘জাল টাকার বিড়ম্বনা’, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ এনেছে মামুন অর রশীদের ‘চলতি শব্দের অভিধান’, ঐতিহ্য এনেছে বুলবুল সারোয়ারের ‘স্বপ্ন ভ্রমণ জেরুজালেম,’ পাঞ্জেরী এনেছে ইমদাদুল হক মিলনের ‘ভূত বাড়ি’, সালেহ চৌধুরীর ‘ভাটি এলাকায় মুক্তিযুদ্ধ আমার অহংকার’, অবসর এনেছে আহসান হাবীবের ‘হুমায়ূন হিউমার এবং নিজস্ব’, কথা প্রকাশ এনেছে আমিরুল ইসলামের ‘আকাশ, নদী ও বঙ্গবন্ধুর গল্প’, অ্যাডর্ন এনেছে রেজাউল করিম খোকনের ‘শহরে এক আগন্তুক’, জয়তী এনেছে আল মাহমুদের ‘তোমাকে হারিয়ে কুড়িয়ে পেয়েছি’, অনিন্দ্য প্রকাশ এনেছে পলাশ মাহবুবের ‘বই খুললেই ভূত’, আগামী এনেছে আহমদ শরীফের ‘আহমদ শরীফের ডায়রি’, অনন্যা এনেছে শানারেই দেবীর ‘নীল ফড়িং কাব্য’, আফসার ব্রাদার্স এনেছে সালেহ আহমেদের ‘অগ্নিঝরা জবানবন্দী প্রেক্ষিত’ ও হুমায়ূন কবীর ঢালীর ‘সব লেখা ছোটদের’।
মূল মঞ্চের আয়োজন: বিকেল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় বাংলা ভাষায় ইতিহাস চর্চা শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবুর রহমান। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন অধ্যাপক মেসবাহ কামাল এবং ড. আশফাক হোসেন। সভাপতিত্ব করেন ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন কণ্ঠশিল্পী ফরিদা পারভীন, আকরামুল ইসলাম প্রমুখ।
আজকের আয়োজন: আজ শুক্রবার মেলা শুরু হবে সকাল ১১টায়, চলবে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত। এর মধ্যে সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত থাকবে শিশুপ্রহর। সকাল সাড়ে ৮টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। উদ্বোধন করবেন শিল্পী সমরজিত্ রায় চৌধুরী। বিকেল ৪ টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সূচনা ও ১১ মার্চ ১৯৪৮’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান।
ইত্তেফাক/নূহু
